বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেলিনা বেগম : ব্রিটেনে ইটন বিতর্কে সেরা

সারা বিশ্বে এখন বাংলার জয়-জয়কার। গেল নভেম্বরে স্কুল পর্যায়ের সর্বোচ্চ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যুক্তিতর্ক প্রদানের মাধ্যমে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সম্মানজনক ইটন পুরস্কার জিতে নেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দরিদ্র শিক্ষার্থী সেলিনা বেগম। ইটন বিতর্ক প্রতিযোগিতা ব্রিটেনের স্কুলপর্যায়ের সর্বোচ্চ বিতর্ক অনুষ্ঠান। ওই বিতর্ক প্রতিযোগিতার সাতকাহন ঘটা করেই তুলে ধরে বিশ্বের সেরা গণমাধ্যম ডেইলি মেইল। সেলিনাকে নিয়ে লেখা হয়েছিল অনুপ্রেরণীয় গল্প।
ইটন ব্রিটেনের স্কুলপর্যায়ের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। শুরু হয়েছিল ২০০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে। অংশ নিয়েছিলেন ব্রিটেনের খ্যাতনামা সব স্কুলের শিক্ষার্থীরা। প্রতিযোগিতার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ চারে উঠে এসেছিলেন এমিরা মেহরিন, মুয়াজ ইরফান, আসমা রহমান এবং সেলিনা বেগম। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিক। বিতর্কে জাঙ্ক ফুড, গোপনীয়তার অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদ- বিলোপের মতো বিষয়গুলোতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন সেলিনা। এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত ফলাফল আসে নভেম্বরের ১১ তারিখ। একাধিক বোর্ডিং স্কুলের কঠোর বিতর্ক প্রতিযোগিতা করতে হয়েছিল সেলিনাকে। বিতর্কে জাঙ্ক ফুড, গোপনীয়তার অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদ- বিলোপের মতো বিষয়গুলোতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন সেলিনা। উভয় দল চূড়ান্ত পর্বে ভালো পারফরম্যান্স করেছিল। বিশেষ করে বিতর্কের দ্বিতীয় পর্বে মুয়াজকে ১৬-২০ ব্যবধানে হারিয়ে জয়ের মুকুট হাসিল করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেলিনা। শুধু তাই নয়, সেলিনা এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেরা ৬ বক্তার তালিকায়ও নিজের নাম লেখান। এই অর্জন সম্পর্কে সেলিনা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটি ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। তবে আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিযোগিতায় অন্যদের চেয়ে ভালো করা। এই উচ্চাভিলাষ নিয়েই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আমাদের আত্মবিশ্বাস। এই বিতর্কের অংশ হতে পারাটাই ছিল আমার জন্য সম্মানজনক।’
বিজয়ী হওয়ার পর সেলিনা বলেন, আমার ছয়টি ফর্মের বিতর্ক সমন্বয়কারী ছিলেন জেরোম সিং। তিনিই আমার সাফল্যের চাবিকাঠি। ইটন এবং অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে মুহুর্মুহু তারা বিতর্কে প্রশ্ন-উত্তর ছুড়ে দিচ্ছিল। প্রথমে তো প্রতিপক্ষের দেওয়া জাঙ্ক ফুড, গোপনীয়তার অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদ- বিলোপ বিষয়ক মতামতগুলোর গতিবিধি দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু জেরোম সিং সাহস দেন আমি যেন ভয় না পাই। আমার মতামতগুলোও সেই রকমই চিন্তা করছিল যেমনটি দিয়েছি।’
বাংলাদেশের জন্য গৌরব ছিনিয়ে আনা মেয়েটির নাম সেলিনা বেগম। বয়স মাত্র ১৬। ব্রিটেনে বসবাসরত এক হতদরিদ্র অভিবাসীর মেয়ে সেলিনা। সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত ইস্ট লন্ডনের মেনর পার্কে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন সেলিনা। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে অন্য দশজন শিশুর মতো জীবন নয় সেলিনার। ১৯৯০ সালে তার মা-বাবা বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন। সাদামাটা জীবন কাটাতে হয় সেলিনা ও তার পরিবারকে। নিজের এই অর্জনের পুরোটা বাবা-মায়ের জন্যই সম্ভব হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানায়। সেলিনা বলেন, কষ্ট হলেও নিজের স্বপ্নের পথে পা বাড়াতে বাবা-মা-ই আমাকে উৎসাহিত করেছেন। বাবা চলতশক্তিহীন হওয়ায় মায়ের অধিকাংশ সময় কাটে বাবার পেছনেই।’
সেলিনা এর আগে কম বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সাফল্যের দেখা পাননি। সেলিনা নিজেই বলেন, ‘এর আগেও আমি কয়েকটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম; কিন্তু কখনই এ পর্যায়ে ছিলাম না।’
লন্ডনের নিউহ্যাম কলেজিয়েট সিক্সথ ফর্ম সেন্টারের শিক্ষার্থী সেলিনা। এ মাসের গোড়ার দিকে তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিন সহপাঠীকে নিয়ে বিশ্বখ্যাত ইটন কলেজে আয়োজিত বার্ষিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ওই প্রতিযোগিতায় সেলিনার ক্ষুরধার যুক্তি মুগ্ধ করে বিচারক প্যানেলের সদস্যদেরও। সেলিনার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হন নিউহ্যাম কলেজিয়েট সিক্সথ ফর্ম সেন্টারের শিক্ষকরাও। স্কুলের পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি স্কুলটির ওয়েব পেজে শুভেচ্ছা বার্তা দেয়। সেখানে লেখা হয়, ‘সেলিনার এই পারফরম্যান্সে আমরা আনন্দিত। তার এই কৃতিত্বের কারণে সে সেরা ছয় বক্তার কাতারে উঠে এসেছে। সঙ্গে সুনাম বয়ে এনেছে স্কুলেরও। তার এই অর্জন সেরা বক্তার শিরোনামও দাবি করে। তার চমৎকার কৃতিত্বে কোনো সন্দেহ নেই যে, আগামী বছর ‘এসসিএস’ বিতর্ক সফলতার উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
সেলিনা নিউহ্যাম কলেজিয়েট সিক্সথ ফর্ম সেন্টারের এ-লেভেলের শিক্ষার্থী। তিনি মূূলত গণিত, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করছেন। ইতিহাস নিয়েই তার আগ্রহ বেশি। তাই ডেইলি মেইলের সাক্ষাৎকারে স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। তার স্বপ্ন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করা। সাংবাদিকদের কাছে সেলিনা বলেন ‘এটা বুঝতে পেরে আনন্দিত যে, আমার এই কৃতিত্ব হয়তো আমাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমার ইচ্ছা আমি অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন করব।’
সেলিনা বলেন, ‘ফর্মে থাকাটা সত্যিই আনন্দের। আমি এখন পূর্ব লন্ডনের বাইরে তথা গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছি। কিন্তু আমি এটা মনে করি, যে জিনিসগুলো আমরা করতে পারি না তা আমরা করতে পারি। আর যে জিনিসগুলো দ্রুত বুঝতে পারি তা আসলেই আমরা পারি। মূল কথা হলো আমাদের মানুষের জন্য অসাধ্য বলে কিছু নেই, সবই সম্ভব। শুধু ইচ্ছাটা থাকতে হয়।’