বাংলাদেশি আমেরিকানদের অনেকেই ভোট দিতে আগ্রহী নন

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অভিবাসীদের গুরুত্ব বাড়ছে। এই গুরুত্ব বাড়লেও যত সংখ্যক বাংলাদেশির বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আছে এবং দিতে পারেন সেটি বাস্তবে হচ্ছে না। বেশিরভাগ ভোটারের অনাগ্রহের কারণে সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে আসছে না। কারণ বাংলাদেশি- আমেরিকানদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ চেষ্টা করে যাচ্ছেন মূল ধারায় অবস্থান করে নেওয়ার জন্য। নিউইয়র্ক সিটির সিটি কাউন্সিল, অ্যাসেম্বলিম্যান, ডিস্ট্রিক্ট লিডার, জুডিশিয়াল ডেলিগেটসহ বিভিন্ন পদে নির্বাচন করছেন। সেটি করতে গিয়ে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন জয়ী হতে। তবে যারা অংশ নিচ্ছেন তারা বেশিরভাগই জয়ের পথে হাঁটতে পারছেন না। একাধিক প্রার্থীর মতে এর মূল কারণ আমাদের কমিউনিটির মানুষেরা যারা ভোটার তারা সবাই ভোট দিচ্ছেন না। অথচ বাংলাদেশেী আমেরিকানরা যদি নিজের ভোটটি তার কমিউনিটির প্রার্থীকে দিতেন তাহলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। বেশ কয়েকটি ডিস্ট্রিক্ট রয়েছে যেখানে বাংলাদেশীদের ভোটেই প্রার্থীদের জয় সুনিশ্চিত হয়। এরমধ্যে ডিস্ট্রিক্ট ২৪ একটি অন্যতম ডিস্ট্রিক্ট।
সম্প্িরত নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন তারা মনে করেন আমাদের কমিউনিটির মানুষকে আরো বিপুল সংখ্যকভাবে ভোট দেওয়ার জন্য আগ্রহী হতে হবে এবং ভোট দিতে হবে। সবাই যদি তার ভোটটি তার নাগরিক দায়িত্ব মনে করে ভোট দেন তাহলে আমাদের প্রার্থীরা এতটা পিছিয়ে থাকতেন না বা থাকবে না।
ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রার্থী মাজেদা উদ্দিন বলেন, আমাদের বাংলাদেশীরা এখানে অনেকেই ভোটার। কিন্তু যারা ভোটার তারা সবাই কি ভোট দিতে যাচ্ছেন? যাচ্ছেন না। কিন্তু তারা যে গিয়েই ভোট দিতে হবে এমন নয়। তারা অ্যবসেন্টি ব্যালটে ভোট দিতে পারেন। সেটি কি সবাই দিচ্ছেন? তা দিচ্ছেন না। এমনকি আগাম ভোট দেওয়ারও সুযোগ আছে, সেটি তারা দিচ্ছেন? দিচ্ছেন না। কারণ যারা সত্যিকার অর্থেই মনে করেন যে এটি তার দায়িত্ব যে তার ভোট তিনি দিবেন, তারা যাচ্ছেন। বেশিরভাগই যাচ্ছেন না। আমরা যারা প্রার্থী হই তারা ভোটারকে ভোট দিতে উৎসাহিত করি। বাসায় বাসায় গিয়ে ভোট চাই। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভোট চাওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সভা ও বৈঠক করেও ভোট চাওয়া হয়। আমরা এবারের নির্বাচনে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছি। এই প্রচারণা অনুযায়ী এবং প্যানেল অনুযায়ী আরো ভোট পাওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু সেটি পেলাম না। মাত্র এক ভোটের জন্য ফলাফল আটকে থাকলো। রিকাউন্টিং করতে হলো। অথচ আমাদের যারা আছেন তারা যদি ভোট দিতে আসতেন, তাহলে তাদের ভোটেই পাস করা সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, আমি আমার জন্য বলছি না। এটি আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এবং আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরির জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথাগুলো মূলধারায় তুলে ধরতে হবে। নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
ডিস্ট্রিক্ট ২৪ এ থেকে জুডিশিয়াল ডেলিগেট পদে প্রার্থী হয়েছিলেন মোহম্মদ আখতার বাবুল। তিনি বলেন, আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং ভাল ভোট পেয়েও জয়ী হওয়া সম্ভব হলো না কারণ আমার কাঙ্খিত ভোট লাভ করতে পারিনি। আমি নিজেই প্রায় দশ হাজার ভোটারের সাথে যোগাযোগ করেছি। অনেক ভোটারের বাসায় গিয়েছি। বাসায় গিয়ে ভোট চাওয়ায় আমরা আশা করেছিলাম এখানে যারা বাস করেন তারা ভোট দিবেন। কিন্তু সেই ভোটতো তারা দিলেন না। ১৬’শ এর বেশি ভোট পেয়েছি। কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট ২৪ এর এই নির্বাচনে আমাদের ভোটার ছিল ত্রিশ হাজার। এই ত্রিশ হাজার ভোটের মধ্যে যে ১৬’শর বেশি ভোট পেলাম সেই ভোটতো বেশির ভাগই ধরে নিলাম আমার কমিউনিটির ভোট। কিন্তু আমি যে প্যানেলে ছিলাম সেই প্যানেলের কারণেও কিছু ভোট পেয়েছি। প্যানেলের ভোট পেলেও জয়ী হওয়া সম্ভব হয়নি। এর কারণ হলো মানুষ ভোট দিনে যাননি এটাই বাস্তব চিত্র। আগামী দিনে আমরা আশা করছি, ভোটাররা আগামী দিতে বিষয়টি উপলব্ধি করবেন এবং ভোট দিতে উৎসাহিত করবেন একে অপরকে। তারা ভোট দিলে আমরা জয়ী হবো এটা মনে না করে মনে করতে হবে যে ভোটটি আমরা এই দেশে আমাদের কমিউনিটিকে আরো এগিয়ে নিতে চাই এবং কমিউনিটির গুরুত্ব বাড়াতে চাই। পাশাপাশি আমাদের কথাগুলো মূলধারায় তুলে ধরতে চাই।
এর আগে সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে শাহানা হানিফ জয়ী হয়েছেন। কুইন্স কাউন্টির সিভিল কোর্টের জজ পদে এটর্নী সোমা সায়ীদ জয়ী হয়েছেন। তারা দুইজনেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। দুটি অঙ্গনে তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের এই সাফল্য কেবল তাদের একার নয়। এই সাফল্য পুরো কমিউনিটির। তারা কমিউনিটির ভাবমূর্তি উজ্জল করেছেন। মূলধারায় তাদের অবস্থান বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এই রকম জয়ের মুখ দেখতে অনেকেই চান। এরমধ্যে কংগ্রেস ম্যান পদে মিজান চৌধুরী, সিটি কাউন্সিলম্যান পদে মৌমিতা আহমেদ, মিজবা আবদীন, হেলাল শেখ, সাবুল উদ্দিন, সাইফুল খান হারুন, শাহ শাহেদুল হক অন্যতম, এছাড়াও অন্যান্য পদে ২৮ জুনের প্রাইমারী নির্বাচনে এ্যাসেম্বলীম্যান পদে মিজান চৌধুরী, অন্যান্য পদে আহনাফ আলম, শাহনেওয়াজসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী হয়েছিলেন। তারা জয়ের মুখ দেখতে পারেননি।
আশার কথা হচ্ছে ২৮ জুনের নির্বাচনে জামি কাজী, নূসরাত আলম, জামিলা উদ্দিন, মোহম্মদ সাবুল উদ্দিন, মাহতাব খান জয় লাভ করেছেন। তাদের জয়ের মধ্য দিয়েও তারা কমিউনিটির গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছেন। মাজেদা উদ্দিন জয়ের পথে রয়েছেন। তবে এখনও নিশ্চিত নয় তার জয়। এক ভোটের ব্যবধার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সাথে। যারা জয়ী হয়েছেন তাদের প্রত্যাশা ছিল আরো বেশি ভোট পাবেন। কারণ তাদের এলাকাগুলোতে অনেক ভোটার রয়েছেন।
কমিউনিটির একাধিক নেতা বলেছেন, আমাদের বাংলাদেশী আমেরিকানরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু নির্বাচন করার আগে যারা প্রার্থী হচ্ছেন তাদেরকে এটাও বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে তার অবস্থান কি, ভোটারদের কাছে তার গ্রহনযোগ্যতা কতখানি, কতটা এগিয়ে নিতে পারবেন, ভোটারদের ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের কীভাবে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারবেন এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কার কতখানি, নিজের যোগ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিচার করতে হবে। প্রচার প্রচারণাও চলাতে হবে। এছাড়াও ভোটারদের ভোট নিতে হলে বিভিন্ন ভাবে উৎসাহিত করতে হবে। যে এলাকায় প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা আছে সেখানে আলোচনার ভিত্তিতে বেশি সংখ্যক প্রার্থী না হয়ে একজনকে এক পদে প্রার্থী করা হলে সমন্বিতভাবে জয়ী করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আগামী দিনে আরো চেষ্টা করতে হবে ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করতে । আর ভোটারদেরকে অবশ্যই নিজের কমিউনিটির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই ভোট দিতে হবে।