বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। দুই দেশের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর অনন্য অবদানের ফসল হিসেবে। সময়ের বিচারের দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত অক্টোবরে শেষ ভাগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরকালে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় দুই পক্ষই সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানিতে সহায়তা দিতে ভারত সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় জলবিদ্যুৎ সহায়তা খুব শিগগির সই হবে। সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ভারত এখন বাংলাদেশে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে। ভবিষ্যতে এটি তিন গুণ না হলেও দ্বিগুণ হবে। এর আগে ভারতের অর্থ ও করপোরেট মন্ত্রী অরুণ জেটলি বাংলাদেশ সফর করেন এবং বাংলাদেশের অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী যথাক্রমে আবুল আল আবদুল মুহিত এবং তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও এই ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির আলোচনায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়, এ সফরের সময় তা প্রজেক্ট আকারে বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষরিত হয়। এর আগেও প্রথম এবং দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ৩ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য ৯ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ভারতের দেওয়া ঋণ দুই দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণ, প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, সংযোগ এবং সেবা খাতে উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবদান রাখবে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায়, দুই দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেল যোগাযোগও অগ্রগতি অর্জন করছে। খুলনা থেকে নতুন মৈত্রী ট্রেন চালু হয়েছে কলকাতা পর্যন্ত। ভিসাব্যবস্থা আরও সহজ হয়েছে। গত বছর লক্ষাধিক লোক ভিসা নিয়ে ভারত সফর করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও ভারত থেকে আগমনের সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী বর্তমান মেয়াদেই তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আমরা আশা করি যেহেতু অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, জটিল সমস্যা বিশেষ করে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে, সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে এবং এর আগে গঙ্গার পানিচুক্তিও হয়েছে; কাজেই তিস্তাচুক্তিও স্বাক্ষর হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন তৈরি, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বিষয়ও বিবেচনাধীন রয়েছে। তেল, গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিনিয়োগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় আছে। বাংলাদেশ আজ দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিকভাবে কাজ করছে। বৈশ্বিক পর্যায়েও ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও জোটের সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব চলছে এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ভারত সফর করেছেন এবং ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করেছেন। এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে এক আলোচনায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এশিয়া অঞ্চলে চীনসহ যেসব অগণতান্ত্রিক শক্তি বৈশ্বিক নীতিনিয়মকে অমান্য করছে তাদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে কাজ করবে এবং শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীন আন্তর্জাতিক আদালতের রায় অমান্য করে দক্ষিণ চীন সাগরে কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা রাখছে। চীন বহুত্ববাদকে অনুসরণ করে না। নিজ দেশে ধর্মচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোরআন শরিফ বিতরণ নিষিদ্ধ করেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত সফরের সময় একত্রে কাজ করার জন্য ভারত-জাপান অ্যাক্ট ইস্ট ফোরাম গঠিত হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রধানও ভারত সফর করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীসহ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। উপরোক্ত দেশ ও জোটের সঙ্গেও বাংলাদেশের সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হলে বৈশ্বিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাপানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হবে। সহিংসতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরদার হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন-অগ্রগতির মহাসড়কে আছে। অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন সূচকে আজ অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নিম্নমধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থাৎ ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে আগামী নির্বাচন সুষুম, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে জনগণ আশা করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দ্রুতবর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে আজ স্বীকৃত। ভারতের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এ অঞ্চলে এমনকি এশিয়ায়ও স্থিতিশীলতা আনবে বলে আশা করা যায়। তাই ভারত ও বাংলাদেশের সহযোগিতা একটি আদর্শগত উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘পড়শী পেহলে, লেকিন সবছে পেহলে বাংলাদেশ’ (প্রতিবেশী আগে, তবে সবার আগে বাংলাদেশ)। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও বিগত সফরে বলেছিলেন ভারত বাংলাদেশের পাশাপাশি আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও ’৭১-কে স্মরণ করে সহযোগিতার পর্যায়কে সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রদূত।