বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বারবার ব্যর্থ হয়েছে সেনাবাহিনীর ক্ষমতালিঞ্ঝা আর রাজনীতিকদের অযোত্যায়

ঠিকানার সঙ্গে গাফফার চৌধুরীর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার

সাঈদ-উর-রব : আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। নামটি শুধু বাংলাদেশ কিংবা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছেই নয়, বিশ্বের যে কোন প্রান্তের যে কোন বাঙালীর কাছেই সমভাবে পরিচিত। অনুরাগী ভক্তদের কাছে জনপ্রিয়, সমালোচক এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কাছে তেমনই সমালোচিত এবং বিতর্কিত। আবার মহান একুশের অমর গান ’আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো…’ এর রচয়িতা হিসাবে সকলের কাছেই সমাদৃত। জনাব চৌধুরী এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তিনি একজন তুখোড় সাংবাদিক, একজন বিখ্যাত কলামিস্ট। সব ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্য কুড়িয়েছেন। পুরস্কৃতও হয়েছেন বিভিন্ন কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ। তাকে কেউ বলেন আওয়ামী ঘরানার মানুষ, কেউ বলেন আসলে বর্ণহীন। অবশ্য তিনি নিজে দাবি করেন সত্যের ঝান্ডাবাহী। তবে অনুরাগী সমালোচক কেউই সম্ভবতঃ তার কলাম না পড়ে স্বস্তি পাননা। ৭৫ বছর বয়সেও তার চিন্তা চেতনায় এবং লেখনীর মাধ্যমে তা প্রকাশের ক্ষেত্রে তুখোড় যুবক।
সেই গাফ্ফার চৌধুরী সম্প্রতি প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন উদীচীর সম্মেলনে। সেখানেই তার একটি এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ গ্রহণের অনুমতি নেয়া হয়। তার দেয়া দিন ও সময় অনুযায়ী ৩০ আগস্ট রাত ১০টার দিকে হাজির হই নিউইয়র্কে উদীচীর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জীবন বিশ্বাস এবং তার স্ত্রী উর্বি বিশ্বাসের স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বাসভবনে। কিন্তু গিয়েই হতাশ হতে হয়। তখনও তারা বাসায় পৌঁছাননি। অগত্যা বাইরে গাড়ীতে অপেক্ষার পালা সাক্ষাৎকার মিলবে কি মিলবে না সেই শংকা নিয়ে। অবশেষে অপেক্ষার অবসান। গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে জীবন বিশ্বাস ও উর্বি বিশ্বাস ফিরলেন রাত ১২ টার দিকে। এরপর রাত প্রায় ৪টা পর্যন্ত চলে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ। অনেকটা কষ্ট স্বীকার করে ডায়াবেটিসের রোগী হওয়া সত্বেও ইনস্যুলিন নিয়েও তিনি কথা বলে যান তার জীবনের নানাদিক উন্মোচন করে। কিছু আমাদের জানা, কিছু অজানা। তার সবটাই ঠিকানার পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। ঠিকানা ঃ আপনার শৈশব এবং প্রথম লেখালেখি সম্পর্কে বলুন।
গাফফার চৌধুরী ঃ আমার শৈশব তো গ্রামে। বরিশাল জেলার উলানিয়ায় আমার জন্ম। সেখানেই বড় হয়েছি। আমি প্রথম মাদ্রাসায় ভর্তি হই। তারপরে হাই স্কুলে। হাই স্কুলে পড়ার সময়েই আমার বাবা মারা যান এবং বরিশাল শহরে গিয়ে ১৯৫০ সালে মেট্রিক পাস করি। তারপরে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজে আইএতে ভর্তি হই। আর লেখালেখির শুরু গ্রামে থাকতেই। আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি তখন ডিএল রায়ের ধন ধান্যে পুষ্পেভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটি শুনে একটি দেশাত্মবোধক কবিতা লিখি। এই আমার লেখার শুরু। ছোট বেলায় শুধু কবিতা লিখতাম। গল্প ও প্রবন্ধ লেখা শুরু করি স্কুলের শেষ দিকে এসে। কলকাতার দৈনিক নব যুগের ছোটদের আসর, আগুনের ফুলকি, মুকুলের মহফিল এই সব কাগজে লেখা ছাপা হতো। কলকাতায় ছোটদের মাসিক পত্রিকা ছিলো শিশু সওগাত। এই পত্রিকাতেও লিখেছি। সেই সময় বরিশালের একজন কথা শিল্পী ছিলেন শামসুদ্দিন আবুল কালাম। তার গ্রাম্যজীবন ভিত্তিক গল্পের বই বের হয় ’শায়ের বানু’ নামে। এই শায়ের বানু পড়ে আমার খুব গল্প লেখার ইচ্ছা হয় এবং সাক্ষর নামে একটি গল্প লিখি। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, শামসুদ্দিন আবুল কালাম কর্তৃক আমি খুব প্রভাবিত ছিলাম। সাক্ষর গল্পটি প্রকাশিত হয় কলকাতার মাসিক সওগাত পত্রিকায়। তারপরে যখন ঢাকায় যাই তখন ঢাকার বিখ্যাত পত্রিকা সোনার বাংলায় লিখতে শুরু করি, এই পত্রিকায় এক সময় রবীন্দ্র নাথও লিখতেন। এখনো সোনার বাংলা নামে জামাতীদের একটি কাগজ আছে। এই সোনার বাংলা আগের সোনার বাংলা নয়। তখনকার সোনার বাংলায় আমি প্রচুর গল্প লিখেছি। ঢাকায় আসার সুবাদে মাসিক সওগাত, মাসিক দিলরুবা, মাসিক দ্রুতি, মাসিক মোহাম্মদী ও মাসিক মাহে নও পত্রিকায় লিখতাম এবং ছোট গল্পের লেখক হিসাবে পাঠকদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাই। ১৯৫৮ সালে আমার প্রথম গল্পের বই ’কৃষ্ণপক্ষ’ বের হয়। তারপর ’সুন্দর হে সুন্দর’সহ বেশ কয়েকটি গল্পের বই বের হয়। আমার প্রথম উপন্যাস ’চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’। এ পর্যন্ত ৪/৫টি উপন্যাস বের হয়েছে। প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে অনেক। স্কুল জীবন থেকেই অনিয়মিতভাবে রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করি। আজকাল সাহিত্য চর্চা খুবই কম করি। কারণ সাংবাদিকতাই এখন সার্বক্ষণিক পেশা। তবে নাটক লিখেছি, গান লিখেছি। একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি আসলে কবিতা ছিলো। পরে আব্দুল লতিফ ও আলতাফ মাহমুদ সুর দেয়ায় এটি এখন গান হিসাবেই পরিচিত। আরো অনেক গান ও কবিতা লিখেছি। এটাই আমার সাহিত্য চর্চা ও লেখালেখির বিষয়।
ঠিকানা: অবিভক্ত ভারতে বৃটিশবিরোধী রাজনীতি- কংগ্রেস- মুসলিম লীগ-, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করুন?
গা: চৌধুরী: আমাদের পরিবার ছিলো অসম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে জড়িত। আমার বাবা ছিলেন বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং খেলাফত আন্দোলনেরও জেলা কমিটির সভাপতি। ফলে আমাদের পরিবারের ভিতরেই মুসলিম লীগ বা সম্প্রদায়িকতা বিরোধী চেতনা ছিলো। সেই চেতনার ভিতরেই আমি মানুষ হয়েছি। আমি এখনো বিশ্বাস করি ভারত বিভাগ ছিলো একটি চক্রান্ত। ভারত বিভাগের ফলে ভারতের মুসলমানদের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে। ভারতের মুসলমানরা বিভক্ত হয়ে গেছে। ৪ কোটি মুসলমান যারা সে সময় ভারতে ফিরে গেছে, তাদের কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যত নেই। আর ৬ কোটি মুসলমান পাকিস্তানে চলে আসে। কংগ্রেস এবং মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক ও নেতৃত্বের সংঘাতে ভারত বর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান হয়। পাকিস্তানের দুই অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্ব হাজির করে পাকিস্তান ভাগ করে। এখন পশ্চিম পাকিস্তানও এখন দুর্বল, বাংলাদেশও দুর্বল এবং আত্মঘাতি সংগাতেপূর্ণ। বার বার সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে দেশটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি ও ভবিষ্যত ধ্বংস করে দিয়েছে। যদি ভারত বর্ষ ঐক্যবদ্ধ থাকতো তবে হয়ত হিন্দু- মুসলমান বিরোধ আরো কিছু কাল চলতো। কিন্তু একটা সময় আসতো যখন জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠতো এবং ভারত বর্ষ সারা পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারতো। এছাড়াও হিন্দু- মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারতো। ভারতের পাঁচটি প্রদেশ বাংলা, সিন্ধু, আসাম, সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানে মুসলমানরা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ সেহেতু মুসলমানরা নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসাবে দাঁড়াতো। তিনি বলেন, ভারত আজকে একটি আধা সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে পাকিস্তান দুর্বল অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ।
ঠিকানা: আপনি কি মনে করেন- দ্বিজাতিতত্তে¦র ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম কেবলই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জেদের ফসল? জিন্নাহ একজন অতি আধুনিক এবং পশ্চিমা ভাবধারার মানুষ হয়েও কেন ধর্মকে শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন তার রাজনীতির জন্য?
গা: চৌধুরী: দ্বিজাতি তত্ত্ব আসলে একটি ধাপ্পা ছিলো। তা না হলে মধ্যপাচ্যে এতগুলো মুসলমান জাতি থাকতো না- ইরানী, ইরাকী, সৌদি আরবীসহ আরো অনেক। তিনি বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি হয় না। তবে জিন্নাহর একগুঁয়েমীর জন্য পাকিস্তান হয়েছে- এই কথাও বলবো না। জিন্নাহ অনেকটা বাধ্য হয়েই এই দাবি তুলেছিলেন। কারণ কংগ্রেসে হিন্দু নেতৃত্ব। এরাও কম সাস্প্রদায়িক ছিলেন না। বিশেষ করে নেহেরুর জেদ এবং জিন্নাহ বিদ্বেষ- এটাও ছিলো ভারত বর্ষ ভাগ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। জিন্নাহ আসলে ক্যাবিনেট মিশনের এবিসি ফর্মুলা মেনে নিয়েছিলেন, কংগ্রেস মানেনি। অতীতেও জিন্নাহর ১৪ দফা প্রস্তাব কংগ্রেস মানেনি। কংগ্রেস যদি জিন্নাহর ১৪ দফা মানতো এবং জিন্নাহ যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তাও মানতো- তাহলে ভারত বর্ষ ভাগ হতো না। এর জন্য কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক হিন্দু নেতৃত্বও কম দায়ী নয়।
ঠিকানা: বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে কি কেবল দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং ভাষার উপর পাঞ্জাবী মিলিটারী রুলের আক্রমণই কারণ?
গা: চৌধুরী: না, তা কারণ নয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কারণ হচ্ছে- পুরো পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাজ না করা। যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাজ করতো তা হলে বাঙালি, পাঞ্জাবী এবং সিন্ধি এরা সকলে সমাধিকার পেত। পাকিস্তানও একটি গণতান্ত্রিক অখন্ড রাষ্ট্র হতে পারতো, এত ভৌগলিক ব্যবধান থাকা সত্বেও। কিন্তু পাঞ্জাবীরা ক্ষমতা দখলের পরে প্রথমে জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলীকে মহাচোর আখ্যা দিয়ে হত্যা করে। লিয়াকত আলীকে হত্যা করা হয় গুলি করে এবং বলা হয়ে থাকে জিন্নাহকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। তারপরে পাঞ্জাবীরা সরাসরি পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। কারণ পাঞ্জাবীরাই ছিলো একমাত্র সামরিক শক্তির অধিকারী। এ কারণে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে। তার ফলেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। তার মধ্যে বাঙালি জাতীয়তা, দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যর্থতা- এইগুলোও কাজ করেছে। মূলত: পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কাজ করতে দেয়া হয়নি এবং দেশটিতে যে বিভিন্ন জাতিসত্ত্বা (বাঙালি, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পস্তু) ছিলো তা মেনে না নিয়ে হামানদিস্তায় সব জাতি সত্ত্বাকে একসঙ্গে ভর্তা করে দেশটাকে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো।
ঠিকানা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ও তাঁর সাফল্যের পেছনে কারণগুলো বলবেন কি?
গা: চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম বাঙালি নেতা যিনি বুঝতে পেরেছিলেন সামরিক বাহিনী পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে স্থায়ী হতে দেবে না। আর পাকিস্তানে গণতন্ত্র না থাকলে বাঙালিরা যত সংখ্যাগরিষ্ঠতাই লাভ করুক না কেন, প্রধান্য বিস্তারতো দূরের কথা কোন গুরুত্বই লাভ করবে না। বাঙালিরা দাস জাতিতে পরিণত হবে। তাদের ভাষা- সংস্কৃতির উপর বার বার আঘাত এসেছে এবং ভবিষ্যতও আসবে এবং এই বিরাট অঞ্চলকে পশ্চিমারা তাদের পণ্য বিক্রি ও রাজনৈতিক উপনিবেশ হিসাবে ব্যবহার করবে। এই সত্য উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধু এর বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে বাঙালিদের সচেতন করে তুলেন। এর আগেও হোসেন শহীদ সরোওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাসানী এরা বাঙালির অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু তারা বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে ন্যাশন স্টেট করার চেষ্টা করেননি। এটা অনুধাবন করেছিলেন শেখ মুজিব এবং আহবান করেছিলেন নিজস্ব জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে আলাদা এবং ঐক্যবদ্ধ নতুন দেশ করার। এই জন্যই তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা।
ঠিকানা: তাঁর সাথেতো আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। অনেক কথা হয়েছে তার সঙ্গে যা আপনার পাঠকরা জানে না। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
গা: চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার পরিচয় ১৯৪৮ থেকে। যখন আমি স্কুলের ছাত্র। তিনি বরিশালে গিয়েছিলেন ছাত্র নেতা হিসাবে। সেখানে তার সাথে আমার পরিচয়। ক্রমশ: সেই পরিচয় তার প্রতি ভালবাসা- আনুগত্যে পরিণত হয়। তাঁর মধ্যে যে সাহস, বাঙালিপনা এবং সংগ্রামী মনোভাব দেখেছি আর কোন নেতার ভিতরে আমি দেখিনি। সেই থেকেই আমি তার অনুসারী হই। আমি যখন দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি সাংবাদিক হিসাবে তখন তার সাথে আমার আরো ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হবার সুযোগ পাই। আমি সাংবাদিকতা শুরু করি তখনকার ঢাকার দৈনিক ইনসাফ পত্রিকার মাধ্যমে। তার পরে মিল্লাতে এবং পরবর্তীতে দৈনিক আজাদ এবং ইত্তেফাকে । তবে ইত্তেফাকে আমি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছি। কারণ ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতামতের মিল ছিলো। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি। কারণ তারা কনজারভেটিভ ছিলেন আর শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রগ্রেসিভ। সেই জন্য তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়ে। ছয় দফা আন্দোলনের সময় তার সঙ্গে আমি সরাসরি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। দেশ স্বাধীন হবার পরেও তিনি যখন আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করেন তখন তাঁকে সাহায্য করার জন্য আমাকে ডেকেছিলেন। বহুদিন আমি তাঁর লেখার ডিক্টেশন নিয়েছি। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গিয়েছি। তার মধ্যে ১৯৭৩ সালে গিয়েছিলাম আলজিয়ার্সে ৭২ জাতি জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে। এরই মধ্যে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে এমন হয় যে, আমি মোটামুটি তাঁর মনের কথা বুঝতে পারতাম এবং তিনিও আমাকে জানতে দিতেন। সব সময়ই যে তাঁর সঙ্গে একমত হতাম তা নয়। তিনি আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তাঁর রাজনৈতিক কাজের সমালোচনা করার।
ঠিকানা: সে সময়ে বঙ্গবন্ধু তিনজন সাংবাদিককে বলতেন আপদ, বিপদ এবং মুসিবত- তারা কারা এবং কেন বলতেন?
গা: চৌধুরী: (হেসে দিয়ে) তিনি আমাদের তিনজন সাংবাদিককে আপদ, বিপদ এবং মুসিবত বলতেন। আমি, এ বি এম মুসা এবং ফয়েজ আহমেদ। আমাকে বলতেন মুসিবত, আপদ ছিলেন মুসা এবং বিপদ ছিলেন ফয়েজ আহমেদ। ঠিকানা: আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করার ক্ষেত্রে ভারতের পূর্ব থেকেই কোন পরিকল্পনা ছিলো এবং সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই ১৯৭১- এ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে তারা সহায়তা করেছে? এর পেছনে ভারতের ভূ- রাজনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক বা সাংস্কৃতিক স্বার্থ কতটুকু ছিলো বলে মনে করেন? গা: চৌধুরী: আমি যতটুকু জানি (আমার এই জানাটাও ভুল হতে পারে) প্রথম দিকে কোন স্বার্থ ছিলো না বরং ভারত অনেক বেশি কাছাকাছি পাকিস্তানের। তারা হিন্দি বলে, উর্দু বলে, খাবার, পোশাকসহ অনেক কিছুর সঙ্গে উত্তর ভারতের শাসক শ্রেণীর সাথে পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর মিল রয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে বিরোধের পরে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো কিন্তু তারা পূর্ব পাকিস্তানকে ক্রাশ করতে চায়নি। তারা চায়নি একটা বিরাট জনসংখ্যার মুসলমান পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাক। আলাদা হয়ে গেলে তারা মনে করত পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা একত্র হয়ে একটা বৃহত্তর বঙ্গ গঠনের আন্দোলন হবে, যার ফলে ভারত বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। যে কারণে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পরেও দিল্লী কিন্তু আমাদের বিরোধিতা করেছিলো। সবগুলো বড় পত্রিকা ভারতের সমর্থনের বিরোধিতা করেছিলো। একমাত্র ইন্ধিরা গান্ধী, তার কয়েকজন বিশ্বস্তমন্ত্রী এবং কয়েকজন এমএলএ বাংলাদেশকে সাপোর্ট করেছিলো। ফলে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে তখন সারা ভারতই আমাদের সাপোর্ট করে। তারা একটা ব্যাপারে সচেতন ছিলো- বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ভারত বিপদগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রভাবে পশ্চিম বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরার বাঙালিরা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের সাথে যোগ দিতে পারে। বাংলাদেশী জাতীয়াবাদ এই শব্দটি প্রথম প্রচার করে ভারতীয়রা। তারা প্রচার করে বাংলাদেশের লোকরা বাংলাদেশী এবং আনন্দ বাজারের সন্তোষ কুমার ঘোষ এই মতবাদ প্রচার করেন। এটাকেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নেন আবুল মনসুরের মাধ্যমে এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রচার করা শুরু করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাদ- এটা প্রচার করে ভারতের দিল্লির শাসকরা পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুদের বুঝাতে চেয়েছিলো বাংলাদেশের সঙ্গে গেলে তোমরা কিন্তু আর নিজেদের ধর্ম- কালচার বজায় রাখতে পারবে না।
ঠিকানা: সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতের সৈন্য প্রত্যাহার করার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির উপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাপ প্রদান তার প্রতি ভারতকে বিরূপ করে তুলেছিলো এবং সে কারণে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পেছনে অনেকেই ভারতের হাত ছিলো বলে সন্দেহ করে- এর সঙ্গে আপনি কি সহমত পোষণ করেন?
গা: চৌধুরী: ভারতের সৈন্য অপসারণের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধির কোন মন কষাকষি হয়নি। বিখ্যাত ব্রিটিশ লড প্রেডার গ্রোথের বই থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে দু’ বার স্বাধীন করেছেন। পৃথিবীর আর কোন নেতা তার দেশকে দু’বার স্বাধীন করেননি। ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ইন্দিরা গান্ধি তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য ফিরিয়ে নেন। এটা হলো তার দ্বিতীয় বার বাংলাদেশকে স্বাধীন করা। একবার পাকিস্তানীদের হাত থেকে আরেক বার ভারতীয় সৈন্যদের হাত থেকে। শেখ মুজিবুর রহমান যদি পাকিস্তানের কারাগার থেকে না ফিরে আসতেন তাহলে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য অপসারণে বহু বছর লাগত। এমনকি বাঙালিদেরকে ভারতীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আশংকাও ছিলো। বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে নেমেই প্রথম ইন্দিরা গান্ধিকে বলেছিলেন, ম্যাডাম আপনার সৈন্যরা কবে বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে। ইন্দিরা তখন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, ’আপনি যেদিন বলবেন’। তবে মন কষাকষি হয়েছিলো- ভারতীয় সেনা বাহিনীর একটা অংশ বিশেষ করে জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন ভারতীর সৈন্যরা এত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ ছেড়ে আসুক না চাওয়ায়। তাদের কথা ছিলো তাড়াতাড়ি চলে আসলে বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানীপন্থীরা কাউন্টার রেভুলেশন করার সুযোগ পাবে।
ঠিকানা: বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন বা তার হত্যার পিছনে আন্তর্জাতিক মহলের হাত ছিলো- এ কথা কি বিশ্বাস করেন? করলে সেই চক্রান্তে কোন কোন দেশ জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন।
গা: চৌধুরী: আমার মতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে আমেরিকা, সৌদী আরব এবং পাকিস্তান এ তিনটি দেশ প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছে। সিআইএ পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের আর্মি যেহেতু পাকিস্তানের দ্বারা তৈরী, তাদের মধ্য থেকে কিছু অংশ যুদ্ধ করেছে আর বাকি অংশটিকে পাকিস্তান ক্রমে ক্রমে তাদের কুক্ষিগত করেছে ও ব্যবহার করেছে, আওয়ামী লীগের একটি অংশ যারা মোস্তাকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তারা জড়িত ছিলো। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব কিছু ভুলভ্রান্তি ছিলো, তিনি স্বাধীনতার শত্রুদের প্রতি খুব কঠোর হতে পারেননি। তিনি দেশ শক্ত হবার আগেই ভূট্টোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। ভূট্টো এসে নানাভাবে পাকিস্তানপন্থীদের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে যায়। টাইম ম্যাচিউর করার আগেই তিনি লাহোরের ইসলামী সম্মেলনে চলে গেলেন। আমাদের দুর্বলতার সুযোগ, আর একদিকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সাথে জাতীয় ষড়যন্ত্রের যোগ হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড ঘটে।
ঠিকানা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ আছে বলে কি আপনি ভাবেন? আওয়ামী লীগ- বিএনপির রাজনীতি এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করুন। এ যাবত বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মনোভাবে বেশি লাভবান হয়েছে কে- আওয়ামী লীগ না বিএনপি?
গা: চৌধুরী: ভারততো প্রভাব বিস্তার করেই আছে। কার্যত বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা হারিয়েছে। এখন প্রকাশ্যে কাগজে লেখা হয় এবং বলা হয়- বাংলাদেশ পলিটিক্যাল কলোনী অব পাকিস্তান, মিলিটারী কলোনী অব আমেরিকা এবং ইকোনমিক কলোনী অব ইন্ডিয়া। আওয়ামী লীগের সময় ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করা হয়েছিলো। তাতে বলা হয়েছে ভারতের কাছে পাট বিক্রি করবেন না, ভারতীয় টাকায় ব্যবসা করবেন না, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় ব্যবসা করতে হবে, খুলনা নিউজ প্রিন্ট বিক্রি করবেন না। এইভাবে নানা কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার আমলেও তারা ভারতকে খুব একটা সুবিধা দিতে পারেননি, দেয়ার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু একশ্রেণীর লোকজন বলবে- এটা ভারতের তাবেদার সরকার ছিলো- তাই তারা ভয়ে করেনি। তবে এই কাজটি বিএনপি চুটিয়ে করেছে। তারা ভারতকে বাংলাদেশের বাজার খুলে দিয়েছে। পেয়াজ, নুন, চিনি, কাপড় চোপড় থেকে শুরু করে কোরবানীর পশু পর্যন্ত। ভারত এত বড় বাজার আর কোথাও পায়নি অথচ মুখে তারা ভারতবিরোধী। তাছাড়া তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে গোপনে যে পরিমাণ বাণিজ্য করেছে তা আর কারো দ্বারা সম্ভব হয়নি।
ঠিকানা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান কতটা পর্যন্ত শিকার করতে আপনি প্রস্তুত আছেন?
গা: চৌধুরী: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান কতটুকু তা আমি স্বীকার করলেও, না করলেও কিছু আসে যায় না। কারণ ইতিহাস ইতিহাস। কিছুটা আবদান ছিলো। সেদিন কালুরঘাটে যখন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিলো না- চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং চট্টগ্রাম বেতারের বেলাল মোহাম্মদ, এরা যদি একজন সামরিক অফিসারের খোঁজ করেছিলেন- করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো এই জন্য যে যাতে মুক্তিযুদ্ধাদের বুঝানো যায় বাঙালি সেনা বাহিনীও তাদের সাথে আছে। সকলেরই জানার কথা জিয়াউর রহমান তখন সোয়াদ জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের জন্য যাচ্ছিলেন। তার বন্ধু ক্যাপ্টেন অলীর অনুরোধে ফিরে আসেন এবং তাকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটা পাঠ করান। যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে একটি ম্যাসেজ যায়- পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে বাংলাদেশের যে সামান্য সৈন্য রয়েছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরে তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে বা যেন অংশগ্রহণ করে এবং এই ঘোষণার ফলে সেটা সম্ভব হয়েছিলো। তাই বলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক নন, স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠক। তিনি বলেন, আমি যখন আগরতলায় তখন পূর্বাঞ্চলের সিভিল এডমিনিস্ট্রেটের ছিলেন এম আর সিদ্দিীকী। তিনি আমাকে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এ্যাটাচ করে দেন। ফলে কিছু দিন আমাকে থাকতে হয়েছিলো সাবরুম সেক্টরে। আমি জিয়াউর রহমানকে কোন সিরিয়াস যুদ্ধ পরিচালনায় নিযুক্ত হতে দেখিনি। তিনি একটা জিয়া ফোর্স তৈরী করেছিলেন। তিনি বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক আলোচনা, আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতেন, একই সঙ্গে তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা ও বিদেশী গোয়েন্দাদের সাথে যোগাযোগ করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তখন বুঝতে পারিনি তিনি গোড়া থেকে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিলেন। কারণ তিনি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জুনিয়র অফিসার ছিলেন। তার মনে যে ক্ষমতা দখলের ইচ্ছা ছিলো তা বুঝা যায় প্রথম দিনেই। তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাণী পাঠ করতে গিয়ে বলে ফেললেন- আই এম দা হেড অব দি স্টেট। তাকে কে হেড অব দি স্টেট করলো? স্ব- ঘোষিত? হেড অব দা স্টেট করতে হলে একটি সরকার লাগে, মন্ত্রী লাগে, প্রশাসন লাগে- কিছুই নেই তিনি হেড অব দা স্টেট বলে ফেললেন। পরে যখন তাকে বলা হলো- এটা আপনি কি বললেন, তখন তিনি আবার বললেন, আন্ডার দা লীডারশীপ অব আওয়ার গ্রেট লীডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনই বুঝা গিয়েছিলো তার একটি ষড়যন্ত্রকারী মনোভাব ছিলো। এটা ক্রমশ: প্রকাশ হয়ে পড়ে। তিনি জেনারেল ওসমানীর বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। জেনারেল ওসমানী তাকে কোর্ট মার্শাল করতে চেয়েছিলেন।
ঠিকানা: কোন ধরনের ষড়যন্ত্র?
গা: চৌধুরী: তিনি জেনারেল ওসমানীকে সিএনসি থেকে সরিয়ে দিয়ে আলাদাভাবে সিভিল সরকারের কোন হুকুম না মেনে চলার চক্রান্ত করেন। এই ঘটনা জেনারেল ওসমানী কিছু সেনা সদস্যের সাথে আলাপ করে উদঘাটন করেন এবং তাকে কোর্ট মার্শালের অর্ডার দেন। কিন্তু তাজ উদ্দিন সাহেবের হস্তক্ষেপে জিয়াউর রহমান রক্ষা পান। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে দেখা গেল জিয়াউর রহমান কোন ফ্রন্টেই যুদ্ধ করে সুবিধা করতে পারছেন না। হান্নান সাহেব ( যিনি বিএনপিতেই আছেন), তার কাছ থেকে জানতে পারবেন এবং তিনি পার্লামেন্টেও কয়েকবার বলেছেন- জিয়ার জেড ফোর্স ব্যান্ড করে দেয়া হয় এবং তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকেও বিরত রাখা হয়। সুতরাং আমি তার দুটো দিকই দেখি- একদিকে মুক্তিযুদ্ধে তার বড় অবদান একজন সামরিক অফিসার হয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ অন্যদিকে যুদ্ধ করার জন্য জের্ড ফোর্স তৈরী। কিন্তু তার এই সুনাম নষ্ট হয়ে যায় তিনি যখন ওসমানীর এবং মুজিবনগর সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। যেমন ফ্রান্সে মার্শাল ফেতা ছিলেন সারা ফরাসিদের কাছে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তাকে বলা হতো বার্দুন বিজয়ী মার্শাল ফেতা। হিটলারের কাছে আত্মসমর্পণ করে ভিসি সরকার করার পর থেকেই তাকে ফ্রান্সের মানুষ বিশ্বাঘাতক আখ্যা দেয় এবং তার বাকি জীবনটা কারাগারে কাটাতে হয় ও কারাগারেই মার্শাল ফেতার মৃত্যু হয়। তেমনি জিয়াউর রহমানও মুক্তিযুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধুর সরকার উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
ঠিকানা: বঙ্গবন্ধুর হত্যা কান্ডের বেনিফিশিয়ারী জিয়াউর রহমান হলেও হত্যাকান্ডের জন্য তাকে কতটা দায়ী করেন?
গা: চৌধুরী: আমি তো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের জন্য তাকে পুরোপুরি দায়ী করি। কারণ মোস্তাক যতবড় ষড়যন্ত্রকারীই হোক না কেন আর্মিকে তিনি প্রভাবিত করতে পারেননি। তার ভাগিনা একমাত্র কর্নেল রশিদ ছাড়া। কর্নেল ফারুকসহ অন্যান্য আর্মি অফিসারকে প্রভাবিত করেন জিয়াউর রহমান। কর্নেল ফারুক লন্ডনের আইটিভিতে যে জবানবন্দী এবং কোর্টে মামলা চলাকালে যে জবানবন্দী দিয়েছেন- তাতে তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য জিয়াউর রহমানের কাছে গিয়েছিলাম। জিয়াউর রহমান বলেছেন, তোমরা যদি সফল হও, আমি তোমাদের সাহায্য করবো আর যদি সফল না হও আমি এর ভিতরে নেই এবং তোমরা আমার কাছে এসো না। এই সব কারণেই বলা যায় জিয়াউর রহমান ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিলেন। মোস্তাককে প্রথমে সামনে আনা হয়, পারবর্তীতে তাকে সরিয়ে দিয়ে জিয়াউর রহমান সামনে আসেন। জিয়াউর রহমানের কারণে অনেকেই মারা গেছেন। শুধু যে খালেদ মোশাররফ মারা গেছেন তা নয়। খালেদ মোশাররফ চাইলে তাকে হত্যা করতে পারতেন। তাকেতো বন্দীও করা হয়েছিলো কিন্তু কর্নেল তাহর ও খালেদ মোশাররফের মহানুভবতার কারণেই তিনি মুক্ত হন। যাদের মহানুভবতায় তার জীবন বেঁচে যায় সেই খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের, ১১২ জন মুক্তিযোদ্ধা সবাইকে তিনি হত্যা করেছেন।
ঠিকানা: জাতির পিতা, জাতির স্থপতি, স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের অবসান হওয়া জরুরী কি না? কীভাবে মীমাংসা হতে পারে?
গা: চৌধুরী: জাতির পিতা কে এটা জাতি ঠিক করে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। আমাদের সংবিধানে জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা নেই তাই এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা আমার মনে হয় ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ এটা ঠিক করছেন না। পিতৃত্ব অস্বীকার করা যায় না। বাঙালি জাতি তার ফাউন্ডিং ফাদার বঙ্গবন্ধু মুজিবকে অস্বীকার করতে পারে না। এখন যে অস্বীকৃতি এটা সম্ভব হচ্ছে যারা স্বাধীনতার শত্রু ছিলো তারা ক্ষমতা দখল করেছে এবং যতই দিন যাচ্ছে তারাও পিছু হটছে। এক সময় বঙ্গবন্ধুর নামও উচ্চারণ করতে দেয়া হতো না। এখন তারা নিজেরাই বলা শুরু করেছে। আগে তার নামে কোন প্রতিষ্ঠান হলে মুছে দেয়া হতো, তার ছবির অবমূল্যায়ন করা হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। একদিন বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতি পাবেন। আমার কাছে বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতি পেলেন কি পেলেন না এই মুহূর্তে বড় কথা নয়- বড় কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। যে আদর্শের ভিত্তিতে জাতি স্বাধীন হয়েছে। যদি গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সেকুলার জাতীয়তাবাদ এবং ৭২ সালের সংবিধান ফিরিয়ে আনা না যায়- তাহলে কেবল বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা করে কোন লাভ হবে না। হয়ত একদিন দেখা যাবে- বর্তমানে যে শাসকরা ক্ষমতা দখল করেছে এরাই ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষণা দিয়ে শুধু তার নামটাকে বহাল রাখবে এবং বাকি অপকর্ম সব চালিয়ে যাবে।
ঠিকানা: স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছিলো তাদের উত্থানের পেছনে কারণ কি?
গা: চৌধুরী: এর জন্য দায়ী সাম্প্রদায়িক দলগুলো। মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামি, জমিয়েতুল ওলেমা ইসলাম, নিজামী ইসলাম। ঠিকানা: বাঙালি এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কোনটা কিভাবে গ্রহণ বা বর্জন করেন? গা: চৌধুরী: আমি দুটোকেই গ্রহণ করি বাঙালি এবং বাংলাদেশী। বাঙালি হচ্ছে আমাদের ন্যাশনালিটি আর বাংলাদেশী হচ্ছে আমাদের সিটিজেনশীপ। ধরুন আমার একটি ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে সুতরাং আমি একজন ব্রিটিশ। কিন্তু তাই বলে আমি বলতে পারবো না আমি একজন ইংরেজ। আমি একজন ব্রিটিশ সিটিজেন নট ব্রিটিশ ন্যাশনাল। ন্যাশনালিটি অনুযায়ী আমি একজন বাঙালি। তেমনি বাংলাদেশে যারা নৃতাত্বিকভাবে জন্মগ্রহণ করেছে, বড় হয়েছে তারা সবাই বাঙালি কিন্তু একই সঙ্গে আমরা যারা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নাগরিক, পাসপোর্ট বহন করি বাংলাদেশের আমরা বাংলাদেশী। এর মধ্যে কোন বিরোধ নেই। জামাতিরা বলে বাঙালি বললেতো পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, ত্রিপুরার বাঙালি। তারা হলেন ভারতের বাঙালি। তাদের জাতীয়তা হচ্ছে ভারতীয়। তারা নিজেদেরকে বাঙালি বলে না এখন। তারা নৃতাত্বিকভাবে বাঙালি। একজন পাঞ্জাবী গিয়ে যদি বাংলাদেশে বসবাস করে এবং বাংলাদেশী পাসপোর্ট নেয় সে একজন বাংলাদেশী, বাঙালি নয়। বাংলাদেশে যে এখনো কয়েক লক্ষ বিহারী আছেন তারা নিজেদের বাঙালি বলবে না, এমন কি বিহারীও বলবে না। কালক্রমে তারা বাংলাদেশী হয়ে যাবে। আমেরিকায় আপনারা যারা আছেন এবং আমেরিকান পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন বা আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেছেন তারা আমেরিকান সিটিজেন, নট আমেরিকান ন্যাশনাল। এটা গুলিয়ে জিয়াউর রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে- সিটিজেনশীপটাকে ন্যাশনালিটির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
ঠিকানা: বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণ কি কেবলই সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ? এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা এবং দুর্নীতি কতখানি দায়ী বলে মনে করেন?
গা: চৌধুরী: বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার জন্য আমাদের সকলেরই দায়ভার রয়েছে। আমাদের শিক্ষিত শ্রেণীরা টাকা পয়সা করার জন্য এত বেশি লোলুপ হয়ে গেলেন যে তারা আদর্শের দিকে তাকালেন না। আমরা সাংবাদিকরা রাতারাতি ভাগ্য বদলাবার চেষ্টা করলাম, রাজনীতিতে যারা ডিস্ট্রিক্ট লীডার হবার উপযুক্ত নন তারা জাতীয় নেতা হবার জন্য লড়াই শুরু করে দিলেন, টাকা পয়সার ব্যাপারেও তাই। একটি জাতি দাঁড়াবার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকু আমরা অপেক্ষা করতে পারিনি। আমরা খুব দ্রুত ৯ মাসে স্বাধীন হয়েছি, পরবর্তী ৯ মাসে আমরা স্বচ্ছল হতে চেষ্টা করেছি, তার ফলে ব্যাপক দুর্নীতি করেছি। আমাদের একটা ছোট্ট সামরিক বাহিনী কোথায় তারা দেশ রক্ষায় আত্মনিবেশ করবে, তা না করে ক্ষমতা দখল করে দেশের শাসনভার নিয়ে বসে আছে। ফলে তাদের আর ফাইটিং স্প্রিরিটও নেই। আমার তো মনে হয় এখন দুর্নীতির দায়ে যে সব রাজনীতিবিদদের ধরা হয়েছে তারচেয়ে আর্মিতে দুর্নীতি বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তাহলে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশে আর্মিতে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা পৃথিবীর কোন আর্মিতে হয়নি। মিলিটারীর দুর্নীতির কোন সীমা পরিসীমা নেই। বাংলাদেশের গুলশান, বারিধারা, বনানী, ডিওএইচ এর বাড়িঘরের খোঁজ নেয়া হলে দেখা যাবে মেজদের যে পরিমাণ বাড়ি আছে তা রাজনীতিবিদের নেই। তবে ২/১ জনের হয়তো চোখ ধাধানো বাড়ি আছে। কিন্তু মেক্সিমাম মিলিটারী অফিসাররাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবিধা লুট করেছে বেশি। এর ফলে একটা শ্রেণীর হাতে টাকা এবং সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে গেছে এবং বাংলাদেশের প্রকৃত যে উন্নয়ন হবার কথা ছিলো তা হয়নি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা বারবার ব্যর্থ হবার কারণ হচ্ছে সেনা বাহিনীর ক্ষমতালিঞ্ঝা, দুর্নীতি এবং সেই সঙ্গে রাজনীতিবিদের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা।
ঠিকানা: বাংলাদেশের জন্মের পেছনে হোসেন শহীদ সরোওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী এবং শেরে বাংলা ফজলুল হকের অবদান কতটা ছিলো?
গা: চৌধুরী: শেরে বাংলার যথেষ্ট অবদান আছে। তার দলের নাম ছিলো কৃষক প্রজা পার্টি। পরে হয় কৃষক শ্রমিক পার্টি। তিনি যদিও পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক তারপরেও তিনি জিন্নাহর সাথে বাঙালি মুসলমানের স্বাধীকার ও স্বাতন্ত্র রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন এবং মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। আবার ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের চীফ মিনিস্টার হবার পরেও পাকিস্তানীরা তাকে বহিষ্কার করে যেহেতু তিনি বাঙালির স্বাধীকারের জন্য লড়েছেন। অন্যদিকে মাওলানা ভাসানীতো পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাসন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই- এ অংশ নিয়েছিলেন। আমার ধারণা একমাত্র হোসেন শহীদ সরোওয়ার্দী ( আমার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন) বাঙালিদের স্বাধীকারে বিশ্বাস করতেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ব শাসন পেয়ে গেছে। এটা সম্পূর্ণ অসত্য কথা। তিনি ডেমক্র্যাট ছিলেন এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন- যা ছিলো লিয়াকত আলী এবং জিন্নাহ স্টাইলে গণতন্ত্র। বাংলাদেশের জাতীয়তা, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে তার খুব একটা অবদানও আছে বলে আমি মনে করি না। বরং তার মৃত্যু হবার পরে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগে। শহীদ সরোওয়ার্দী আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থেকে সরে আসার কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া সম্ভব হয়েছে।
ঠিকানা: দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠায় সে সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং আজকের আওয়ামী লীগের কোন ব্যর্থতা আছে বলে কি মনে করেন?
গা: চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু ব্যর্থ হয়েছেন একথা আমি বলবো না। কারণ তিনি সময় পাননি। দেশ স্বাধীন হবার তিন বছরের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি ধীরে ধীরে স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে আগাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি পারেননি। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা বিরাট। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে দলকে এবং দেশকে তার আদর্শে রাখার পরিবর্তে তারা ধীরে ধীরে কম্প্রোমাইজ করেছেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে। বিএনপির বাংলাদেশ জিন্দাবাদকে বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক, বিএনপির বিসমিল্লাহকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে- এই সব করে করে বিএনপির রিলিজিয়াস কালচারটাকে তারাও গ্রহণ করেছে। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গুরুতরভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। শেখ হাসিনাও তার ব্যক্তিগত আচরণ দ্বারা- হিজাব পরা, প্রতিবছর হজ্বে যাওয়া- এই সব নিয়ে মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
ঠিকানা: আপনার সাথে শেখ হাসিনা সরকারের যতটুকু সম্পর্ক থাকার কথা ছিলো তা ছিলো না, সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বরং দেখা গেছে শেখ হাসিনার শাসনামলে আপনি কলম ধরেছিলেন- কারণটা কি?
গা: চৌধুরী: কারণ হচ্ছে শেখ হাসিনা ক্রমশ:ই একটা খারাপ চক্রের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছিলেন। যেমন জাফর উল্যাহ, সালমান এফ রহমান, বাহা উদ্দিন নাসিম, ওসি মান্নান- এরা অর্ধশিক্ষিত লোক এবং তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করে না। জাফর উল্যাহ এবং সালমান এফ রহমানতো রীতিমত পাকিস্তানীমনা লোক বলেই বাজারে অভিযোগ আছে। এদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি একটার পর একটা কান্ড কারখানা করতে শুরু করলেন। ১৯৯৬ সালে করলেন জামাতের সঙ্গে সাময়িক কৌশলের মৈত্রী। তারপর শুরু করলেন হজ্বে যাওয়া, তারপর আওয়ামী লীগের সংবিধান থেকে তো সোসালিজম বাদ দিয়ে আনলেন সামাজিক ন্যায়। তারপরে হিন্দুদের সম্পর্কে তার যে নীতি ছিলো তা বিএনপির চাইতে উন্নত কিছু ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর নাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি। তারপরে তিনি ফতোয়া চুক্তি করলেন। মাওলানা বুলবুলির সাথে চুক্তি করেছেন। এই সবের বিষয়ে আমাকে প্রতিবাদ করতে হয়েছে। আজকে তার যে পরিণতি এর জন্য শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার হননি তার ভুলেরও শিকার হয়েছেন।
ঠিকানা: জঙ্গীবাদ এবং মৌলবাদ উত্থানের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নীতি থেকে বিচ্যুতিকে দায়ী মনে করেন কি?
গা: চৌধুরী: অবশ্যই মনে করি। বঙ্গবন্ধুর চার মূল নীতিকে ধরে না রাখা এবং ৭২ এর সংবিধানে ফিরে না যাওয়া বড় বিচ্যুতি। বামপন্থীরা অবশ্য চেষ্টা করেছিলো তারা পারেনি। সোভিয়েট রাশিয়ার পতনের পর সারা বিশ্বে বাম রাজনীতির শূন্যতা সৃষ্টি হয় এবং তার সুযোগ গ্রহণ করে মৌলবাদীরা। মৌলবাদীদের পক্ষে আরেকটা জিনিস সহায়ক হয়েছে আর তা হলো- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে আন্দোলন করতো বামপন্থীরা, বামপন্থীরা দুর্বল হয়ে যাবার কারণে মৌলবাদীরা এন্টি ইন্টেলেকচ্যুয়েল যুদ্ধ বা আন্দোলন শুরু করে। আলজেরিয়াতে, মিশরে, প্যালেস্টাইনে, আফগানিস্তানে, ইরাকে। এই মৌলবাদীদের আমেরিকা বিরোধী ভূমিকা মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। এইটাই উত্থানের মূল কারণ। আজকে আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বললেই মানুষের জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। দেখা গেল ইরাক যুদ্ধের সময় যেখানে বামপন্থীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদ করার কথা ছিলো সেখানে বাংলাদেশে মৌলবাদীরা আন্দোলন ও প্রতিবাদ করছে। আওয়ামী লীগের মত দল সাদ্দামের গালফ ওয়ারের সময় প্রতিবাদ করেনি। অথচ মিশরের যুদ্ধের সময় সরোওয়ার্দীর আমলে ঢাকায় ব্রিটিশ হাই কমিশনার জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো। বিরাট মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু দুটো গালফ যুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। প্রতিবাদ করেছে মোল্লারা। নেতৃত্ব তাদের হাতে চলে গেছে। তবে এখানে দেখতে হবে- মৌলবাদ দুটো ভাগে বিভক্ত। জামাতের মৌলবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহী মৌলবাদ আর একটা হচ্ছে জঙ্গী মৌলবাদ যেটা আলকায়দা- তালেবান। আমেরিকাই জঙ্গী মৌলবাদ তৈরী করেছিলো। আজ তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।
ঠিকানা: আপনি বলতে চাচ্ছেন আল কায়দা এবং তালেবান আমেরিকার সৃষ্টি?
গা: চৌধুরী: আল কায়দা- তালেবান আমেরিকাই সৃষ্টি করে। তারা আফগানিস্তান থেকে রাশিয়াকে উৎখাতের জন্য তৈরী করেছিলো। পরে যখন দেখা গেল এদেরকে আর তাদের ইন্টারেস্টে ব্যবহার করা যাবে না বা যাচ্ছে না, তখন এদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। আমার নিজেরও একটা সন্দেহ যে, ৯/১১ সৃষ্টির পেছনে হয়তো মৌলবাদীদের সঙ্গে আমেরিকান কোন লবির- সমর্থন ছিলো।
ঠিকানা: আপনি বাংলাদেশের একজন কলাম লেখক। আপনার অগণিত ভক্ত পাঠক রয়েছে। আপনি দেশ ছেড়ে পরবাসে কেন? আপনাকে অনেকেই আওয়ামী ঘরাণার বুদ্ধিজীবী মনে করেও সেই আওয়ামী লীগের শাসন আমলে দেশে ফিরে গেলেন না কেন?
গা: চৌধুরী: আমারতো বিদেশে আসার ইচ্ছা ছিলো না। ডাক্তাররা বলেছিলেন আমার স্ত্রী ৪৮ ঘন্টা বাঁচবে। মূলত: তার চিকিৎসার জন্য বিলেতে এসেছিলাম। বিলেতে আসার পর তার চিকিৎসা হয়েছে কিন্তু তিনি পঙ্গু হয়ে যান। তার চিকিৎসার সব কিছুই চলছিলো বিলেতের ডাক্তারদের পরামর্শে। দ্বিতীয়ত আমি বিলেতে আসি ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে আর ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। এরপর আমার পাসপোর্ট জিয়াউর রহমানের আমলে আর নবায়ন করা হয়নি। আমিও আর দেশে যেতে পারি নি। এখন ছেলেমেয়েরা এখানে বড় হয়ে গেছে, আর যাওয়ার কোন পরিবেশও আমি খুঁজে পাই না। আর হাসিনার শাসন আমলে কেন যাননি- সেই প্রসঙ্গে বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার অনেক নীতির সাথে আমি ঐক্যমত পোষণ করতে পারিনি। যেমন জামাতের সঙ্গে মৈত্রী তার কোন কোন কাজ আমার পছন্দ হয়নি, আমি মনে করেছি এটা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিরোধী। এই সবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তিনি ক্ষুন্ন হয়েছিলেন। দেশে যেতে পারিনি এটা ঠিক নয়, আমি দেশে গিয়েছিলাম কিন্তু তার সাথে দেখা করিনি। কারণ তার বেশিরভাগ কাজ আমাকে ব্যথিত করেছে। আমাকে আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলা হয়। আসলে আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি যতক্ষণ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার মূলমন্ত্রের পক্ষে।
ঠিকানা: আপনার লেখার অসংখ্য অনুরাগী আবার আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগও অনেক। অনেকেই বলেন, আপনি আপনার নিজস্ব ভাবনাকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। আর প্রমাণ হিসাবে বেশিরভাগ সময় মৃত মানুষের দৃষ্টান্ত টানেন। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
গা: চৌধুরী: আমি যে ঘটনাগুলো লিখছি সেইগুলো মিথ্যা কিনা, সেটা কেউ বলেন না। তাছাড়া মৃত ব্যক্তি ছাড়া আপনি ইতিহাস লিখবেন কি করে? সম্রাট আকবর থেকে শুরু করে সবাই মৃত। এরা কেউ কি তাদের সম্পর্কে বলা কথা দেখেছে? কিন্তু আমি যাদের কথা লিখছি তাদের অধিকাংশ হচ্ছে আমি যাদের সাথে কাজ করেছি। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইত্তেফাকের মানিক মিয়া, মাওলানা আকরাম খাঁ, জহুর হোসেন চৌধুরী, রাজনীতিবিদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরেছি। আজকে উনারা নেই। আমি যখন লিখি তখন এদেরকে কি আমি কবর থেকে তুলে আনবো? আমি দায়িত্ব নিয়েই লিখে যাচ্ছি। যারা বিশ্বাস করার তারা করবে। আর যারা করবে না তাদেরকে আমি আর বিশ্বাস করাতে পারবো না। কিন্তু যখনই আমার কথার যুক্তি খন্ডাতে না পারে তখনই তারা বলে- এই লোক টাকা নিয়ে লেখে বা মৃত ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দেয়। আমার বয়স এখন ৭৫। আমার বন্ধু- সহকর্মী এম আর আক্তার মুকুল, আহমেদুর রহমান, নরুল ইসলাম পাটোয়ারি, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী নেই। আমার ৮০ পাসেন্ট সহকারী মৃত।
ঠিকানা: আপনি পলাশী থেকে ধানমন্ডী নাটকে তাজউদ্দিন আহম্মেদ সম্পর্কে যে মনোভাব তুলে ধরেছেন- সে সম্পর্কে অনেকেই বলেছেন- আপনি প্রকৃত ঘটনা তুলে না ধরে আপনার নিজের ধারণা আরোপ করেছেন- কথাটি কি সত্য?
গা: চৌধুরী: এটা মোটেই সত্যি না। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজ উদ্দিনের যে মনোমালিন্য হয়েছিলো তা তুলে ধরেছি। একজনের ছিলো অভিমান আরেক জনের ছিলো সন্দেহ- এটাই আমি তুলে ধরেছি। বঙ্গবন্ধরু ছিলো সন্দেহ আর তাজ উদ্দিনের ছিলো অভিমান। যারা বলে আমি সত্য কথাটা চাপা দিয়েছি, সেই সত্য কথাটা কী?
ঠিকানা: আপনি একজন গল্প লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার কিংবা কবি না হয়ে কলামিস্ট হলেন কেন?
গা: চৌধুরী: আমার জীবনেও কলামিস্ট হবার ইচ্ছা ছিলো না। শৈশব কাল থেকেই আমার ইচ্ছা ছিলো আমি একজন কথা শিল্পী হবো। কিন্তু কপাল এমন খারাপ তখনকার দিনে গল্প- উপন্যাস লিখে টাকা পাওয়া যেত না। আমার মনে আছে আমার প্রথম বই এর জন্য রয়ালিটি পেয়েছিলাম ১০০ টাকা। সেই ১০০ টাকা আদায় করতে প্রকাশকের কাছে আমাকে যেতে হয়েছে ১০০ বার। তখন বাধ্য হয়ে সাংবাদিকতা শুরু করি এবং কলাম লিখতে বাধ্য হই। এখন আমি একটি বই লিখলে যে টাকা পাব তার তুলনায় কলাম লিখলে দশগুণ টাকা বেশি পাই এবং সংসার চলে এই অর্থে। বিলেতে বসবাস করার জন্য প্রতিমাসে আমার ২ হাজার পাউন্ড না হলে চলে না- এই টাকাটা আমি কাগজে লিখে আর্ন করি। কিছু রেডিও স্ক্রিপ্ট লিখি, টিভি স্ক্রিপ্ট লিখি এবং ঢাকার ৪ টা দৈনিক ও লন্ডনের চারটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখে কোন মতে আমি টাকাটা জোগাড় করি। শুধু যদি গল্প- কবিতা লিখতে যাই তাহলে টিকে থাকতে পারবো না।
ঠিকানা: বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং কলামিস্ট সম্পর্কে কিছু বলুন।
গা: চৌধুরী: বাংলাদেশে অনেক সাহসী কলামিস্ট আছেন। আমার চেয়েও ভাল লেখেন এবং সাহসী। যেমন ধরুন ড: মুনতাসীর মামুন, আবেদ খান, আবুল মোমেন, আব্দুল আলিম- এই রকম অনেকেই আছেন। অনেক তরুণ বেরিয়েছেন, যেমন স্বদেশ রায়, বিভু রঞ্জন সরকার, রঞ্জন সরকার ও অজয় রায়- এদের লিখনী বলিস্ট এবং সাহসী। তারা দেশে বসে সাহস করে লিখছেন। আবার খারাপ লেখকও আছেন বাংলাদেশে। এমাজ উদ্দিন আহমেদ, আবু আহমেদ, আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ- এই জাতীয় অনুগ্রহভোগী, তাবেদার কলামিস্টও আছেন। তারা প্রতিনিয়ত বিএনপির তোয়াজ করে চলছেন।
ঠিকানা: আপনার প্রতি মানুষের যে অসীম ভক্তি শ্রদ্ধা ভালবাসা তার প্রধানতম কারণ আপনি অমর একুশে গানের রচয়িতা। আসলে কী আপনাকে এই গান রচনায় তাড়িত করেছিলো? আপনি কি মনে করেন- সে সময়ে ঐ টাটকা আবেগ নিয়ে গানটি রচনা না করলে আজ আরো অনেক বেশি তাৎপর্যময় গান রচনায় সক্ষম হতেন?
গা: চৌধুরী: না পারতাম না। ঐগুলো সব এক্সিডেন্টাল প্রোডাকশান। বঙ্গবন্ধু আমাকে যে দিন বললেন, দেশ স্বাধীন হয়ে গেল তুমি একুশে ফেব্রুয়ারির মত একটা গান লেখ। আমি তাকে বললাম- বঙ্গবন্ধু আপনি একটা কাজ করেন- ৭ই মার্চের মত ভাষণ আবার দেন। তিনি বললেন- আরে পাগল এটা কি করে দেব? তখন আমি বললাম এসব প্ল্যান করে করা যায় না।
ঠিকানা: বর্তমান সেনা সমর্থিত ড: ফখরুদ্দিন আহমেদের সরকারকে আপনি প্রথমে উচ্ছসিত প্রশংসা করে কলাম লেখেন। তাতে অনেকে খুশি হয়েছেন, অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, অনেকে হয়েছেন বিভ্রান্ত। এখন আপনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। অনেকেই বলছেন এ সরকারের পক্ষে যা করার তা করে দিয়েছেন। আপনি এখন বলছেন, আপনি ভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন। এখন সেই ভ্রান্তি দূর হয়েছে। আসলেই কি আপনি বিভ্রান্ত হয়েছিলেন না কি তাদের কাছ থেকে আপনি অন্যকোনভাবে হতাশ হয়েছেন। আপনার বর্তমান অবস্থান পরিবর্তনের পর দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে কী? আপনি এর জন্য কি আপনার পাঠকদের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাইবেন?
গা: চৌধুরী: আমি অলরেডি ক্ষমা চেয়েছি এবং ক্ষমা চেয়ে আর্টিকেল লিখেছি। আমি নিজেও বিভ্রান্ত হয়েছি এবং পাঠকদেরও বিভ্রান্ত করেছি। প্রত্যেক লেখকেরই নিজের ভুল শিকার করার সৎ সাহস থাকা দরকার। কেউ যদি মনে করে যে এদের কাছে কিছু অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় সমর্থন করেছিলাম, তারা সেটা মনে করতে পারে। এটা আমার একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। ভুল হবার কারণ- আর্মিতো ক্ষমতায় আসেই। এদের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা হয়েছিলো আমেরিকা আর্মিকে ক্ষমতায় আসতে দেবে না। যদি যায় তাহলে জাতিসংঘের শান্তি মিশন থেকে ১০ হাজার সৈন্য বহিষ্কার করা হবে। এটা সেনা বাহিনীর জন্য বিরাট আঘাত। তারা তা সহ্য করতে পারে না। এটা ছিলো আমেরিকার চাল। আমেরিকা একটা ক্যামেপ্লোফ্লজ করেছিলো। যার ফলে মানুষ মনে করবে এটা একটা সিভিল সরকার। এই পুরো পরিকল্পনাটি আমেরিকার চক্রান্ত। তারা বুঝতে পেরেছিলো ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। আওয়ামী লীগকে ঠেকাবার জন্য এবং বিএনপি- জামাতকে ক্ষমতায় রাখার জন্য তারা এই কাজটি করেছে। হয়ত তারা বিএনপি থেকে খালেদা এবং তার পরিবারকে উৎখাত করতে পারে। কিন্তু সেখানে তাবেদার অন্য একজনকে বসানো হবে। আমি আশান্বিত হয়েছিলাম দুজনকে দেখে। একজন হলেন আমার স্নেহভাজন ড: ফখর উদ্দিন আহমেদ এবং অন্যজন মীর্জা আজিজ। এরা দুজন বিশ্ব বিদ্যালয়ে আমার জুনিয়র ছিলেন এবং ছোট ভাই এর মত ছিলেন। আমরা একসঙ্গে চলাফেরা করতাম। ড: ফখরুদ্দিনকে আমি জানি খুব রবীন্দ্র সঙ্গীত ভক্ত। প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে সে যখন প্রথম বক্তব্য দেন সেখানে সে রবীন্দ্র নাথের কবিতা আবৃতি করেছে। এই সব দেখে আমার খুব ভাল লেগেছে এবং ক্ষমতা নেয়ার এক মাস পরেই বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করতে গেল। প্রধান সেনাপতি বললেন, এতদিন আমরা জাতির পিতাকে সম্মান জানাতে পারিনি। এই সব শুনে মনে হলো যে এরা সঠিকভাবেই এসেছে এবং দেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে হয়তোবা কিছুদিন ক্ষমতায় থাকবে। দেশে গেলাম এদের সাথে কথাবার্তা হলো। মনে হলো এদের ক্ষমতায় থাকার কোন ইচ্ছা নেই। এটা আমার বিরাট ভুল হয়েছে। এরা যে পরিকল্পনা করে এসেছে, এদের যে আসল টার্গেট শেখ হাসিনা, এদের আসল টার্গেট আওয়ামী লীগ- এটা আমি বুঝিনি। এরা যখন আব্দুল জলিলকে ধরে নিয়ে শিকারোক্তি আদায়ের জন্য অত্যাচার করেছে, শেখ সেলিমের উপর অত্যাচার করেছে তা শুনে বিস্মিত হয়েছি। এদিকে তারেক এবং ফালুকে গ্রেফতার করে দেখিয়েছে যে, আমরা এদেরকেই টাগের্ট করেছি। তারেককে তারা এখন রাজার হালে রেখেছে। তার বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করা হয়নি। বাবরের বিরুদ্ধেও তাই। ধরেছে তারা আওয়ামী লীগের সভানেত্রীকে। যে মহিলা ৫ বছর দেশ লুট করেছে তার চেয়ে দুর্নীতিবাজ মান্নান ভূইয়া এই সরকারের মদদে নতুন বিএনপি করার চেষ্টা করছে। যে লোকটিকে ছাত্র লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে দুর্নীতির দায়ে সেই রাজনীতির ফসিল ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীকে রাজনীতিতে এনে মোটর শোভা যাত্রার অনুমতি দেয় অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী বিলেত থেকে দেশে গিয়েছিলেন এবং সিলেটে এক বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে তাদের গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা দেয়া হয় তাদের বিরুদ্ধে। তাদের অত্যাচারের কাহিনী শুনে মনে হয়েছে এরা অন্য উদ্দেশ্যে এসেছে। আমি তো চুপ থাকতে পারতাম কিন্তু থাকিনি। আমি দেশে থাকা অবস্থায় তারা আমাকে যে সম্মান দেখিয়েছে এবং পুলিশ প্রোটেকশন দিয়েছে তাতো আমি আগামীতেও ভোগ করতে পারতাম এবং আমি বঙ্গবন্ধুর উপরে যে ছবি বানাতে চাচ্ছি তাও সরকারি অনুদানে বানাতে পারতাম। এখন আর পারবো না। তাদের অত্যাচারে আমার বিবেকের তাড়নায় চুপ হয়ে বসে থাকতে পারিনি। সত্য কথা বলা ভালো। তাতে যদি দেশে যেতে না পারি কোন অসুবিধা নেই। তিনি কথা প্রসঙ্গে আরো বলেন, কোরআনে বলা আছে, অত্যাচারি শাসকের সামনে সত্য কথা বলাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ জেহাদ। এই ধরনের জেহাদে মারা যাবো কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু কাপুরুষের মত বসে থাকবো না। এখন সমাজে সত্য কথা বলার সাহসী লোকের সংখ্যা কম। আমি যেহেতু বাইরে আছি, সুযোগ পেয়েছি এবং নিরাপদে আছি সত্য কথা বলে যাবো। এরা গভর্ণমেন্ট অব ব্লাকমেইলার, মার্ডারার এন্ড লায়ার। প্রত্যেকেরই সমান্য ভুল- ক্রুটি থাকতে পারে আমাদের জীবনে। সেগুলোকে তারা এখন কাজে লাগাচ্ছে। আমি শুনেছি এই সরকার ড: কামাল হোসেনকে ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার ভয় দেখিয়েছে। যার ফলে এই ভদ্র লোকের এমন অবস্থা। তাকেও ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। সত্য মিথ্যা আমি জানি না।
ঠিকানা: এই সরকার সম্পর্কে আপানার শেষ কথা কি?
গা: চৌধুরী: এই সরকারকে রাজনৈতিক আন্দোলন দ্বারা সরানো যাবে না। এই সরকারের পেছনে আমেরিকা, সৌদী আরব, পাকিস্তান এমন কি ভারতও রয়েছে। এই দেশগুলো তাদের স্বার্থের কারণেই সরকারকে সমর্থন করছে। এরা জনগণের আন্দোলনের পরোয়া করে না, এরা বাতিস্তুতার মত নিষ্পেষণ চালাবে, দরকার হলে মানুষ খুন করবে, এটা হলো ওয়াস্ট গভর্ণমেন্ট। খালেদা জিয়ার সরকারও এত ওয়ার্স্ট ছিলো না। আমি বিশ্বাস করি মানুষ এদের অত্যাচারে একদিন অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হবে এবং বাংলাদেশে একটা গেরিলা যুদ্ধ হবেই।
ঠিকানা: আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশ কেমন হবে?
গা: চৌধুরী: আমার মনে হয় বাংলাদেশে একদিন মৌলবাদ ব্যর্থ হবে। মানুষ যত শিক্ষিত হবে মৌলবাদ ততই দুর্বল হবে। আমার স্বপ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে কোন মৌলবাদ থাকবে না এবং পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মিলে ইউনাইটেড সোসালিস্ট বাংলাদেশ তৈরী হবে। ঠিকানা: বর্তমানে কি নিয়ে লেখালেখি করছেন? গা: চৌধুরী: বর্তমানে আমি বেশির ভাগ সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে ছবি করবো তা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি। ছবিটার নাম এখনো চূড়ান্ত করিনি। তবে একটি নাম ঠিক করেছি। আর তা হলো- এ পোয়েট অব পলিটিক্স। ঠিকানা: আপনার জীবনের ২/১ টি আনন্দ বেদনার কথা পাঠকদের জন্য তুলে ধরবেন কী? গা: চৌধুরী: আমার আনন্দ হচ্ছে বাংলাদেশ যে দিন স্বাধীন হলো। এবং আমাকে যখন পাঠানো হয় তাজ উদ্দিন সাহেবের বক্তব্য লেখার জন্য। এটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। বেদনার দিন হলো যে দিন বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম সংযোজন করা হয়। একটি কলমের আঁচড়ে একজন জেনারেল সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে দেন। বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিলো। জিয়াউল হক পাকিস্তানের যে সর্বনাশ করেছেন তারচেয়েও বেশি সর্বনাশ বাংলাদেশের করেছেন জিয়াউর রহমান।
ঠিকানা: আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক এবং কলামিস্ট হওয়া সত্ত্বেও আপনার ব্যবস্থাপনায় কোন পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি কেন?
গা: চৌধুরী: এর কারণ আমি একজন ব্যর্থ ব্যবস্থাপক।
ঠিকানা: আপনার প্রকাশিত গন্থের সংখ্যা কত?
গা: চৌধুরী: আমার ২ শ থেকে আড়াই শ গল্প হবে। উপন্যাস হবে ৭ থেকে ৯ টি এবং প্রবন্ধ হবে দুই থেকে আড়াই হাজার, বই হবে ৩৫ থেকে ৪০ টি। শিশু সাহিত্যও আছে।
ঠিকানা: কোন পুরস্কার পেয়েছেন কী?
গা: চৌধুরী: আমি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছি। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছি সাহিত্যে, ছোট গল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছি ইউনেস্কোতে থেকে। একুশে পদক, শেরে বাংলা পদক, শেখ মুজিব পদকসহ অনেক। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছি ফ্রিডম অব সিটি।
ঠিকানা: নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাঙালি সমাজ নিয়ে কিছু বলুন।
গা: চৌধুরী: আজকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নেই কিন্তু ইংরেজী ভাষার সাম্রাজ্য রয়েছে। এই ভাষার কারণেই তাদের আয় বেশি। এই ভাষা শিখার জন্য বিপুল সংখ্যক ছাত্র লন্ডনে আসছে। আগে সেখানে দুটো বিশ্ব বিদ্যালয় ছিলো এখন অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়। যতগুলো পলিটেকনিক ছিলো সবগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। এই গুলো সবই ভন্ডামী। ইংরেজী ভাষা আজকে সারা বিশ্বে প্রধান ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হবে। আমার ধারণা এখন পৃথিবীতে ত্রিশ কোটি বাঙালি রয়েছে। এরা যদি ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত না হয়ে- বাংলাদেশ, ভারত, ব্রিটিশ এবং আমেরিকার বাঙালিরা এক হয় তাহলে বিরাট বাজার তৈরী হবে। বাঙালিরা যদি একত্রিত হয় তাতে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। এটা প্রবাসী বাঙালিদের পক্ষে সম্ভব। প্রবাসী বাঙালিরা মসজিদ তৈরী, মন্দির তৈরী এবং ক্লাব না করে বাংলা শিক্ষার জন্য, বাংলা বই প্রকাশের জন্য( যেটা জুইসরা করে), বাংলা ভাষায় পত্রিকা প্রকাশের জন্য ভূমিকা নেন তাতে অনেক কাজ হবে। লন্ডন এবং নিউইয়র্কে যে বাংলা ভাষা বেঁচে আছে তা টিকিয়ে রেখেছেন প্রবাসীরা। বিশেষ করে সিলেটী প্রবাসীরা। প্রবাসী পত্রিকাগুলো প্রবাসে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার ধারণা একদিন বাংলা ভাষা ফরাসি ভাষার মত প্রভাব বিস্তার করবে। ইতালি এবং জার্মান ভাষার সাথে বাংলা ভাষার কিছুটা মিল রয়েছে।
ঠিকানা: আপনার মনে এমন কোন ইচ্ছা ছিলো যা পূরণ হয়নি এবং এর জন্য আজোও কষ্ট পান?
গা: চৌধুরী: আমার মনে একটা কষ্ট আছে। আমার ইচ্ছা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের উপর ইতিহাস রচনা করার ১ হাজার পৃষ্ঠার। সেই জন্য আমি বহু বাস্তব চরিত্র জোগাড় করেছিলাম। এমন সব ঘটনা আমি দিতে পারতাম তা অন্য কেউ দিতে পারতো না। যেমন সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশালে পালিয়ে যাই গ্রামে। এরইমধ্যে পাকিস্তানীরা বরিশালে নেমে যায়। এরপর চলে গেলাম- গষেকটিকা আমার শ্বশুর বাড়িতে। আমরা নৌকা করে গ্রামে ঢুকছিলাম। আমার সাথে ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। উঠলাম আমার শ্বশুর বাড়িতে। আমার শ্বশুরের বন্ধু শাখানাৎ মাস্টার, তিনি আসলেন। এসে বললেন তুমি এসেছো বাবা, তোমাকেতো ওরা মেরে ফেলবে। পাকিস্তানীরা রাজাকারদের সহযোগিতায় এলাকার সমস্ত হিন্দুদের এক জায়গায় আনলো। ৫ হাজার হিন্দু হবে। ১৮ এপ্রিল। মাওলানা রফিক নামে মসজিদের একজন ইমাম আসলেন, এসে বললেন এরা মুসলমান না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে। ভয়ে সবাই বললো আমরা মুসলমান হবো। তারমধ্যে আরো ঘোষণা হলো সমস্ত হিন্দু মেয়েদের মুসলমান ছেলেদের সাথে বিয়ে দিতে হবে। তাতেও তারা রাজি হলো। তার ফলে অনেক হিন্দু মেয়ের বিয়ে হলো। এই অবস্থা দেখে শাখানাৎ মাস্টার আমাকে বললো তার ১৬ বছরের একটি মেয়ে আছে। তুমি তাকে তোমার মেয়ে পরিচয় দিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাও। আমি বিপদে পড়লাম। কী করে তাকে নিবো! আমি টুপি পড়ে মৃত্যু হাতে নিয়ে তার মুসলমান নাম দিয়ে তাকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম এবং ঢাকায় মেডিক্যাল কলেজে একজন নার্স যার নাম ছিলো এলিজাবেথ তার কাছে রেখে গেলাম। স্বাধীনতার পরে এসে দেখি সে নার্সের ড্রেস পরে কাজ করছে। পরে জানলাম তার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি যখন দেশে গেলাম তখন আমার চাচা শ্বশুর বলেছিলেন- আমি যেন রফিক মাওলানার নাম না বলি এবং আমি বলিনি। ঠিক ইহুদীদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে। বরিশালে হিন্দুদের সেইভাবে হত্যা করা হয়েছে। বরিশাল ছিলো ওয়ার্স্ট রাজাকারের ডিস্ট্রিক্ট। এদিক থেকে সিলেট ছিলো বেস্ট ডিস্ট্রিক্ট। এই ইতিহাসগুলো যখন লেখা শুরু করলাম তখন আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এটাই আমার দু:খ, আমি এটা লিখে যেতে পারলাম না।
ঠিকানা: বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং আওয়ামী লীগ- বিএনপির সম্পর্ক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কীভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে?
গা: চৌধুরী: প্রথমত: বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যদি গণতান্ত্রিক দল হতো তাহলে তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক ফাইট হতো। কিন্তু বিএনপি হচ্ছে সামরিক বাহিনীর শিবির। জিয়া বিভিন্ন জনকে টাকা দিয়ে, পদ দিয়ে একটি নাজায়েজ সংগঠন তৈরী করেছেন। অন্য দিকে আওয়ামী লীগ সমস্ত ভুল- ব্যর্থতা থাকা সত্ত্বেও একটি গণতান্ত্রিক দল। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষ যদি নিকারাগুহার মত জাগে এবং অস্ত্র হাতে এই কায়েমী শাসকদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে- তাহলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, তা না হলে হবে না।
ঠিকানা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র রয়েছে কি? থাকলে দূর করার উপায় কী?
গা: চৌধুরী: বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ওয়েতে যদি গণতন্ত্র থাকতো তাহলে পরিবারতন্ত্র থাকতো না। আর্মি যদি বার বার করে ক্ষমতায় না এসে নির্বাচন হতো তাহলে পরিবারতন্ত্র আসতো না।
ঠিকানা: আপনি কি মনে করেন বর্তমান সরকারের হাত ধরেই জামাত সরাসরি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে?
গা: চৌধুরী: জামাতকে আমেরিকা হয়ত ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করবে। তার একটি মাত্র কারণ – তারা মনে করে জামাত হচ্ছে একটি নরমপন্থী মৌলবাদী গ্রুপ। তাদের সামনে রেখেই বাংলাদেশে তারা তালেবান- আল কায়দা রোধ করতে পারবে। আর্মির মধ্যে জামাতের ৩০ পার্সেন্ট সদস্য রয়েছে। আমার ধারণা- বাংলাদেশে মাওবাদীদের সাথে মৌলবাদীদের চূড়ান্ত ফাইট হবে। মাওবাদীদের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশ, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের দিকে।
ঠিকানা: পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সাথে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর কোন পার্থক্য আছে কি?
গা: চৌধুরী: কোন পার্থক্যই নেই। দে আর দা …….অব পাকিস্তানী আর্মি। আমাদের বাংলাদেশে ১ লাখ ৪৫ হাজার …… রয়েছে। এরা টোটালি পাকিস্তানী মনা। এরা উর্দুতে কথা বলে। এরা ভারতকে শত্রু মনে করে। এরা টোটালি এক্সটেন্ডেড ভার্সন অব পাকিস্তানী আর্মি।
ঠিকানা: পাকিস্তান আমলের অনেক আর্মি আফিসারা তো রিটায়ারমেন্টে চলে গেছেন, বর্তমানে নতুন প্রজন্মের লোকজন আর্মিতে রয়েছে। তারপরেও এই অভিযোগ কেন?
গা: চৌধুরী: পার্সন রিটায়ারমেন্টে গেছে কিন্তু মেন্টালিটিতো যায়নি। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা হলো দেশ স্বাধীন হবার পর আর্মিকে ঠিক মত সাজায়নি এবং হিন্দুদের আর্মিতে নেয়নি। ৩০ পার্সেন্ট হিন্দুকে আর্মিতে নিলে আজ এই অবস্থা হতো না।
ঠিকানা: অনেকে বলেন, জাতীয় পার্টির সাথে আপনার একটি সুম্প্রর্ক রয়েছে, যে কারণে আপনি নাকি অনেক সুযোগ- সুবিধা নিয়ে ছিলেন- এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
গা: চৌধুরী: যারা বলেন, তাদের কাছে অনুরোধ আমি কী কী সুযোগ- সুবিধা নিয়েছি বলুন। তবে এরাশাদ সাহেব যেহেতু কবিতা লিখতেন সেহেতু আমাকে ফোন করে বলতেন। আমি বিশ্বাস করি না তিনি কবিতা লিখতেন। তার কিছু কিছু কবিতা লিখে দিয়েছেন সাইফুল বারী। আর বাকিটা উনি নিজেই লেখেন। শামসুর রাহমান যেটাকে বলতেন- পদ্য। আমি একটা দলকে সমর্থন করি। তাও পুরো না। কারণ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাদ দিতে দিতে এখন বিএনপির শ্যাডো সংগঠনে পরিণত হয়েছে। হাসিনার তুলনায় খালেদাকে মডার্ণ মনে হয়। বেশ সাজগোজ করেন। আর হাসিনা মাথায় হিজাব পরে। আমি তাকে এই জন্য নাম দিয়েছিলাম হাজী বিবি।
ঠিকানা: আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?
গা: চৌধুরী: আমার এক ছেলে ৪ মেয়ে। ছেলের নাম অনুপম আহমেদ চৌধুরী। সে এখন রয়টারে জুনিয়র এক্সিজিকিউটিভ হিসাবে কাজ করে। মেয়ে তনিমা চৌধুরী অক্সফোর্ডে আছে, চিন্ময় চৌধুরী স্কুল শিক্ষক, বিনীতা চৌধুরী, সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান ও ইন্দিরা চৌধুরী ক্যামব্রিজ থেকে বের হয়েছে।