বহুমুখী কূটনীতিতে এখন আরো দক্ষ হতে হবে

বাংলাদেশে খবরের ঘনঘটা। আওয়ামী লীগ-বিএনপির ঠোকাঠুকি, রাজনীতির হাঙ্গামা, নতুন বছরের নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন উত্তেজনা। সামনে নির্বাচন, তা নিয়েও রংধনুর সাতরঙা খবর। জোট ভাঙা-গড়ার খবর। নতুন নতুন নামে নতুন নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ। রাজনীতির মাঠে গরম হাওয়া। পুবের সেই হাওয়াকে আরো গরম করে তুলেছে পশ্চিমের কিছু নাক গলানোর স্বভাব। বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অন্যের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী কিছু মানুষ তাতে আস্থা রেখে চললেও অনেকেই সেই সীমা মেনে চলতে চায় না, নিজেদের বিশ্বমোড়ল প্রমাণ করতে। তারা এখন বাংলার আকাশে অকল্যাণের ছায়া মেলে ডানা ঝাপটাচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় এখন নিত্যদিনের সংবাদ। নতুন বছর ২০২৩-এর গত ৪ জানুয়ারি সংখ্যার ঠিকানাতেও বাদ যায়নি। প্রথম পৃষ্ঠাতেই শোভা পেয়েছে আমেরিকার একটি খবর : ‘বাংলাদেশে যাচ্ছেন ডোনান্ড লু’। সংবাদের মূল শিরোনামের ওপর অবশ্য ‘র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাইবে ঢাকা’ এমন একটি কথা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত অর্থে এ খবরটির প্রতিপাদ্যও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার নাক গলানো। বর্তমান সময়ে শুধু আমেরিকা নয়, প্রতিবেশী ভারত, বাংলাদেশে বিনিয়োগ অংশীজন চীন, ইউরোপ এবং রাশিয়াও কথায় কথায় নাক গলিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। এ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থ এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও সংঘাত রয়েছে।

ডোনাল্ড লু বাংলাদেশে যাচ্ছেন। ডোনাল্ড লু হচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট। খবরটিতে ডোনাল্ড লুর সফরের বিষয়ে বিস্তারিত বলা না হলেও আভাস দেওয়া হয়েছে, মি. লু জানুয়ারির মাঝামাঝিÑ১৪ তারিখে ঢাকা যেতে পারেন দুদিনের সফরে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মি. লু আমেরিকার হয়ে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দেবেন। অন্যদিকে ঢাকা র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আমেরিকায় বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার, জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালসহ আরো কিছু বিষয় আলোচনায় তুলতে পারে।

নাম প্রকাশ করা যাবে নাÑএ শর্তে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে বাংলাদেশ-বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা হচ্ছেন ডোনাল্ড লু। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তিনিই। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ডোনাল্ড লুর হাত ছিলÑএমন অভিযোগ ইমরান খান প্রকাশ্যে নিজেই করেছিলেন।

ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফর কতটা গুরুত্ব বহন করবেÑতার আভাস পাওয়া যায় তার আগমন সামনে রেখে ঢাকার প্রস্তুতি থেকেই। ইতিমধ্যে তিন মন্ত্রীÑআইন, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্রয় তাদের নিজ নিজ দফতরের সচিব, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থার মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক ঢাকার পদ্মা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে রুদ্ধদ্বার বৈঠক সেরে নিয়েছেন। সেখানে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে এও আলোচনা হয়েছে, ডোনাল্ড লুর সঙ্গে সবাই যেন এক সুরে কথা বলেন। ডোনাল্ড লু আলোচনায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর মধ্যে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পাশাপাশি শ্রম অধিকার, দরপত্র প্রতিযোগিতায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। এ ছাড়া আইনের শাসন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়সমূহ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার রয়েছে, তার যথাযথ মোকাবিলা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে একটি সমন্বয়ক কমিটি গঠনের কথাও জানা গেছে।

ডোনাল্ড লু একজন দক্ষ কূটনীতিক। তার দক্ষতা পরীক্ষিত গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে কাজ করার মধ্য দিয়ে। তিনি ভারতে মার্কিন দূতাবাসে উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদেশিরা, বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর রাষ্ট্রদূতদের চলাফেরা দেখে অভিজ্ঞজনেরা ধারণা করছেন, পরাশক্তির দেশগুলোর সব রাষ্ট্রদূতের প্রতিই এখন বুঝি নির্দেশ জারি করা হয়েছে এই মর্মে যে বাংলাদেশকে নিজেদের তাঁবে রাখতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি-অর্থনীতি, সংস্কৃতি, উন্নয়ন সবকিছুতেই সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। তা ব্যাঙের জীবন থাক বা না থাক।
যখন বুর্জোয়া অর্থনীতিতে গ্লোবাল ভিলেজের কনসেপ্ট আসতে শুরু করল, তখন মানুষের ধারণা হয়েছিল, এ বুঝিবা শুধু বাণিজ্য স্বার্থই অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্য। এখন কোন স্বার্থটা যে বড়, কোন স্বার্থটা যে প্রধানÑনির্ধারণ করাটাই কঠিন। সবকিছু দেখেশুনে মনে হয়, এখন আর বিশেষ কোনো ক্ষেত্র নয়, সমগ্র দেশটাকেই নিজের করদরাজ্য বানিয়ে রাখতে হবে। শুধু বাণিজ্য কিংবা অর্থনীতি দিয়ে চলবে না, গোটা দেশটাকেই গিলে খেতে হবে। গোটা দেশটা না পেলে কিছুই পাওয়া হবে না।
রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতিÑসবকিছু হস্তগত করতে না পারলে ষোলো আনাই মাটি। তাই কূটনীতি এখন বড় বড় দেশের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কূটনীতিকদেরও সেভাবেই দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। সেই সব দক্ষ কূটনীতিককে সেই সব দেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে তাদের স্ট্র্যাটেজিকভাবে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
একসময় বাইরে থেকে বর্গি আসত, জলদস্যু আসত। তারা এক দেশের সম্পদ লুটেপুটে নিয়ে চলে যেত। তারপর কেউ কেউ এসে আঞ্চলিকভাবে সাম্রাজ্য গড়ে সম্রাটের শাসন প্রতিষ্ঠিত করত। ব্রিটিশরা লুটপাটের এই ধরন পাল্টে দিল। তারা ভারত উপমহাদেশে বণিকের বেশে ঢুকল সশস্ত্রভাবে। প্রথমে শুল্ক দেবেÑএই শর্তে ভারত উপমহাদেশে বাণিজ্য শুরু করলেও অল্প দিনেই তারা বণিকের বেশ ছেড়ে শাসকের বেশে আবির্ভূত হলো। এরপর একে একে তারা রাজা-বাদশাহ-সম্রাট সবাইকে যুদ্ধ করে, যুদ্ধের হুমকি দিয়ে তাদের পদানত করে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠা করে ঔপনিবেশিক শাসন শুরু করে দিল।

সেই থেকে বহিরাগত শাসনের ধরন পাল্টানোর শুরু। এরপর সভ্যতা এগিয়েছে, শাসকের চরিত্র পাল্টেছে। শোষণের ধরন পাল্টেছে। একটি রাষ্ট্রকে অনুগত রাখার কৌশল পাল্টেছে। এখন যুদ্ধ ছাড়াও জবরদখলের কত বিচিত্র সব পন্থা। অবরোধ, অর্থনৈতিক অবরোধ, বাণিজ্যিক অবরোধ। নিজ দেশে এক চরিত্র, অনুগত রাষ্ট্রে আরেক চরিত্র। নিজ নিজ দেশে একেক রকম গণতন্ত্র, একেক রকমের মানবাধিকার। তাঁবেদার রাষ্ট্রে একই গণতন্ত্র, একই মানবাধিকারের সংজ্ঞা পাল্টে যায়। দেশে দেশে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আধুনিক কূটনীতি যেমন এখন একটি দেশকে অনুগত রাখার অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র, তেমনি এই অস্ত্রের ধারও শানিয়ে নিতে হচ্ছে সময়ের চাহিদা মতো। এই কূটনীতি, পাল্টা কূটনীতিতে যে যত পারঙ্গমতা দেখাতে পারবে, সে তত রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনে অগ্রগামী। আমাদের কূটনীতি এ ক্ষেত্রে কতটা সময়ের উপযোগী, তা ভাবার বিষয়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা কতটা স্বাধীন, সার্বভৌম তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় একটা সময় ছিল যখন সমর শক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তিই ছিল প্রধান শক্তি। বর্তমান সময়ে কূটনীতিও ওই দুই শক্তির পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে। এদিক থেকে কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা অর্জন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশ তা পারেনি। কেন পারেনি, তার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে খুব সংক্ষেপে বলা হয়, যাদের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন, তারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যার আস্থার মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাইতো আমরা সব সময় অন্যের কূটনীতি নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকি, নিজেদের কূটনীতির সক্ষমতা দিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থরক্ষায় সাফল্য দেখাতে পারি না।

আজকের দিনে কূটনীতির এই বিষয়টা মনে করি খুব বেশি ভাবার সময় এসেছে।