বাংলাদেশকে চাপে রাখতেই ভারতের এনআরসি

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিকট প্রতিবেশী ভারতের ইচ্ছা ও পরিকল্পনামাফিক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন জেনারেল এইচ এম এরশাদ। এটা কূটনৈতিক ও সচেতন রাজনৈতিক মহলের কাছে প্রতিষ্ঠিত, সেই ভারতের নেপথ্য পরিকল্পনা ও মদদে সেনাশাসক এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।

নয়াদিল্লিতে ক্ষমতায় ছিলেন রাজীব গান্ধী। বলা নেই, কওয়া নেই নয়াদিল্লি থেকে বাংলা ভাষাভাষীদের হঠাৎ করেই পুশব্যাক করা হয়। ট্রাকে ট্রাকে তাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকানো শুরু হয়। ভীতবিহবল এরশাদ এ নিয়ে বাড়াবাড়িতে না গিয়ে নেপথ্যে আত্মসমর্পণ করেন। এরশাদ সরকারের ওপর ভয়ংকর এ চাপ সৃষ্টির মূল কারণ ছিল এরশাদের ভারতকে হালকা করে দেখা, অবজ্ঞা করার মানসিকতা। এরশাদ সৌদি আরবের অনুরোধে কুয়েতে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন ভারতকে আগাম কিছু না জানিয়েই।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পাদিত ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশ অন্য দেশের বিনা অবগতিতে তৃতীয় দেশে তার দেশের সৈন্য পাঠাতে পারবে না। কুয়েতে সৈন্য পাঠানোয় সৌদি আরব, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো দারুণভাবে উৎফুল্ল হয়। কিন্তু এরশাদের গতি হয়ে ওঠে নড়বড়ে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পেছনে ভারতের এরশাদবিরোধী অপ্রকাশ্য ভ‚মিকা ছিল প্রধানত এরশাদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে মৈত্রী সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ ভারতের প্রায় সব দাবি মেনে নিয়েছে। তাদের সুদীর্ঘকালের সমস্যা-সংকটের সমাধান দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটাও প্রমাণিত যে ভারত তার স্বার্থকেই বরাবর প্রাধান্য দিয়ে আসছে। তার স্বার্থের ব্যাঘাত হলে মৈত্রী কত দিন টিকে থাকবে তা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ। কিছু কিছু তার প্রমাণও পাওয়া যায়। আসাম থেকে দীর্ঘকাল যাবৎ বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষীদের বের করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ বলে কূটনৈতিক মহল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

ভারতে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে দুর্ভাবনায় আছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফরকালে এনআরনসি নিয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছেন। বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার ভারতীয় প্রতিপক্ষের আশ্বাসে ভরসা করে আশা প্রকাশ করেছে যে ভারত তার কথা রাখবে। সংশয়, শঙ্কা ক্রমে প্রবল আকার নিচ্ছে বলে এনআরসি প্রশ্নে ভারত তার কথা রাখতে পারবেই তার নিশ্চয়তা কোথায়? তাদের আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন না ঘটলে বাংলাদেশ কী করবে।

আসাম বিজেপির নেতারা এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বাংলাদেশি বলে দাবি করছেন। প্রভাবশালী নেতা এবং রাজ্যসভা সদস্যরাও এ দাবিতে সোচ্চার। এনআরসি-বহির্ভূত ৯ লাখ বাংলাভাষীকে তারা আসাম থেকে বিতাড়ণের কথা বলছেন। আসামের পর পশ্চিমবঙ্গেও তারা নাগরিক তালিকাপঞ্জি করা ও তাদের ভাষায় বহিরাগতদের বিতাড়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরব হলেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করে নয়াদিল্লিকে তার পরিকল্পনা থেকে সরিয়ে আনতে পারবেন বলেও মনে করা হয় না।

সামনে বিধানসভা নির্বাচন। তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীদের শুধু কোণঠাসা করতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন আরসি পরিকল্পনা ধরে ভারত সরকার এগোচ্ছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করেন না। তাদের ধারণা, বাংলাদেশের ওপর খড়্গ ঝুলিয়ে রাখছে ভারত। চীনের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উষ্ণ সম্পর্ককে ভারত সহজভাবে নিচ্ছে বলে তারা মনে করেন না। চীনের ওপর বাংলাদেশের আর্থিক নির্ভরতা আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীন বাংলাদেশকে তাদের পাশে পাবে বলেই আশা করছে। ভারত ও চীনের সাথে মধুর সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারসাম্যের কূটনীতি এ পর্যন্ত সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে আছে। চীন, ভারত উভয়েই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পাশে আছে ঘোষণা করলেও মিয়ানমারের আচরণে তার প্রতিফলন নেই। মিয়ানমার থেকে ভবিষ্যতে যে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? অপরদিকে বিজেপির রাজ্য নেতারা ভারতীয় অসমীয় এনআরনসি-বহির্ভূতদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর কথা নিতান্ত হুমকি বা স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থপ্রসূত মনে করার ভিত্তি নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহলের মতে, এর পেছনে সুদূরপ্রসারিত উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের আন্তরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে ভারতের সাথে সম্পর্ক নতুন মাত্রার উচ্চতায় উঠেছে। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছর যে এই ধারা অব্যাহত থাকবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ভারতের স্বার্থের প্রতিকূলে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ না হলেও কোনো পরোক্ষ ভূমিকা কি ভারত মেনে নেবে? সেক্ষেত্রে সে সময় যারাই ক্ষমতায় থাকুন, তাদের হয়তো এরশাদের সময়কার ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তির মোকাবিলা হবে। ৪০-৫০ ধরে ভারতে অবস্থানকারী বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয়দের নাগরিক পঞ্জির নামে বাংলাদেশে পুশইন করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছে নাকি!