বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে স্ক্যামে জড়ানোর অভিযোগ

‘স্ক্যামে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশিরা’। অভিযোগ গুরুতর। বিদ্বজ্জনেরা বলে থাকেন, চরিত্র হারালে মানুষের আর কিছুই থাকে না। বিশেষ করে, আমরা যারা স্বদেশ, স্বজন, পায়ের নিচে শক্ত মাটি ছেড়ে প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছি। বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে ভাগ্য বদলানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দরভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে দেশের মায়া ছেড়েছি। সেই আমরা যদি পরবাসে এসে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ি, স্ক্যাম বা নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে বিপথগামী হই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার এবং স্বদেশ-স্বজন ছাড়ার উদ্দেশ্য শতভাগই মাটি।

চারপাশের খবরাখবরে মনে হচ্ছে, আমরা যেন সেই দুর্ভাগ্যের পথেই পা বাড়িয়ে দিচ্ছি। গত ৪ জানুয়ারি, বছরের প্রথম সংখ্যা, ঠিকানাতেই সে রকম হতাশার একটি খবর : ‘স্ক্যামে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশিরা’। প্রকাশিত খবরটি এ রকম : ‘বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে স্ক্যামাররা। স্ক্যামে জড়িতদের মধ্যে সবার আগে নাম উঠে আসছে ফিলিপিনো ও ভারতীয়দের। এরপর রয়েছে পাকিস্তানিদের নাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, দ্রুত ধনী হতে স্ক্যামিংয়ের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশিদের নামও আসছে। এসব বাংলাদেশি নানাভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহ করে তা সরবরাহ করছে পেশাদার স্ক্যামারদের হাতে।

কথাগুলো এমনি এমনি বলা হচ্ছে না। হাওয়ায় ভেসেও আসছে না এ রকম দুঃসংবাদ। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রেই পাওয়া যাচ্ছে এসব তথ্য, যা প্রবাসীদের বুকে ঝড় তুলছে। ওইসব সূত্র বলছে, কীভাবে বাংলাদেশিরা ভয়ংকর স্ক্যাম অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নিজেদের স্বপ্ন চুরমার করে দিচ্ছে। আবার কমিউনিটির জন্য বদনামও বয়ে আনছে। জানা যায়, মোটর ভেহিকেল অফিস, মোবাইল ফোন অপারেটর, গাড়ির ইন্স্যুরেন্স, ফুয়েল পাম্প, শপিংমল, সুপার মার্কেট, অনলাইন শপিংসহ নানা মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য চুরি হচ্ছে। পরে এসব গ্রাহকের ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ড থেকে অর্থ চুরি করছে। এ এক বিরাট অপরাধ নেটওয়ার্ক। এত দিন এই স্ক্যাম অপরাধের অন্ধকার জগতের সঙ্গে ফিলিপিনো, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্য অনেক দেশের নাম জড়িত থাকলেও বাংলাদেশের নাম জড়িত থাকার কথা শোনা যায়নি। এখন বাংলাদেশিদের নামও জড়িত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্তে বেশ কিছু বাংলাদেশির নাম পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (এফসিসি) টেলিফোন স্ক্যামের অনেক ঘটনার তদন্ত করছে।

একজন ভুক্তভোগী প্রবাসী বাংলাদেশি, যিনি নিজে স্ক্যামের শিকার, তিনি জানিয়েছেন, গত নভেম্বর মাসে তিনি জ্যামাইকার একটি সুপার মার্কেট থেকে শপিং করে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করেন। এক সপ্তাহ পর ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্টে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ড থেকে সমপরিমাণ অর্থ দ্বিতীয়বার কেটে নেওয়া হয়েছে। সুপার মার্কেটে অভিযোগ করলে তারা জানায়, দ্বিতীয়বারের টাকা ভিন্ন একটি কোম্পানি কেটে নিয়েছে! ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিতে অভিযোগ করা হয়েছে। এখনো তদন্ত চলছে বলে জানানো হয়েছে। ওই অর্থ স্ক্যাম হওয়ার আগে ভুক্তভোগী একটি ফোন কল পান। ফোনদাতা বাংলায় একটি হোম কেয়ারের পক্ষে ফোন করে তার ঠিকানা ও জন্মদিন জানতে চায়। যেহেতু তিনি হোম কেয়ার সার্ভিস নেন, সংগতভাবেই ভেরিফাই করার কথা বলায় তিনি কোনো সন্দেহ না করে ঠিকানা ও জন্মতারিখ বলে দেন। তিনি ধারণা করছেন, এর পরই তার অর্থ নিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফোন নম্বর ক্লোন করে অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ইদানীং বৃদ্ধি পেয়েছে। এই স্ক্যামেও বাংলাদেশিদের জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, স্ক্যামাররা তার ফোন নম্বর ক্লোন করে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ২২০০ ডলার তুলে নিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে তার অ্যাকাউন্ট নম্বর স্ক্যামাররা পেল, তা তার বোধগম্য নয়। প্রিপেইড ফোন নম্বর স্ক্যামাররা খুব সহজেই ক্লোন করতে পারে। এ কারণে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো প্রিপেইড নম্বর ব্যবহার না করা, অন্যথায় প্রিপেইড নম্বর অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
এদিকে মোটর ভেহিকেল বিভাগ নিউইয়র্ক স্টেট আইডি নিয়ে ‘স্ক্যাম অ্যালার্ট’ জারি করলেও ফল পাচ্ছে না বলে জানা গেছে। প্রতারকেরা তাদের প্রতারণা করেই চলেছে। স্ক্যামাররা ফোন কল, টেক্সট, ই-মেইলসহ সোশ্যাল মিডিয়া বেছে নিয়েছে তাদের প্রতারণা কর্মে। ডিএমভি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলছে, এসব কল বা মেইল পেলে তা এড়িয়ে যেতে বা ট্রাশ বক্সে ফেলে দিতে। স্ক্যামাররা সাধারণত বলে থাকে, ‘আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রস্তুত। দ্রুত পেতে হলে কয়েকটি ব্যক্তিগত তথ্য দিন।’ ডিএমভি কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এ ধরনের কোনো যোগাযোগ নিউইয়র্কবাসীর সঙ্গে করছে না। কোনো তথ্যও চায় না। রিয়েল আইডি নিয়ে কিছু জানতে হলে সবাইকে ডিএমভি অফিসে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আরো একটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুরু হচ্ছে ট্যাক্স মৌসুম। এ মৌসুমকে বলা হয় স্ক্যামারদের জন্য সবচেয়ে উত্তম মৌসুম। ট্যাক্স ফাইলিংয়ের পর স্ক্যামাররা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি করার জন্য ওত পেতে থাকে। তাই খুব সতর্কতা প্রয়োজন ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণে। এ ছাড়া স্ক্যামাররা প্রলোভনের নানা ফাঁদ পাতে প্রতারণার কাজ চালিয়ে যেতে। চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বিদেশে নিয়ে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা লোভ দেখিয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। এ নিয়ে অনেক আকর্ষণীয় সব বিজ্ঞাপনে ভুলে সহজ-সরল অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার হন। সব বিষয়েই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ স্ক্যামারদের খপ্পরে না পড়েন।

তবে আরো একটি বিষয় কমিউনিটি হিসেবেও আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, স্ক্যামাররা কেবল যে শুধু মানুষকেই প্রতারিত করছে, তা নয়। আমাদের কমিউনিটির সুনামেও কালিমা লেপন করছে। বাংলাদেশি কমিউনিটি এ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সুনাম অর্জন করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা শিল্প-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশিদের সুনাম অনেক। মূলধারার রাজনীতিতেও এখন আমাদের সরব পদচারণ লক্ষ করা যাচ্ছে। সুনাম, মর্যাদা, অবস্থান অর্জন করতে কঠিন সাধনা চালাতে হয়। কিন্তু তা খোয়াতে কষ্ট করতে হয় না। কতিপয় মানুষের অপকর্মে খুব সহজেই তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যার মধ্যে স্ক্যামারদের স্ক্যামিং অন্যতম।

এদের দুষ্কর্মের হাত থেকে নিজেদের এবং সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটিকে রক্ষার জন্য আমাদের সবাইকে সমবেতভাবে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে সবার সচেতন হয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই। কতিপয় দুষ্কর্মের জন্য আমাদের সমষ্টিগত অর্জন যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি।