বাংলাদেশিরাও স্মৃতিতে বেঁচে আছেন

৯/১১ এ সন্ত্রাসী হামলায় টুইন টাওয়ারে নিহত বাংলাদেশিরা। (উপরে বাম থেকে) সালাহউদ্দিন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহজাহান, নূরল হক মিয়া এবং (নিচে বাম থেকে) সাব্বির আহমেদ, শাকিলা ইয়াসমীন এবং আবুল কালাম চৌধুরী।

ঠিকানা ডেস্ক : টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় ৭ বাংলাদেশি নিহত হন। তারা হলেন মুক্তাগাছার নূরুল হক মিয়া এবং তার স্ত্রী মৌলভীবাজারের শাকিলা ইয়াসমিন, সুনামগঞ্জের সাব্বির আহমেদ, কুমিল্লার মো. শাহজাহান, সিলেটের সালাহউদ্দিন চৌধুরী, নোয়াখালীর আবুল কে চৌধুরী ও মোহাম্মদ সাদেক আলী।
শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়া। নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়ামের ‘নর্থ মেমোরিয়াল পুলের’ স্মৃতিফলকে পাশাপাশিই আছে নাম দুটি। তারা দুজন কাজ করতেন টুইন টাওয়ারের মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান কোম্পানিতে। ২০০১ সালের এই দিনে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলায় (৯/১১) নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনানের ২৯৫ জন কর্মী ও ৬৩ জন পরামর্শক নিহত হলেও ওই কোম্পানি আলাদাভাবে মনে রেখেছে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী শাকিলা ও নূরুলকে।
তাদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান লিখেছে, ‘শাকিলা ও নূরুলের প্রথম দেখা হয় সম্ভবত ১৯৯৫ সালে তাদের এক বন্ধুর বিয়েতে। বিয়ের আগে তারা প্রায় পাঁচ বছর দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। তারা ছিলেন অত্যন্ত সুখী এক দম্পতি। শাকিলা ছিলেন নূরুলের জন্য; আর নূরুল ছিলেন শাকিলার জন্য। তারা পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন। আমরা যত দূর জানি, ১১ সেপ্টেম্বরের নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র দম্পতি শাকিলা ও নূরুল।’ তারা দুজন থাকতেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল ২০০৬ সালে শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়ার নামে নিউইয়র্কে দুটি রাস্তার নামকরণ করে। ৯/১১ হামলায় নিহত বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি-আমেরিকানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায় শাকিলা (২৬) ও নূরুল (৩৬) সম্পর্কে। বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে তারা নিহত হন। শাকিলার অফিস ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১ নম্বর টাওয়ারের ৯৭ তলায়। আর নূরুলের অফিস ছিল একই টাওয়ারের ৯৩ তলায়। সন্ত্রাসী হামলার অংশ হিসেবে প্রথম ফ্লাইটটি যখন তাদের ওই টাওয়ারে আঘাত হানে, তখন নূরুল ৯৯ তলায় একটি বৈঠকে ছিলেন।
মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান কোম্পানি শাকিলার স্মরণে লিখেছে, ‘১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট বাংলাদেশে সংকটময় সময় ছিল। সেদিন বিকেলেই জন্ম হয় শাকিলার। শৈশবেই অত্যন্ত প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা শাকিলা স্কুলের অনেক অনুষ্ঠানে গান গাইতেন ও কবিতা আবৃত্তি করতেন।’
৯/১১ মেমোরিয়ালে শাকিলার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তার ডায়েরির ছবি সংরক্ষিত আছে। ওই ডায়েরির বাঁ পাশের পৃষ্ঠায় নিজ হাতে লেখা রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই তুমি তাই গো (২)’, ডান পাশের পৃষ্ঠায় মান্না দের আধুনিক গান ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’।
স্মৃতিতে বেঁচে আছেনবাবা শরিফ এ চৌধুরী ও মা শওকত আরা শরিফের সঙ্গে শাকিলা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে। ২০১৩ সালে ৯/১১-এর দ্বাদশ বার্ষিকীতে ‘নর্থ মেমোরিয়াল পুলের’ শাকিলার নামের পাশে তার মা শওকত আরা শরিফের কান্নার ছবি ধরা পড়ে রয়টার্সের ক্যামেরায়।
৯/১১ মেমোরিয়ালে শাকিলার জন্মস্থান ঢাকা এবং নূরুল হক মিয়ার জন্মস্থান বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মেমোরিয়ালে আরো চারজন নিহতের জন্মস্থান হিসেবে বাংলাদেশের নাম আছে। নিহত আবুল কে চৌধুরী (জন্ম ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি) কাজ করতেন ক্যান্টর ফিটজেরাল্ডে। স্বজনদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আবুল কে চৌধুরীর নামের পাশে তারই আত্মীয় হিসেবে নিকোলাস ক্রেগ ল্যাসম্যানের (জন্মস্থান : নিউইয়র্ক) নাম রয়েছে।
১৯৬০ সালে কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ শাহজাহান কাজ করতেন মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনানে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। রাত ১০টার আগে ফিরতে পারবেন না বলে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাজে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক মোহাম্মদ শাহজাহান। আদরের মেয়ে শিরিনকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে গুডবাই বলেছিলেন। শেষবারের মতো বাবার বলে যাওয়া ‘গুডবাই’-এর স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠছে শিরিন। টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ থেকে পোড়া মাটি সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছে শিরিন।
মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরীর (জন্মসাল ১৯৬২) জন্মস্থান সিলেটে। টুইন টাওয়ারে হামলার দিন তিনি নর্থ টাওয়ারের ১০৬ ও ১০৭ তলায় ‘উইন্ডোজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’ কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণকারী সাব্বির আহমেদও ছিলেন ‘উইন্ডোজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের’ কর্মী।
টুইন টাওয়ারে হামলায় নিহতদের স্মরণে সেখানে গ্রাউন্ড জিরোতে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। ৯/১১-এর দশম বার্ষিকীতে সেই স্মৃতিসৌধটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। টুইন টাওয়ারের ভবন দুটির স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি পুল। সেখানে ৩০ ফুট গভীরে চারপাশ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ে পানি। পুল দুটির চারপাশের দেয়ালে তামায় খোদাই করা আছে নিহতদের নাম।
৯/১১-এর ওই সন্ত্রাসী হামলার পর ঘটনাস্থল ও এর আশপাশে ৫০ থেকে ৬০ জন বাংলাদেশি/বাংলাদেশি-আমেরিকান নিখোঁজ ছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ছয়জন নিহত হওয়ার তথ্য মেলে। সংবাদপত্র বিক্রেতা মোহাম্মদ সাদেক আলী (৬২) ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার সময় ঘটনাস্থলের খুব কাছে ছিলেন। তার কোনো খোঁজ মেলেনি।
মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী সাধারণত সন্ধ্যার শিফটে কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য তিনি সকালের শিফটে কাজ নিয়েছিলেন। আর সেদিনই ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। ওই হামলার ৪৮ ঘণ্টা পর তার সন্তান পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে।