বাংলাদেশের ঢোল ভারতীয়র হাতে

স্পোর্টস ডেস্ক : কট্টরপন্থীদের জন্য সুখবর আছে টনটন থেকে। ঢোলের বাড়িতে বাংলাদেশ সমর্থকদের মনে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে দিতে যাদের নিয়োগ দিয়েছে আইসিসি, তাদের সবাই ভারতীয়। ঢোলের গায়ে আবার বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। দিনভর বাংলাদেশ-ভারতের যেসব কট্টর সমর্থক ট্রলের পাল্টাপাল্টি করেন, তাদের জন্য নতুন ইস্যু হতে পারত এটা। তবে টনটনে ওসবের বালাই নেই। ঢোলের বাড়ির তালে তালে নেচেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা, পুরুষ-নারী সবাই। অকারণ কোনো জিঘাংসা নেই, পুরোটাই আনন্দ মিছিল। আইসিসি অবশ্য এ কাজে একচোখা নয়, সংখ্যায় কম হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের জন্যও বরাদ্দ ছিল। শতরঙের পোশাকে দুলতে থাকা মানুষগুলোও কম আকর্ষক ছিলেন না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্যালারিতে লাল-সবুজের আধিক্যই ছিল বেশি। হবে না কেন? গত পরশু থেকেই তো হোটেলে-রেস্তোরাঁয় বাংলাভাষীদের কিচিরমিচির। গত ১৭ জুন সকালে নাশতার টেবিলে পরিচয় তিনজনের সঙ্গে। একজন কানাডা থেকে উড়ে এসেছেন। অন্য দুজনের একজন লন্ডন থেকে আর তাদের বন্ধু এসেছেন ঢাকা থেকে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তিন বন্ধুর মিনি গেট টুগেদারও হয়ে গেল। একটু পর বিসিবির এক পরিচালক হন্তদন্ত হয়ে আমাদের হোটেলে উপস্থিত, তার ভায়রা ভাই যে অস্ট্রেলিয়া থেকে উড়ে এসেছেন বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে।
প্রেসবক্সের ঠিক নিচের গ্যালারির গায়ে আবার সাঁটানো পোস্টারে দেখি উসাইন বোল্ট দৌড়াচ্ছেন ব্যানারটি নিয়ে আসা হয়েছে সুদূর নিউইয়র্ক থেকে। তবে সেটি যেকোনো প্রবাসী বাংলাদেশির সেটি বোঝা যায় বোল্টের ঠিক বাঁ পাশে থাবা উঁচিয়ে ছুটতে থাকা বাঘ দেখে। নিচেই লেখা, ‘টাইগার ইজ হাংরি’ তার মানে, জ্যামাইকান বোল্ট তুমি ভাগো। নইলে ক্ষুধার্ত বাঘের হাত থেকে তোমার নিস্তার নেই
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের সেই সুদিন নেই। ব্যানার-ট্যানার বানানোর ঝামেলায়ও যেতে দেখা যায় না তাদের। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শকদের সঙ্গে ওদের দৃশ্যমান পার্থক্য এটাই। তারা নেচে-গেয়ে আমোদ করে বাড়ি চলে যায়। বাড়ি ফেরার পথে অন্যের আত্মসম্মানে হানা দেয় না।
গৌতম গম্ভীর সেদিন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আগে সমর্থকদের জঙ্গি মনোভাবের সমালোচনা করে পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। যে ভাষায় ভারতের সাবেক ওপেনার দুই দেশের জঙ্গি সমর্থকদের সমালোচনা করেছেন, তা দারুণ সাহসের ব্যাপার। কিন্তুগত ১৭ জুনের ভারতীয় কিছু মিডিয়ার খবর নাড়াচাড়া করে বোঝা গেল, ‘বাপ বাপই রেহতা হ্যায়’ টাইপ উসকানিমূলক প্রচারণা বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনিতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুসারীদের একটি অংশ সব সময় উত্তেজিত থাকে। সেই তাদের উসকে দিলে কি যে হয় ২ জুলাই বার্মিংহামে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের আঁচ যেন এখনই পাওয়া যাচ্ছে
যাক, সে দূরের সম্ভাবনা। গত ১৭ জুন টনটনের কুপার অ্যাসোসিয়েসট কাউন্টি গ্রাউন্ডের ছোট মাঠে বসেছিল উৎসব আর রঙের মেলা। কানাডা থেকে উড়ে আসা আশিক খান নাশতার টেবিলেই আশ্বস্ত হতে চাইলেন বাংলাদেশ থেকে আগত সাংবাদিকের কাছে, ‘ভাই, আজকে জিতব না?’ মনে বিশ্বাস আছে, তার চেয়েও বেশি আছে মাশরাফি বিন মর্তুজাদের প্রতি ভালোবাসা। অবাক লাগে, কাজ ফেলে আরেক মহাদেশ থেকে মানুষগুলো উড়ে আসেন ‘টাইগার’দের সমর্থন করতে এবারই প্রথম নয়, সব বিশ্বকাপেই দূর-দূরান্ত থেকে উড়ে আসেন প্রবাসীরা।
ইংল্যান্ডের শহরগুলোর দূরত্ব বেশি নয়। তাই লন্ডন কিংবা বার্মিংহাম থেকে সকালে ড্রাইভ করে কিংবা ট্রেনে-বাসে করে বাংলাদেশ সমর্থকরা চলে এসেছেন টনটনে। বাংলাদেশ থেকে আগতদের সংখ্যাও কম নয়। সকালে স্টেডিয়ামের মূল ফটকের দিকে যাওয়ার পথে কারো গাড়ির ওপরে, কারো কোলে, ঘাড়ে কিংবা মাথায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। স্বভাবতই কোনোটাই সত্যিকারের বাঘ নয়। বোল্টের দিকে ধেয়ে যাওয়া ক্ষুধার্ত বাঘও কেবলই ছবি।
বাঘ আর তার শিকারের লড়াই হয় তো বনে-জঙ্গলে। প্রতীকী বাঘা-বোল্টের লড়াই গত ১৭ জুন হয়েছে খেলার মাঠে। ছবির উসাইন বোল্ট কল্পিত ফিনিশিং টেপ ছোঁয়ার আগেই বাঘের থাবায় জীবন দিয়েছেন কি না, সে তো জেনেই গেছেন।