বরিশালের প্রতিনিধিত্বকারী একটি আদর্শ গ্রাম হস্তীশুণ্ড

এস এম মোজাম্মেল হক :

আদি বাংলার ভৌগোলিক অবস্থা ছিল হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা, খাল-বিল পরিবেষ্টিত গভীর ঘন বন-জঙ্গল সমৃদ্ধ নিম্নাঞ্চল। বিশেষ করে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এত বেশি নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-দিঘি ছিল, যে কারণে মোট ভূমির বেশির ভাগই বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকত। পক্ষান্তরে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা-পুল-সাঁকো না থাকার কারণে কাছাকাছি অবস্থানে থেকেও এক এলাকা অন্য এলাকা থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। তখন যাতায়াতের জন্য মূল বাহন ছিল নৌকা।

দোফসলি জমির সনাতন চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল লোকজন আর্থিকভাবে তত বেশি সচ্ছল না থাকার কারণে অনেকেই নৌকার পরিবর্তে তালের ডোঙ্গা এবং কাছাকাছি চলাফেরার জন্য কলাগাছের ভেলাও ব্যবহার করত। পায়ে হেঁটে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজনে অতিরিক্ত একখানা গামছা সঙ্গে থাকা ছিল অপরিহার্য। কারণ পথে সাঁকোবিহীন খাল থাকলে গামছা পরে তা পার হতে হতো। দাদার বয়সী অনেকের কাছে শুনেছি, আমাদের হস্তীশুণ্ড গ্রাম থেকে নিকটতম উচ্চ বিদ্যালয় ছিল আশোকাঠি উচ্চ বিদ্যালয়, যার দূরত্ব ছিল কমপক্ষে ৯ মাইল এবং সেখানে যাদের পড়ালেখার সুযোগ হয়েছে, তাদের সবারই তিন-চারটি খাল সাঁতরে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে হতো। এমন কঠিন বাস্তবতার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের পক্ষে পঞ্চম শ্রেণির বেশি শিক্ষালাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে এই প্রতিকূল পরিবেশেও যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা তা থেকে বেশি উচ্চশিক্ষা লাভে সক্ষম হয়েছেন, তারা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কর্মে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ও সামাজিকভাবে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠালাভে সক্ষম হয়েছেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিটিশ শাসনামলে স্বল্পসংখ্যক উচ্চ বিদ্যালয় ও অনুন্নত যাতায়াত-ব্যবস্থার কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার ফলে শিক্ষার প্রসারকল্পে বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে মোড়াকাঠি গ্রামের মাখন বোসের বাড়ির সঙ্গে ১৯৪৮ সালে এইচএম ইনস্টিটিউশনের নবযাত্রা শুরু হয়। তবে অদূরেই ইতিপূর্বে বামরাইল অনাথ বন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার কারণে স্কুলের উত্তর দিক যথা উত্তর মোড়াকাঠি ও বামরাইল থেকে শিক্ষার্থী পাওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে স্কুল প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই দেখা গেল, যেসব গ্রামের শিক্ষার্থীরা স্কুলে পড়ার যোগ্য, স্কুলের অবস্থান সে তুলনায় এক পাশে হয়ে গেছে।

যেসব গ্রাম নিয়ে বিদ্যালয়টির অধিক্ষেত্র, তা ছিল যথাক্রমে মোড়াকাঠি, খোলনা, শানুহার, দামুদরকাঠি, হস্তীশুণ্ড, কাজিরা, আটিপাড়া, মুঙ্গাকাঠি ও বোহরকাঠি গ্রাম। ফলে সকল শিক্ষার্থীর সুবিধার্থে স্কুলের জায়গা পরিবর্তন করে মধ্যবর্তী স্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভালো যোগাযোগব্যবস্থা-সমৃদ্ধ হস্তীশুণ্ড গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন উত্তর পাশে দক্ষিণ মুখ করে স্কুল স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রায় সব গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আর্থিক অংশগ্রহণ এবং অন্যদের সাধ্যমতো অন্যান্য সহযোগিতা থাকলেও মূল ভূমিকা পালন করেন হস্তীশুণ্ড গ্রামের বয়স বিবেচনায় দাদার বয়সী প্রথম প্রজন্ম হিসেবে বিবেচ্য লোকেরা। পরবর্তী পর্যায়ে পিতৃতুল্য দ্বিতীয় প্রজন্মের তত্ত্বাবধানে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা-সমৃদ্ধ উন্মুক্ত পরিসরে বর্তমান জায়গায় পুনরায় স্থানান্তর করা হয়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে।

দেশের অন্যান্য জনপদের মতো ১৯১০ এর দশকে জন্ম নেওয়া পিতামহ পর্যায়ভুক্তদের প্রথম প্রজন্ম এবং পিতৃতুল্যদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ধরা হলে আমরা তৃতীয় প্রজন্ম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম প্রজন্মের অবর্তমানে দ্বিতীয় প্রজন্মের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও অনেকে ইতিমধ্যে বয়সের ভারে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ায় নেতৃত্ব প্রদানে অনাগ্রহী হওয়ায় সামাজিক সেসব দায়দায়িত্ব পর্যায়ক্রমিকভাবে তৃতীয় প্রজন্মের ওপর ন্যস্ত। ক্রমাগত আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্ম অপেক্ষা তৃতীয় প্রজন্ম সব দিক থেকেই অগ্রগামী হওয়ায় তাদের বিচক্ষণতা ও সুবিবেচনাপ্রসূত কর্মপরিকল্পনা ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হওয়ার দাবি রাখে। তবে তা সত্যাশ্রয়ী, নির্লোভ ও সর্বজনীন না হলে সকল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

একটা সময় ছিল নিজ থেকে কেউ সমাজে নেতৃত্বের জন্য উৎসাহ বোধ করতেন না। তদুপরি সমাজের অন্য সাধারণ লোকদের বিবেচনায় যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ বা আবদার করা হলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে অলাভজনক সে দায়িত্ব পালন করা ছিল অপরিহার্য কর্তব্য। যদিও এ কারণে তাদের আর্থিক ক্ষতি ব্যতীত লাভের কোনো সুযোগ ছিল না বা তারা লাভের কোনো চিন্তাও করতেন না। পক্ষান্তরে নেতৃত্ব প্রদানকে পুণ্যের কাজ বলে বিবেচনা করা হতো। সময়ের বিবর্তনে মানুষের মনোভাবে অনেক পরিবর্তন আসায় এবং নেতৃত্ব প্রদানে অনেক যোগ্য লোকের প্রাচুর্য ঘটার ফলে অনেকেই এখন নিজ উদ্যোগে নেতৃত্ব প্রদানে উৎসাহ বোধ করছেন। কোনো কোনো সময় একই পদের জন্য একাধিক যোগ্য লোকের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সে ক্ষেত্রে নেতা নির্বাচনে ভোটাভুটির সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তখন অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্য লোককে নির্বাচন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এরূপ ক্ষেত্রে যোগ্য নেতা নির্বাচনে ব্যত্যয় ঘটলে সে নেতৃত্ব দ্বারা সর্বজনীন কল্যাণ ব্যাহত হয়। যার ফল ভোগ করতে হয় নিরীহ সাধারণ মানুষকে। তাই সর্বস্তরের নেতা নির্বাচনে নির্বাচকমণ্ডলীর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে প্রাধান্য দিয়ে নেতা নির্বাচন করা আবশ্যক। অন্যথায় ভুল মানুষকে নেতা নির্বাচন করা হলে তার খেসারত সমগ্র জনগোষ্ঠীকেই দিতে হতে পারে। সে কারণে নেতা নির্বাচনে সতর্কতা খুবই জরুরি। বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট এলাকা নয়, সারা দেশের জন্যই প্রযোজ্য। সে কারণেই উল্লিখিত গ্রামটি বরিশালের অন্তর্গত হলেও সারা দেশ তথা ভাটি অঞ্চলের গ্রাম-বাংলার শাশ্বত ঐতিহ্যের ধারক-বাহকের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক। কুইন্স ভিলেজ, নিউইয়র্ক।