বাংলাদেশের আকাশে শকুনের ডানা ঝাপটানো

৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে আবারও শকুনের ডানা ঝাপটানো লক্ষ করা যাচ্ছে। এ শকুন প্রকৃতির ‘ঝাড়ুদার’ বলে পরিচিত পাখি প্রজাতির দুই ডানার শকুন নয়। এরা মনুষ্য নামধারী মানুষের স্বাধীনতার শত্রু। এরা জঙ্গি। এবং ধর্মের নামে, সম্প্রদায় ও বর্ণের নামে, অঞ্চলের নামে জঙ্গিবাদের চর্চা করে। মানুষের শান্তি হরণ করে। সভ্যতা ধ্বংস করে। হত্যা, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের রাজনীতি উৎসাহিত করে। এরা অন্ধকারের কীট। আলোর শত্রু। এরা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করে।

সেই সব শকুনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে নতুন করে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে। বাংলার শরতের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। অশনিসংকেত। মানুষ নামের কলঙ্ক এই শকুনেরা বাংলাদেশের অখণ্ডতা তাদের বিষাক্ত নখর দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিতে মাঠে নেমেছে। ষড়যন্ত্র শুরু করেছে নানামুখী। পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়, বন-জঙ্গল তাদের নাশকতা কর্ম পরিচালনার জন্য বেছে নিয়েছে। আদর্শের নামে, অর্থের লোভ দেখিয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে ঘন জঙ্গলে সামরিক ট্রেনিং দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণের কাজে ব্যবহার করছে। এই জঙ্গিচক্রকে নির্মূল করতে সামরিক বাহিনীর অপারেশনসহ বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেও তাদের দমাতে এবং একদম নির্মূল করতে পারছে না। তাদের নাশকতা অব্যাহত গতিতে চলছে।

বাংলাদেশের অখণ্ডতা ধ্বংসের মাধ্যমে স্বাধীনতা হরণ করে নিতে অতিসম্প্রতি একটি জঙ্গি সংগঠনের সামরিক অপতৎপরতা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গত ১৯ অক্টোবর সংখ্যা ঠিকানার প্রথম পৃষ্ঠায়। প্রতিবেদনের শিরোনাম : ‘বাংলাদেশ ভূখণ্ড বিচ্ছিন্নে কুকিদের নীলনকশা’। উপশিরোনামে আছে ‘তিন দেশের সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে চলছে প্রশিক্ষণ’।

প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ যার সংক্ষিপ্ত নাম কেএনএফ। দেশের পার্বত্য অঞ্চলে হঠাৎ মাথাচাড়া দেওয়া সংগঠনটি এখন ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার নীলনকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। শুরুর দিকে শান্তিপ্রিয় সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে বিষধর সাপের মতো ফণা তুলতে শুরু করেছে। সংগঠনটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র রয়েছে তাদের। পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা তাদের, বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তারা পাহাড়ের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষকে সংগ্রহ করে একটি প্রশিক্ষিত নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর মতো তাদের কমান্ডো প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য তাদের নিজস্ব তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

মোটামুটি সবারই জানা আছে, বিভিন্ন সংগঠন পার্বত্য অঞ্চলে পূর্ব থেকেই বাংলাদেশবিরোধী জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে কেএনএফ যুক্ত হয়েছে এবং তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আলাদা করে জঙ্গি তৎপরতা চালানো শান্তিপ্রিয় মানুষের উদ্বেগ আরো বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। কেএনএফ নিজেদের দেশবিরোধী কাজেই কেবল যুক্ত রাখেনি, তারা আরেকটি জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়া’র সদস্যদেরকেও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। র‌্যাব জানিয়েছে, সম্প্রতি সিলেট, কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া প্রায় ৩৮ জন যুবক জঙ্গি সংগঠন কেএনএফের অধীনে তৎপর রয়েছে। সে তৎপরতা নস্যাৎ করে দিতে বান্দরবানের রোমা উপজেলায় সেনা ও র‌্যাব যৌথভাবে অভিযানও শুরু করেছে। বাংলাদেশের অখণ্ডতা এবং পাহাড়ের নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে কেএনএফের নেতার নাম জানা গেছে ‘নাথান বম’।

কেএনএফের মানচিত্রের তিন দিকে আছে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত। সহজেই বোধগম্য, বাংলাদেশে নাশকতা চালিয়ে কোনো অভিযান বা প্রতিরোধের মুখে সহজেই যেন পিছু হটে গিয়ে ভারত কিংবা মিয়ানমারে আশ্রয় নিতে পারে। মানচিত্রটিকে কেএনএফের প্রস্তাবিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ গঠিত হয়েছে বম, পান্ডুয়া, খুমি, ম্রো, খিয়াং নামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিয়ে। এ সবগুলোই বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের শপথ হচ্ছে ‘নো ফুল স্টেট, নো রেস্ট’। বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় : ‘একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেট গঠন করার পূর্বে কোনো বিশ্রাম নয়।’ তারা নিজেদের অবহেলিত বলে মনে করে।

শুরুতে কেএনএফ একটি শান্তিপ্রিয় সংগঠন হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেতে থাকে। এখন এটা প্রমাণিত যে, অন্য আরো অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং জঙ্গি সংগঠনের মতো কেএনএফও অনুরূপ একটি জঙ্গি সংগঠন। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড আগেও চালিয়েছে এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক কারো কারো অভিমত হচ্ছে, কেএনএফ তেমন কোনো শক্তিশালী সংগঠন নয়। তবে অন্য সব জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে মিলে ভবিষ্যতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অনেক সংগঠনই নাশকতা চালিয়েছে। শান্তি বিঘ্নিত করে জঙ্গি তৎপরতা চালিয়েছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যাও করেছে। কেউ কেউ দাবি তুলেছে হিন্দুদের জন্য পৃথক হিন্দু রাষ্ট্রের, আবার পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নিজেদের অবাঙালি দাবি করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তাদের নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছে দীর্ঘদিন। তারা নিজেদের বঞ্চিত ও অবহেলিত মনে করত এবং সেই অবহেলা-বঞ্চনার অবসানের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ড তাদের কাছে একমাত্র সমাধান মনে হতো।

তাদের লড়াই চলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংগঠনের ব্যানারে। এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। তিনি সন্তু লারমা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রাম জনসংহতির সশস্ত্র সদস্যদের হাতে অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযানে সংহতির অনেক সদস্যও প্রাণ দিয়েছে। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বকালীন বাংলাদেশ সরকার এবং জনসংহতির মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে চুুক্তির সব শর্তের সফল বাস্তবায়ন আজও হয়নি। এ জন্য পারস্পরিক অভিযোগ রয়েছে। এবং এখনো মাঝেমধ্যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

অন্যদিকে যশোরের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে কিছু এলাকাজুড়ে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। মূলত বাংলাদেশের হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের নির্যাতন-নিপীড়ন, বাড়িঘর-পূজামণ্ডপে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর এবং বিতাড়নের অভিযোগ তুলে তার অবসান ঘটানোর পথ হিসেবে কতিপয় চরমপন্থী হিন্দু স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন বেছে নেয়। এই সংগঠনের মূল নেতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন সুতার। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই ছিলেন। পিরোজপুরের এমপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পঁচাত্তরে পরিবারসহ বঙ্গবন্ধু নিহত হলে চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে পালিয়ে যান। কালক্রমে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন শুরু করেন। এ সংগঠনের আরো দুজন নেতা আছেনÑকালিদাস বৈদ্য ও ধীরেন্দ্রনাথ পাল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও অনেক হিন্দু তাদের সমর্থক আছে বলে জানা যায়। তবে অনেক দিন থেকেই স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন স্তিমিত আছে। ইদানীং স্বাধীন বঙ্গভূমি নিয়ে তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় না।

তবে শাশ্বত সত্য এটাই, ষড়যন্ত্র, নাশকতার মধ্য দিয়ে কারো কোনো মঙ্গল করা কিংবা বড় কিছু অর্জন করা যায় না। আবার কাউকে বঞ্চিত করে, অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়েও কাউকে দমন বা অধিকার হরণ করা যায় না। সব পক্ষ শুভবুদ্ধির পরিচয় দিলে তখনই সমস্যা কঠিন হলেও একটা সুন্দর গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যায়। আর মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ আজকের সময়ে সম্পূর্ণরূপেই অগ্রহণযোগ্য। তাই আমরা সবাই যদি আজকের সভ্যতা এবং প্রগতির ধারা এগিয়ে নিতে চাই এবং মানবসমাজের কল্যাণের পথ খুঁজে পেতে চাই, তবে সবাইকে অন্ধকার, অযৌক্তিক এবং বিবেকহীনতার পথ পরিহার করে সবার জন্য শুভ হয় সেই কর্তব্য সাধনেই মনোনিবেশ করতে হবে।