বাংলাদেশী ইমিগ্র্যান্ট ডে ও বাংলাদেশ বাণিজ্য মেলা সম্পন্ন

ঠিকানা রিপোর্ট: বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের পিএস ৬৯ মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশী ইমিগ্র্যান্ট ডে ও বাংলাদেশ বাণিজ্য মেলা’ অনেকটা দর্শক খরায় শেষ হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এই মেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সাবিনা হাই উর্বী ও মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার সঞ্চালনায় চিন্ময় সেন্টারের শিল্পীদের মনোরম সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রী শাহাব উদ্দীন, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, শিশু-সাহিত্যিক ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডঃ জিয়াউদ্দিন প্রমুখ। মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা জানান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই দিনটিকে বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে হিসেবে ঘোষণা করার জন্য এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটে সিনেটর টবি এ্যান স্ট্যাভেস্কি রেজ্যুলেশন আকারে উত্থাপন করেন। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের তিন বছরের প্রচেষ্টার পর এ বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবটি সিনেটে রেজ্যুলেশন আকারে পাশ হয়। এখন থেকে নিউইয়র্ক স্টেট ক্যালেন্ডারে ২৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এটি বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসাবে পালিত হবে। নিউইয়র্ক স্টেট কর্তৃক ২৫ সেপ্টেম্বরকে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ রেজ্যুলেশন পাশ করার পর এবারই প্রথম দিনটি পালন করছে এনআরবি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইঙ্ক।

আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ রেজ্যুলেশন পাশ করার ক্ষেত্রে যাঁরা অবদান রেখেছেন সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। সিনেটর জন লু রেজ্যুলেশনটি মন্ত্রীর হাতে হস্তান্তরের সময় বাংলাদেশী বংশদ্ভুত আমেরিকানদের কৃতিত্বের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, ‘স্বপ্নের স্মারকটি হাতে তুলে দিতে পেরে তিনি আনন্দিত’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নিউইয়র্ক স্টেটের এ্যাসেম্বলি ওম্যান ক্যাটরিনা ক্রুজ এই মর্মে একটি সাইটেশনও হস্তান্তর করেন। বিশ্বজিত সাহার সম্পাদনায় বঙ্গবন্ধুর স্মারক গ্লোবাল বিজনেস এর মোড়ক উন্মোচিত করেন গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্স এর সিইও জেফ মার্ক।
তিন দিনব্যাপী এই মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যসমাগ্রীর স্টল ছাড়াও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ও তাঁর ওপর লিখিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর প্রদর্শনী হয়। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রকাশিত বই ছাড়াও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রকাশিত কিছু নির্বাচিত ও দুর্লভ গ্রন্থও এই মেলায় স্থান পায়। মেলায় বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ সব সেমিনারে বাংলাদেশ, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যত ও শঙ্কা এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগ্রামের জীবন তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে মেলার তৃতীয় দিনে সউদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় সৈয়দ জাকির হোসেনের আমেরিকায় তার কষ্টের জীবন এবং বর্তমানে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি এই দেশে এসেছিলাম লেখাপড়া করতে মাত্র ২ শত ডলার নিয়ে। লেখাপড়া সম্পন্ন করে আমার চলে যাবার কথা ছিলো কিন্তু আমি যাইনি। আমার স্ত্রী ডাক্তার ছিলেন বলেই আমার অনেক কাজ সহজ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেই কাজ আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠা করি নিজের প্রতিষ্ঠান। এক সময় আমেরিকার বড় বড় কোম্পানী আমার তৈরি মেশিন ক্রয় করে। আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করি। এখন আমার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমি নিজে প্রতিষ্ঠিত হবার পর আমি লংআইল্যান্ডে যারা খেতে পায় না তাদের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করি। সেই সাথে সব দেশের হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশীদের কোন প্রতিষ্ঠান নেই। আমি যে কারণে আমার নামেই একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। তা ছাড়া আমার ভাই ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদও বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান করতে হলে আগে কাজ করতে হবে। কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। বুয়েট লেখাপড়ার সময় তিনি ক্যান্টিনের পাশের হলেই ছিলেন। সেই সময় তিনি দেখেছেন, খাবার পরে মাঠের মধ্যে খাবার হাড্ডি ফেলে দেয়া হতো, সেই হাড্ডি গরীব মানুষরা খেত। এই কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে। যে কারণেই তিনি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য কাজ করছেন। তার এই অবদানের জন্য তার হাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে একটি ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। ক্রেস্টটি তুলে দেন বংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ। মাহফুজ আহমেদ বলেন, এমন একজন মানুষের হাতে এই ক্রেস্ট তুলে দিতে পেরে আমি আনন্দিত।

অন্য এক সেমিনারে সোনালী এক্সচেঞ্জের জ্যাকসন হাইটস শাখার ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের সবার উচিত বৈধ পথে বাংলাদেশে অর্থ পাঠানো। বর্তমান প্রবাসীবান্ধব সরকার প্রবাসীদের জন্য ২% প্রণোদনা দিয়েছে। যে কারণে সোনালী এক্সচেঞ্চ এখন সর্বোচ্চ রেট দিচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে কোন অসুবিধা নেই। কোন সমস্যা থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আমরাই সেই সমস্যার সমাধান করবো। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের ডাটা কোথাও দিই না। সেমিনারটি পরিচালনা করেন ফাহিম রেজা নূর।

ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে মডারেটর মাহবুবুর রহমান চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এই পর্বে অতিথি ছিলেন শাখাওয়াত আলী। শাখাওয়াত আলী বর্তমান সকারের বিভিন্ন ডিজিটাল কর্মকান্ড তুলে ধরে বলেন, এর জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়কে আমাদের ধন্যবাদ দিতে হবে। মাহবুবুর রহমান বলেন, ডিজিট্যাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের মাইন্ড সেট করতে হবে। আমরা সবাই শর্টকাট রাস্তা খুঁজি যে কারণে আমরা সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পারছি না। তবে আমাদের নতুন প্রজন্ম ট্যালেন্টেড। তাদের সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে হবে। এর জন্য সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমাদের ভারতীয়দের কাছে থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

তিন দিনব্যাপী বাণিজ্য মেলায় ছিলো দর্শক খরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে অবস্থান করার কারণেই এমন অবস্থা হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী রফিকুল আলম, অভিনেতা সাব্বির, প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী শাহ মাহবুব প্রমুখ।