বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশি শক্তির মাথাব্যথা

আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দলের ফলাফল মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত যা হয়, অতটা শোচনীয় হয়নি ডেমোক্র্যাটদের। নির্বাচনের আগে নানা জরিপে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখীই দেখা গেছে। অনেকে তাই ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের যে রকম বিপর্যয় আশঙ্কা করেছিলেন, সে রকম বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। বরং সিনেটে জরিপের আগাম আভাসের চেয়ে ভালো করেছে ক্ষমতাসীন পার্টি। আর ডেমোক্র্যাট স্টেট হিসেবে নিউইয়র্কে রিপাবলিকান পার্টি একটুও আঁচড় কাটতে পারেনি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী লি জেলেডিন একটা অঘটন ঘটিয়েও দিতে পারেন। তা হয়নি। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্যাথি হোকুল নিউইয়র্কের প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

এখন আমেরিকানরা তাকিয়ে আছেন ২০২৪-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে। সবারই মনে এখনো ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভয়ংকর স্মৃতি। আমেরিকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে, আইন-আদালত, রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করে অনেকটা অর্থ এবং গায়ের জোরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মে প্রেসিডেন্ট হওয়ার উদগ্র বাসনা এখন আমেরিকার গণতন্ত্রকামী এবং আমেরিকার প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যের প্রতি আস্থাশীল এ দেশের মানুষের মনে ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়। ২০২১-এর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইলেকটোরাল ভোট গণনার দিন ট্রাম্পের উসকানিতে বিশাল দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করার ঘটনার প্রতিক্রিয়া এখনো আমেরিকান সমাজে চলমান। এখনো কিছু কিছু মানুষের মস্তিষ্কে ট্রাম্পের ভূত চেপে বসে আছে। আর যারা শান্তি, গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতিতে বিশ্বাসী, তাদের মনে ভয়Ñকী হয়, কী হয়!

বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন নেই। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের হিসাব-নিকাশও নেই। তবে মূল নির্বাচনেরও খুব একটা দেরি নেই। ২০২৩-এর ডিসেম্বর বা ২০২৪-এর প্রথম দিকেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, উত্তাপ, উত্তেজনা লক্ষ করা যাচ্ছে। বড় দুই দলÑআওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিভিন্ন শোডাউনের মধ্য দিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন শুরু করে দিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরসমূহে দুই দলেরই বড় বড় সমাবেশ, মহাসমাবেশে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ঘটছে। এসব সমাবেশে উত্তেজক সব স্লোগান, একের বিরুদ্ধে অপরের হিংসাত্মক বক্তব্য সাধারণ মানুষের বুকে ভয়ের কাঁপন তুলছে এখন থেকেই।

মানুষ আরো ভীত হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির আড়ালে বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারেÑএই আশঙ্কায়। অতীতেও এমন ঘটনার নির্মম অভিজ্ঞতা মানুষের রয়েছে। মানুষ জীবন দিয়ে, আগুনে পুড়ে বীভৎস চেহারা নিয়ে এখনো জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই তো আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুনের ভয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে ওঠে। সেসব খবর খবরের কাগজে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে বলেও মানুষের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন ঠিকানার গত ৯ নভেম্বর একটি সংখ্যাতেই কয়েকটি সংবাদ, যা নাগরিক জীবনের স্বস্তি বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট হবে। যেমন ‘ডিসেম্বরে সরকার পতনের চূড়ান্ত কর্মসূচি দেবে বিএনপি’, ‘নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গিদের নব-উত্থান’, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত’। এর বিপরীতে সরকারপক্ষও যে চুপ করে বসে থেকে বিরোধী দলের হুমকি হজম করে যাচ্ছে, তা নয়। যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্্যাপন করতে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে রাজপথ দখলে রাখার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি আরো গরম করে তুলেছে। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপি তাদের প্রধান এবং চূড়ান্ত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করার জন্য সমাবেশ করবে। এর বিপরীতে সরকার কী করতে যাচ্ছে, তা এখনো জানা নেই। যা-ই করুক, সেটা যে দেশের এবং মানুষের জীবনে শান্তি বয়ে আনবেÑএমনটি আশা করার কোনো কারণ নেই। ৫১ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে ইতিহাস তো সে কথাই বলে।

যা-ই হোক, যারা গণতন্ত্রের চর্চা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি করেন, সাধারণ মানুষ অন্তত জাতীয় সংকটকালে তাদের মধ্যে সমঝোতা হবে এমনটা প্রত্যাশা করে। তারা যদি দলের মতো দেশটাকেও ভাগ করে রাখে, তাহলে জঙ্গিদের উত্থান ঘটতে দেখা যায়, নিজেদের প্রাঙ্গণে বর্গিদের আনাগোনাও প্রত্যক্ষ করা যায়। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্যই এত কথা বলা। ঠিকানার গত সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠার দুটি শিরোনামে সে কথাই বলা হয়েছে। ‘নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গিদের নব-উত্থান’ সংবাদটিতে বলা হয়েছে, ‘জঙ্গিদের নব-উত্থান সরকারকে চিন্তিত করে তুলেছে। বিশেষ করে, কঠোর হাতে জঙ্গি, সন্ত্রাসীদের দমন করার পর নির্বাচন সামনে রেখে নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অধিক মাত্রায় সক্রিয় করেছে।’

খবরটিতে আরো বলা হয়, ‘নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো নানা কৌশলে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছ। নতুন নাম ব্যবহার করছে। নতুন কর্মী তৈরি করছে। গহিন পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।’ এ-ও জানা যায়, গহিন পাহাড়ে যেসব জঙ্গি সংগঠন জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের সঙ্গে তারা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলছে। কতিপয় ধনী মানুষ, যারা বাংলাদেশের মুুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না, তারা জঙ্গিদের অর্থ সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বলতে চাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে। বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয়, নির্বাচনে যাতে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সমঝোতায় আনার উদ্যোগ যৌথভাবে নিতে চাচ্ছে ওয়াশিংটন ও দিল্লি। দেখার বিষয় হচ্ছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে যৌথভাবে ভূমিকা রাখতে বৈঠক করেছে কোথায়? না, বাংলাদেশে নয়। বাংলাদেশে নির্বাচনে যারা অংশীজন, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, কোনো দলেরই সে বৈঠকে অংশগ্রহণ নেই। বৈঠক হয়েছে ওয়াশিংটনে। বৈঠকে অংশ নিয়েছেন দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে একটি গ্রামীণ প্রবাদ হচ্ছে : ‘যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া-পড়শির ঘুম নেই।’ আসলে বাংলাদেশে যারা জনগণের নামে, দেশের নামে, গণতন্ত্রের নামে রাজনীতি করেন, তারা নিজেরা দেশ, মানুষ ও গণতন্ত্রকে খুব কম গুরুত্ব দেন বলেই প্রতিবেশী কোনো দেশ বা বিশ্ব মোড়লেরা একটি দেশের একান্ত নিজস্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এভাবে নাক গলাতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম কোনো ঐকমত্য থাকে না, তখনই এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। সুযোগ বুঝে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেয়। বিদেশিরাও আমাদের বিষয় নিয়ে গ্লোবাল ভিজেলের নামে নাক ঢোকাতে শুরু করে। তখন একটি দেশের পরিস্থিতি দাঁড়ায় সেই ‘গরিবের বউ সকলের ভাবি’ হওয়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধ করে এত এত প্রাণ ও সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে পাওয়া একটি দেশে এ রকম পরিস্থিতি মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর।
কিন্তু এই পরিস্থিতি আর কত দিন চলবে? ৫১ বছর তো কেটে গেল!