ঢাকা : বিরোধী দল গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে দোলাচলে ছিল। তারা কোনো ইশতেহারও দেয়নি। নির্বাচনে তাদের বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার পেছনে একটি ভালো যুক্তি দেখান। আল-জাজিরার ‘হেড টু হেড’ শো’তে গত সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। আল-জাজিরা অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ওই সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে গওহর রিজভী ছাড়াও তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল অংশ নেন। তারা হলেন- যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম, এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-এশিয়া বিশ্লেষক আব্বাস ফায়েজ ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুইডিশ সাংবাদিক তাসনিম খলিল। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত ওই ‘হেড টু হেড’ শো’তে প্রায় অর্ধশতাধিক দর্শক উপস্থিত ছিলেন।
সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করেন আল-জাজিরার সাংবাদিক ও উপস্থাপক মেহেদী হাসান। একটি জাতীয় দৈনিকের পাঠকদের জন্য ওই প্রশ্নোত্তর পর্বের চুম্বক অংশ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
মহেদী হাসান : গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে আপনার দল নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। এতে কি মনে হয় যে বাংলাদেশ ক্রমশ একটি একদলীয় দেশে পরিণত হচ্ছে?
রিজভী : এর আগে কিছু মানুষ এটা বলেছে। আপনিও এটা বলছেন তাতে আমি বিস্মিত। একটি দল তিনবার নির্বাচিত হয়েছে, শুধু এই কারণে একটি দেশ একদলীয় হয় না।
মহেদী হাসান : ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮টি আসনে কিভাবে বিরোধীরা জিতলো?
রিজভী : এই প্রশ্নটি আমি আপনাকে ভিন্নভাবে করতে পারি। আমাকে একটি ভালো যুক্তি দেখান, কেন বিরোধী দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হবে? তাদের কোনো ইশতেহার ছিল না। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না, এ নিয়ে তারা দোলাচলে ছিল।
মেহেদী হাসান : তার মানে আপনি ৯৬ শতাংশ আসনে জয় পেয়ে সন্তুষ্ট। বাশার আল আসাদ ও কিম জং উন যে হারে ভোট পেয়ে নির্বাচনে জিতেছেন, এখন শেখ হাসিনাও সে রকম ভোট পেয়ে জিতছেন।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে আপনি ৯৬ ভোট পেয়ে সন্তুষ্ট?
রিজভী : না, আমি মনে করি এই তুলনা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক। এখানে মোট ৩৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেনÑ যারা স্বয়ং নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। যে সরকার খুবই ভালো কাজ করেছে, তাকে কে ভোট দেবে না?
মেহেদী : অনেক ভালো সরকার আছে যারা ৫০, ৬০ ও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে। ঠিক আছে, আপনি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, নির্বাচনে এমন কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে, যা নির্বাচনী প্রচারণাকে কলঙ্কিত করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ৫০টি আসনে তদন্ত করে ৪৭টি আসনে গুরুতর অনিয়ম দেখতে পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া ভোট, ভোটগ্রহণের আগেই ব্যালটবাক্স ভর্তি, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়ার ঘটনা। চট্টগ্রামে ভোটগ্রহণের আগেই ব্যালটবাক্স ভর্তি করার ভিডিও ফুটেজ বিবিসি’র কাছে রয়েছে।
রিজভী : নির্বাচন কমিশন ১৫ বা ১৯টি ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম দেখতে পেয়েছে। নির্বাচনে মোট ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি বা ১৯টি কেন্দ্রে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। আমি সঠিক সংখ্যাটি মনে করতে পারছি না।
মেহেদী : হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, হত্যা ও এমনকি গুমও করা হয়েছে।
রিজভী : এরা সেসব মানুষ যারা ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ করেছে ও মানুষ হত্যা করেছে। এরপরে তারা গা ঢাকা দেয়। নির্বাচনের সময় তারা আবারো সামনে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাই যখনই তারা আবারো সামনে এসেছে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মেহেদী : মিন্টু কুমার দাস নামের ঢাকার এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাস্তা অবরোধের অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি ২০০৭ সালে মারা গেছেন। এটা কি বিব্রতকর না?
রিজভী : এটা বিব্রতকর। যখন এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয় তা আসলেই বিব্রতকর। কিন্তু পুলিশি তদন্তে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ধরনের ত্রæটি প্রায়ই হয়ে থাকে।
মেহেদী : গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অনেক অভিযোগ রয়েছে। এই চ্যানেলেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করার কারণে ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমকে পুলিশ তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ‘মানসিক অসুস্থ’ আখ্যায়িত করেছেন। আপনি কি মনে করেন সে মানসিকভাবে অসুস্থ? নাকি সে নিজের দায়িত্ব পালনকারী একজন সাংবাদিক।
রিজভী : বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত সবাই জানে যে, সেটা স্বাধীন ও শক্তিশালী। শহিদুলকে আল-জাজিরায় বক্তব্য দেয়ার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভুল তথ্য ছড়ানোর দায়ে, যা সহিংসতা উসকে দিচ্ছিল। শহিদ আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
মেহেদী : শহিদুল সাংবাদিকদের বলেছে, পুলিশ তাকে এত খারাপভাবে মেরেছে যে, তার জামা ধুয়ে দিতে হয়েছে। কেননা সেটি রক্তে পরিপূর্ণ ছিল। তাকে ১০৭ দিন কারাবন্দী রাখা হয়, নির্যাতন করা হয়। এভাবেই কি আপনি বন্ধুর সঙ্গে আচরণ করেন?
রিজভী : আমি তার সঙ্গে করা আচরণের বিষয়ে বলিনি। শহিদ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাকে গ্রেপ্তার করার পর আমি নিজে থেকে তার উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করি। পরিবারকে তার জন্য খাবার নিয়ে যেতে দেয়া হয়।
মেহেদী : তাকে কেন চিকিৎসা দেয়ার দরকার হয়েছিল?
রিজভী : আপনি যে মারধরের কথা বলছেন, তার কারণে না।
মেহেদী : পুলিশ তাকে মারধর করেছে সেটা অস্বীকার করছেন?
রিজভী : আমি এটা অস্বীকার করিনি। আমি অস্বীকার করতে পারি না এই কারণে যে, আসলে কি ঘটেছে তা আমি জানি না।
মেহেদী : আপনার বন্ধু কি মানসিকভাবে অসুস্থ?
রিজভী : না
মেহেদী : তাহলে প্রধানমন্ত্রী কেন তাকে মানসিক অসুস্থ বলেছেন?
রিজভী : এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তার মনে কি আছে তা আমি জানি না। কিন্তু কেউ যদি ভুয়া তথ্য ছড়ায়, যাতে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, যা সহিংসতা উসকে দেয়
মেহেদী : কি ভুয়া তথ্য ছড়ানোর কথা বলছেন আপনি?
রিজভী : কয়েকজনকে মেরে ফেলা হয়েছে, মৃতদেহ ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে।