বাংলামায়ের ভাষাকন্যারা

শান্তা মারিয়া : হাজার বছর ধরে বাংলার ভূখ-ে শাসকের রাজভাষা কখনো হয়েছে সংস্কৃত, কখনো ফার্সি, কখনো ইংরেজি, কখনো উর্দু। শাসকের আনুকূল্য পাওয়ার আশায় বদলে গেছে ক্ষমতার আশপাশে থাকা মানুষগুলোর ভাষাও। কিন্তু গৃহাঙ্গনের ভাষার কোনো বদল হয়নি। বাংলার নারী চিরদিনই বাংলাভাষাতেই সন্তানকে বলেছেন রূপকথা, উপকথা। ছড়া, ব্রতকথা, পাঁচালি, গীত বাঙালি নারীর মুখে বাংলাতেই উচ্চারিত হয়েছে। নারীই প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিয়েছে মাতৃভাষার অপরিসীম ঐশ্বর্য। তাই তো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা যখন প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষার জায়গায় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বিজাতীয় উর্দু ভাষা, সে সময় সব রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে পুরুষের পাশে এগিয়ে এসেছিলেন নারী। সে সময়কার রক্ষণশীল সমাজও বাংলার নারীকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারা অকুতোভয়ে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। মিছিল, সভা সমাবেশ সবকিছুতেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল স্মরণীয়।
১৯৪৮ সাল থেকেই ভাষা আন্দোলনে নারীরা অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ছিলেন। ঢাকার মুসলিম গার্লস স্কুল, কামরুননেসা বালিকা বিদ্যালয়, বাংলাবাজার স্কুল, ইডেন কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ভাষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে নারীর আত্মত্যাগের প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ মর্গ্যান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের অবদান এখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। মমতাজ বেগম ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জনমত গঠন করতে থাকেন। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃস্থানীয়। একুশেতে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি নারায়ণগঞ্জে প্রতিটি বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি জনবিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। ২৯ তারিখ সকালে পুলিশ মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে নেয়। বলা হয় স্কুলের তহবিল তসরুফের দায়ে তাকে আটক করা হয়েছে। জনতা আদালত প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তার জামিন হিসেবে ১০ হাজার টাকা দিলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয় না। জনতাকে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। ভাষার জন্য আন্দোলন করবেন না এমন বন্ডে সই দিলে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে এ কথা বলা হয়। কিন্তু তেজস্বী মমতাজ বেগম এ ধরনের অপমানজনক শর্তে রাজি হন না। তখন তার স্বামী তাকে তালাকনামা পাঠান। মমতাজ বেগমকে নিয়ে পুলিশ গাড়িতে করে ঢাকার দিকে রওনা হয় বিকালে। চাষাঢ়া স্টেশনের কাছে শত শত জনতা রাস্তা অবরোধ করে। পুলিশ-জনতার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ হতাহত ও গ্রেপ্তার হয়। ভাষা আন্দোলনের জন্য স্বামীর সংসার ত্যাগ করতে হয় এই বীর নারীকে।
একুশের দিন ছাত্রদের ঐতিহাসিক সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। তখন প্রথম যে মিছিলটি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে অকুতোভয়ে এগিয়ে যায় সেটি ছিল ছাত্রীদের মিছিল। পুলিশ সেই মেয়েদের ওপর প্রচ- লাঠিচার্জ করে। অনেকেই আহত হন। গ্রেপ্তারও হন। অনেক মেয়েকে পুলিশ ট্রাকে উঠিয়ে ঢাকার উপকণ্ঠ টঙ্গীতে ছেড়ে দিয়ে আসে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে যে নারীরা অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে নাদেরা বেগম, কামরুন নাহার লাইলি, ড. হালিমা খাতুন, মেডিকেল ছাত্রী হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, রওশন আরা, ইরা বকশি, বেনু ধর, শামসুন নাহার, ড. শাফিয়া খাতুন, সুফিয়া আহমেদ, জোবেদা খানম, শহরে বানু, লুৎফুন্নেসা খাতুন, রাবেয়া খাতুন, সোফিয়া খান, নুরুন্নাহার, কামরুননেসা, সুফিয়া আলি, বেবি, সুরাইয়া হাকিম, সুরাইয়া ডলি, নুরুন্নাহার কবির, কাজী খালেদা পুতুল, আমেনা বেগম, সারা তৈফুর, সুফিয়া ইব্রাহিম, নার্সিং ছাত্রী ঊষা বেপারি প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এই নারীরা ছাড়াও স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্রী ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় পূর্ববাংলাজুড়েই কাজ করেছেন নারীরা। মিছিল-সমাবেশ, পোস্টার লেখা, গোপন সংবাদ আদান-প্রদানসহ বিভিন্ন কাজ করেছেন সাহসী নারীরা যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন ছাত্রী। কমিউনিস্ট পার্টির নারী কর্মীরা এই স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করেন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন।
নাদেরা বেগম, সোফিয়া খানমের মতো কমিউনিস্ট পার্টির নারী কর্মীরা স্কুল-কলেজ থেকে নারী মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সমাবেশ স্থলে নিয়ে আসতেন। সে সময় সমাজ ছিল অনেক রক্ষণশীল। অথচ ভাষা আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে প্রথম এই রক্ষণশীলতার কাঁটাতার ছিঁড়ে এগিয়ে আসেন নারীরা। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে পরবর্তীকালে তারা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে সাহসের সঙ্গে অংশ নেন। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই।