বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

স্পোর্টস ডেস্ক : হারেই শেষ হলো বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন। আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে হেরে সেমিফাইনাল রেস থেকে ছিটকে গিয়েছিল টাইগাররা। ৫ জুলাই ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র লর্ডসে নিজেদের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে প্রতিরোধহীন অবস্থায় আত্মসমর্পণ করেছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। একপেশে ম্যাচে বাংলাদেশকে ৯৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে পাকিস্তান।
টানা দুই হারে পয়েন্ট টেবিলের সপ্তম স্থানে থেকে শেষ করল বাংলাদেশ। ৯ ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৭ পয়েন্ট। সমান ম্যাচে ১১ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে থেকে শেষ করল পাকিস্তান। সমান ম্যাচে ১১ পয়েন্ট নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড। কিউইদের চেয়ে নেট রান রেটে পিছিয়ে থাকার কারণে দর্শকের আসনে জায়গা হলো পাকিস্তানের।
মাশরাফি ভাইকে বিদায়ী উপহার দিতে চান, এবারের বিশ্বকাপ মিশন শুরুর আগে এমন কথা বলেছিলেন বাংলাদেশ দলের প্রায় সবাই।
কিন্তু লিগ পর্বে টানা হারে ‘বিদায়ী উপহার’ বিষয়টি থেকে গেল শুধু কথার কথা হিসেবেই। ৫ জুলাই ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচটিতেও অনুজ্জ্বলই থেকে গেলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। বল হাতে ৭ ওভারে ৪৬ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। ১০ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৪ বলের ইনিংসে ১৫ রান করেন মাশরাফি।
ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ইমাম-উল-হক (১০০), বাবর আজম (৯৬) ও ইমাদ ওয়াসিমের (৪৩) দৃঢ়তায় ৩১৫ রানের বড় সংগ্রহ পায় পাকিস্তান। জবাবে ৩৫ বল হাতে রেখেই ২২১ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। দলের পক্ষে সাকিব আল হাসান ছাড়া আর কেউই দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারেননি। ৬৪ রান করে দলের একমাত্র হাফ সেঞ্চুরিয়ানও সাকিব।
সেমিফাইনালে যেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩০০ রানের অধিক ব্যবধানে জেতার অসম্ভব এক বাস্তবতার মুখে পড়ে পাকিস্তান। ৩১৫ রান করার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ১৯৯২ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সেমির সম্ভাবনা।
শুরুতে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তানকে অস্বস্তিতে রাখেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ও মেহেদী হাসান মিরাজ। রানের জন্য ছটফট করতে থাকা ফখর জামানকে বিদায় করে প্রথম ধাক্কা দেন সাইফউদ্দিন। অষ্টম ওভারে এ ওপেনার ব্যক্তিগত ১৩ রানে মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরার সময় দলীয় রান ২৩। উইকেটে এসে ইমাম-উল-হকের সঙ্গে জুটি গড়ে দারুণ ছন্দে খেলতে থাকেন বাবর আজম। ৬২ বলে ৪ বাউন্ডারিতে অর্ধশত পূর্ণ করেন ইনফর্ম এ ব্যাটসম্যান।
ব্যক্তিগত ৫৭ রানে মুস্তাফিজের বলে পয়েন্টে বাবর আজমের ক্যাচ ফেলেন মোসাদ্দেক। মন্থর শুরুর পর ছন্দ ফিরে পান ইমাম-উল-হকও। ৫২ বলে অর্ধশত পূর্ণ করার পথে চার বাউন্ডারি মারেন এ ওপেনারও। খানিক বাদে আরেক জীবন পান বাবর। এবার উইকেটের পেছনে তার ক্যাচ ফেলেন মুশফিকুর রহিম। দুই দফা জীবন পেয়েও নিজের সংগ্রহটা তিন অংকে নিতে পারেননি বাবর। সাইফউদ্দিনের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন তিনি। ৯৮ বলে ৯৬ রান করার পথে ১১ বাউন্ডারি মারেন এ ইনফর্ম ব্যাটসম্যান। তবে মোহাম্মদ হাফিজকে নিয়ে বড় সংগ্রহের দিকেই দলকে নিয়ে যেতে থাকেন ইমাম-উল-হক। মুস্তাফিজের বলে সিঙ্গেল নিয়ে ৯৯ বলে বিশ্বকাপে প্রথম ও ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সপ্তম শতরান পূর্ণ করেন এ ওপেনার। পরে মুস্তাফিজের বলকে ফ্লিক করতে গিয়ে পা দিয়ে উইকেট ভেঙে দিয়ে সাজঘরমুখো হন ইমাম-উল-হক।
পরপরই মোহাম্মদ হাফিজের বিদায়ঘণ্টা বাজান মিরাজ। হারিস সোহেলকে উইকেটে থিতু হতে দেননি মুস্তাফিজ। এটা ছিল বাঁহাতি পেসারের শততম উইকেট। এরপর অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ হাতের আঘাত নিয়ে মাঠ ছেড়ে যান। এ সময় ইমাদ ওয়াসিমের জোরালো শট পাকিস্তানি অধিনায়কের কনুইয়ের কাছে লাগে।
এরপর ইমাদ ওয়াসিম এক প্রান্তে দ্রুত রান তুললেও আরেক প্রান্তে ছিল আসা-যাওয়ার মিছিল। ওয়াহাব রিয়াজকে বোল্ড করেন সাইফউদ্দিন। শাদাব খান মুস্তাফিজকে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। শেষ ওভারের চতুর্থ বলে ইমাদ ওয়াসিমকে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচে পরিণত করেন মুস্তাফিজ। পরের বলে মোহাম্মদ আমিরকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন। শেষ বল মোকাবেলা করতে উইকেটে আসেন সরফরাজ আহমেদ।
শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ওভারে ৯ উইকেটে ৩১৫ রান করে পাকিস্তান। মুস্তাফিজ বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেট নিলেন। আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৫৯ রানে ৫ উইকেট নেয়া পেসার এদিন খরচ করেন ৭৫ রান। ৩ উইকেট নিয়েছেন সাইফউদ্দিন। মিরাজ ১০ ওভারে ৩০ রানে পান এক উইকেট।
এ ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এলেন মুস্তাফিজ। ৮ ইনিংসে ২০ উইকেট নিয়েছেন এই বাঁ-হাতি পেসার। ২৪ উইকেট নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি অস্টেুলিয়ান ফাস্ট বোলার মিশেল স্টার্ক। মুস্তাফিজ দুইয়ে থাকলেও গত রাতে রান সংগ্রাহকদের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছেন সাকিব আল হাসান। ৫৪৪ রান করা ভারতের ওপেনার রোহিত শর্মাকে ছাড়িয়ে গেছেন এ অলরাউন্ডার। ৫১৬ রান নিয়ে তালিকার তৃতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার।
জয়ের জন্য ৩১৬ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই মোহাম্মদ আমিরের বলে সিøপে ক্যাচ দিয়েছিলেন সৌম্য সরকার, হারিস সোহেল অবশ্য তা ধরে রাখতে পারেননি। ষষ্ঠ ওভারে সেই আমিরের বলেই পয়েন্টে ক্যাচ দেন সৌম্য। দারুণ ক্যাচ নিয়ে এ ওপেনারকে বিদায় করেন ফখর জামান। ২২ রানে বিদায় নেন সৌম্য। ইনিংসের শুরু থেকে ধুঁকতে থাকা তামিমও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। একাদশ ওভারে শাহিন আফ্রিদির সেøায়ারে বিভ্রান্ত হন এ ওপেনার। ড্রাইভ করতে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় পাকিয়ে বল উইকেটে টেনে এনে বোল্ড হন। ২১ বলের মন্থর ইনিংসে ৮ রান করতে পেরেছেন তামিম। বাংলাদেশ স্কোর বোর্ডে তখন ৪৮/২। কিন্তু ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই বিদায় নেন মুশফিক। ওয়াহাব রিয়াজের বলে বোল্ড হয়ে যান তিনি। ৭৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ঘোর বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ।
সতীর্থরা একের পর এক হতাশ করলেও বিশ্বকাপের দুরন্ত ফর্ম এ ম্যাচেও টেনে আনেন সাকিব। আগের সাত ইনিংসে ৬ বারই পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করা সাকিব গত ৫ জুলাই পাঁচ বাউন্ডারিতে ৬২ বলে পূর্ণ করেন অর্ধশত। তার ৬৪ রানের ইনিংসটির ইতি ঘটান শাহিন আফ্রিদি। স্কোর বোর্ডে তখন ১৫৪/৫। এখান থেকে আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি টাইগাররা। মাত্র ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসে ধস নামান শাহিন আফ্রিদি।