বরেণ্য চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান স্মরণে

মোহাম্মদ জামান খোকন

আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও চলচ্চিত্রে এক অবিস্মরণীয নাম জহির রায়হান। সবগুলো ক্ষেত্রেই তার অপরিসীম অবদান। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ আগস্ট, ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে। তাঁর পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। তবে ছোটবেলায় তাকে ডাকা হতো জাফর নামে। বাবা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন।
জহির রায়হানের বাবা কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ ও কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন। পড়াশুনা শেষে কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন। আরবিতে উচ্চ ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার অধিকারী। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই পারিবারিক পরিমন্ডলে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জহির রায়হানের মাও ছিলেন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে। তিনি সেই আমলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ঐতিহ্যবাহী তালুকদার। রক্ষণশীলতা সত্ত্বেও পরিবারটি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্ব অসহযোগ আন্দোলনের সময় সুফিয়া খাতুন নিজ হাতে চরকায় সূতা কেটে কাপড় বুনে পরতেন। জহির রায়হানরা ছিলেন ৫ ভাই ও তিন বোন। মা-বাবা দুজনেই ছিলেন সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ও যতœশীল। প্রথম সন্তান শহীদুল্লাহ কায়সার। দ্বিতীয় নাফিসা কবির, তৃতীয় জহির রায়হান, চতুর্থ জাকারিয়া হাবিব, পঞ্চম সুরাইয়া বেগম, ষষ্ঠ শাহেনশা বেগম, সপ্তম ওবায়দুল্লাহ এবং অষ্টম ও সর্বকনিষ্ঠ সাইফুল্লা।
নিজ পরিবারেই জহির রায়হানের পড়াশুনার হাতেখড়ি। ১৯৪০ সালে কলকাতা মডেল স্কুলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনার পর মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। সেখানে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করার পর আলীয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্শিয়ান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরিবারের সাথে মজুপুর গ্রামে এসে আমিরাবাদ স্কুলে ভর্তি হন। সে সময়ই রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। ছাত্র ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনকারী সদস্যদের চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন। খোলা রাস্তায় কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘স্বাধিকার’ বিক্রি করতেন। ১৯৫০ সালে ঐ স্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ঢাকা কলেজে পড়াশুনার সময়ই তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গিয়ে প্রথম দশজনের মিছিলে তিনিও ছিলেন এবং পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। এক বছর পর বাংলা বিভাগে চলে যান। বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে অনার্স পাশ করে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন।
জহির রায়হানের লেখালেখির অভ্যাস গড়ে উঠে স্কুল জীবন থেকেই। প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ছিল ‘ওদের জানিয়ে দাও।’ ১৯৪৯ সালে নতুন সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় এটি ছাপা হয়। প্রথম প্রকাশিত ছোট গল্প ‘হারানো বলয়।’ এটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে, ড. আলীম চৌধুরী ও এমএ কবির সম্পাদিত ‘যান্ত্রিক পত্রিকায়।’ ‘শেষ বিকালের মেয়ে’ সাপ্তাহিক চিত্রালীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবার পর গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত ‘আরেক ফাল্গুন।’ ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে, ধারাবাহিকভাবে ‘উত্তরণ’ পত্রিকায়। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় ‘আর কত দিন।’ এটি ‘সন্ধানী’ পত্রিকার ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
জহির রায়হান সাংবাদিক হিসাবেও বহুল পরিচিত ছিলেন। ‘খাপছাড়া’ পত্রিকায় প্রথম কাজ করেন। ছিলেন ‘যাত্রিক’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। ‘প্রবাহ’ ও ‘এক্সপ্রেস’ নামক পত্রিকায় কার্যকরী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সমকাল, চিত্রালী, সচিত্র সন্ধানী, সিনেমা, যুগের দাবী প্রভৃতি পত্রিকার সাথেও যুক্ত ছিলেন।
চিত্রালীতে ‘প্রবেশ নিষেধ’ শিরোনামে ধারাবাহিক ফিচার লিখেছেন। কিশোর বয়স থেকেই তার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। ঢাকায় চলে আসার পর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের মাধ্যমে বাম রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৪ সালের দিকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। এ সময়ে তিনি কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহের দেয়া রাজনৈতিক নাম ‘রায়হান’ গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি ‘জহির রায়হান’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই জহির রায়হান ছায়াছবি সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৫২ সালে কারাবণের পর মুক্তি পেয়ে তিনি কলকাতায় প্রমথেশ বড়–য়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফিক্স স্কুলে চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষালাভের জন্য ভর্তি হন। দশ মাসের কোর্স ছয় মাস পর্যন্ত পড়াশুনা করে অর্থাভাবে ঢাকায় চলে আসেন। ছাত্রজীবন শেষ করার আগেই ১৯৫৬ সালের শেষদিকে চিত্র পরিচালক এ জে কারদারের সাথে পরিচিত হন। ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ ছবিতে কারদার জহির রায়হানকে সহকারী পরিচালক নিযুক্ত করেন। এখান থেকেই শুরু হয় জহির রায়হানের চলচ্চিত্র-জীবন। পরবর্তীতে পরিচালক সালাউদ্দিনের ‘যে নদী মরুপথে’ ও এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতেও সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এফডিসি) স্থাপিত হলে তিনি নিজেই ছবি তৈরি শুরু করেন।
১৯৬১ সালে প্রথম পরিচালিত ছবি ‘কখনো আসেনি’ মুক্তিলাভ করে। ‘সোনার কাজল’ ১৯৬২; ‘কাঁচের দেয়াল’ ১৯৬৩; ‘সঙ্গম’ (উর্দু) ১৯৬৪; ‘বাহানা’ ১৯৬৫; ‘বেহুলা’ ১৯৬৬; ‘আনোয়ারা’ ১৯৬৭; ‘জীবন থেকে নেয়া’ ১৯৭০। তাঁর ‘আর কত দিন’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করতে চেয়েছিলেন ইংরেজিতে ‘লেট দেয়ার বি লাইট।’ কিন্তু তার আগেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল তিনি কুমিল্লা হয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে অন্যান্য সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্সিয়া’ গঠন করেন। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, জহির রায়হান ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। জহির রায়হান অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তার অস্ত্র ছিল ক্যামেরা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন বাংলায় নিধনযজ্ঞে মত্ত, তিনি অস্ত্র হিসাবে ক্যামেরাকে হাতে তুলে নেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, রাজাকার-আল বদর ও আল সামস বাহিনীর বর্বর হামলা সবকিছুই তার চলচ্চিত্রে স্থান পায়। এছাড়া মুজিবনগরে সরকারের কার্যক্রমও তুলে ধরা হয় এ চলচ্চিত্রে। সেই বিখ্যাত ছবি ‘স্টপ জেনোসাইড।’ যার অর্থÑ ‘বন্ধ করা গণহত্যা।’ তাছাড়া তৈরি করেন ‘বার্থ অব এ নেশন।’
তার তত্ত্বাবধানে বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন।’ আলমগীর কবির তৈরি করেন প্রামণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স।’ চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অনেক ছবিও প্রযোজনা করেন। ‘জুলেখা’ ১৯৬৭; ‘দুই ভাই’ ১৯৬৮, যার আউটডোর শুটিং হয় কুমিল্লা শহরে। ‘সংসার’ ১৯৬৮-এ ছবিতে তিনি কবিতাকে উপহার দেন। ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, ‘কুচবরণ কন্যা’ ১৯৬৮; ‘মনের মত বউ’ ১৯৬৯; ‘শেষ পর্যন্ত’ ১৯৬৯ ও ‘প্রতিশোধ’। ‘হাজার বছর ধরে’ ১৯৬৪ সালে আদমজী পুরস্কার লাভ করে।
১৯৬৫ সালে তার পরিচালিত ‘কাঁচের দেয়াল’ ছবিটি তৎকালীন পাকিস্তানে নিগার পুরস্কার লাভ করে। ৭টি শাখায় পুরস্কার দেয়া হয়। তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার পান। ১৯৭২ সালে তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘স্টপ জেনেসাইড’ ছবি দুটিকে বিশেষ পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (মরোণোত্তর) পান সাহিত্যে অবদানের জন্য। ১৯৯২ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ করেন। নায়করাজ রাজ্জাক ও আন্তর্জাতিক অভিনেত্রী ববিতা জহির রায়হানের আবিষ্কার। প্রথমে সুমিতা ও পরে সুচন্দাকে বিয়ে করেন। তাদের দু’জনের চার সন্তান, যথাক্রমেÑ প্রথম পক্ষে বিপুল রায়হান, আল রায়হান; দ্বিতীয় পক্ষে অপু রায়হান ও তপু রায়হান।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে খুঁজতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি চিরতরে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যান জহির রায়হান। আজও তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী জহির রায়হান আমাদের চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধকে ভালবেসেছেন। আসুন আমরা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি, পরম সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে পরপারে শান্তিতে রাখেন। আমরাও যেন চলচ্চিত্র থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে আল্লাহ ও রাসুলের পথে পরিচালিত করতে পারি। আমিন!
পোকিপসী, নিউ ইয়র্ক।