বাংলার মুসলমানের আত্মপরিচয়-১৫

রুকনউদ্দিন বারবক শাহ: সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪) পিতা নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন; কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি পিতাকেও অতিক্রম করে যান। তিনি দক্ষিণে উড়িষ্যার মান্দারণ, উত্তরে কামরূপ এবং পশ্চিমে ত্রিহুতে সমরাভিযান চালিয়ে সফল হন। সে সকল রাজ্যের সামন্ত নৃপতিদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। ইসমাইল গাজি সুলতানের একজন বীর সেনানায়ক ছিলেন। তিনি মান্দারণ এবং কামরূপের যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। পূর্বসীমান্তে ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। ‘রাজমালা’ থেকে জানা যায়, রত্নফা নামে এক রাজপুত্র রাজ্যের অংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে গৌড়ে গিয়ে সুলতানের আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুলতান তাঁর সাহায্যার্থে সেনাপতি আমির খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনি প্রেরণ করেন। পিতা ডাঙ্গরফা ও ভ্রাতাদের পরাস্ত করে এবং ‘রত্নমাণিক্য’ উপাধি নিয়ে রত্নফা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। ত্রিপুরা গৌড়ের অধীন মিত্র রাজ্যে পরিণত হয়। এদিকে বারবক শাহ নিজ রাজ্যার অভ্যন্তরিণ বিদ্রোহ এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার কথা ভেবে আবিসিনিয়া থেকে ৮ হাজার হাবসি আমদানি করে সেনাবাহিনিকে শক্তিশালী রূপে গড়ে তোলেন। বারবক শাহের এরূপ পদক্ষেপে সাময়িক উপকার সাধিত হলেও দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে নি। অদূর ভবিষ্যতে শান্তি-শৃঙ্খলারক্ষা দূরের কথা, তারা দেশের অভ্যন্তরে নানা অরাজকতা ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণ হয়। এমন কি সিংহাসনের দিকে হাত বাড়িয়ে এক পর্যায়ে তা দখল করে নেয়।

বারবক শাহ উচ্চ শিক্ষিত, জ্ঞানানুরাগী ও মহৎ চরিত্রের অধকারী ছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে যোগ্য ব্যক্তিকে উচ্চ রাজপদে নিয়োগ দান করেন। আবার আরবি-ফারসি, বাংলা, সংস্কৃত নির্বিশেষে সকল ভাষার কবি-পণ্ডিতদের নানা উপাধি ও পুরস্কারে ভূষিত করেন। সেনাধ্যক্ষ ভান্দসী রায় ব্যতীত কেদার রায় (ত্রিহুতের নায়েব), বিশ্বাস রায় (পদস্থ কর্মচারী), শুভরাজ খান (উজির বা মন্ত্রী), অনন্তদাস (খাস বা ব্যক্তিগত চিকিৎসক), নারায়ণদাস (রাজবৈদ্য) রাজকার্যে জড়িত ছিলেন।

‘রামায়ণ’ রচয়িতা কবি কৃত্তিবাস এক গৌড়েশ্বরের রাজসভায় গিয়েছিলেন- তিনি সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ, মতান্তরে রুকনউদ্দিন বারবক শাহ ছিলেন। তিনি কাব্যে আত্মবিবরণী অংশে কয়েকজন হিন্দু সভাসদের নাম করেছেন। তাঁরা হলেন জগদানন্দ, ব্রাহ্মণ সুনন্দ, নারায়ণ, গন্ধর্ব রায়, কেদার রায়, শ্রীবৎস্য, মুকুন্দ প্রমুখ। রাজশাহির ফুলিয়ার পণ্ডিত কবি কৃত্তিবাস এসব পদস্থ ব্যক্তিকে পূর্ব থেকেই চিনতেন বলে প্রতিভাত হয়। তালিকায় কোন মুসলিম সভাসদের নাম না থাকার কারণ এরূপ হতে পারে যে তিনি তাঁদের চিনতেন না, অথবা সুলতানের মাঘ মাসের শীতে রোদ পোহাবার বিনোদনমূলক বিশেষ সভায় তাঁরা উপস্থিত ছিলেন না। কৃত্তিবাস ‘হাত চারি অন্তরে’ দাঁড়িয়ে সুলতানকে বাংলায় ‘সাত শ্লোক’ পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। সুলতান খুশি হয়ে তাঁকে ‘পুষ্পমালা’ ও ‘চন্দন চর্চিত পাটের পাছড়া’ দ্বারা পুরস্কৃত করেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি বাংলা ভাষা জানতেন ও বুঝতেন। তিনি ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যের কবি মালাধর বসুকে ‘গুণরাজ খান’ এবং সংস্কৃত কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে ‘রায়মুকুট’, ‘পণ্ডিতসার্বভৌম’ প্রভৃতি উপাধি দিয়ে সম্মানিত এবং মূল্যবান রত্ন ও ঘোড়া উপহার দিয়ে পুরস্কৃত করেন।

ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, সুলতান বারবক শাহ আমির জৈনুদ্দিন হারাওয়ি নামে একজন ফারসি ভাষার কবিকে ‘মালেকুশ শোয়ারা’ (রাজকবি) উপাধিতে ভূষিত করেন। সুলতান ‘ফরহাঙ্গ-ই-ইব্রাহিমি’ ওরফে ‘শরফনামা’ নামক শব্দকোষ গ্রন্থের লেখক ইব্রাহিম কাইয়ুম ফারুকিকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। ফারুকি তাঁর গ্রন্থে জৈনুদ্দিন ব্যতীত আরও কয়েকজন ফারসি কবি-পণ্ডিতের নাম করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন – আমির শাহাবুদ্দিন হাকিম কিরমানি, মনসুর শিরাজি, মালিক ইউসুফ বিন হামিদ, সৈয়দ জালাল, সৈয়দ মুহম্মদ রুকন, সৈয়দ হাসান প্রমুখ। আমির শাহাবুদ্দিন হাকিম কিরমানি চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ‘ফরহঙ্গ-ই-আমির শাহাবুদ্দিন হাকিম কিরমানি’ নামে একখানি শব্দকোষ রচনা করেন। ফারুকি তাঁকে ‘ইফতেখারুল হোকামা’ (চিকিৎসকদের গর্ব) বলেছেন। তাঁর স্থানবাচক উপনাম ‘কিরমান’ থেকে অনুমিত হয়, তিনি ইরানের কিরমান শহরের অধিবাসী ছিলেন। অনুরূপভাবে মনসুর শিরাজি ইরানের শিরাজ নগরের অধিবাসী ছিলেন। ‘আমির’ উপাধি থেকে বোঝা যায়, জৈনুদ্দিন ও শাহাবুদ্দিন উভয়ে সুলতানের সভাসদ ছিলেন। ‘সৈয়দ’ পরিবারের তিন সদস্যের অবদান সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। তবে বঙ্গে তাঁদের আগমন ও বসবাস শুরু হয়েছে, তা বোঝা যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, মুসলিম রাজত্বের শুরু থেকেই আরবি ধর্মের ভাষা এবং ফারসি রাজভাষা রূপে গৃহীত হয় এবং মক্তব-মাদাসায় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। মধ্যযুগব্যাপী দেশের অফিস-আদালতে সরকারি নথিপত্র, মকতুবত, কবিতা, শব্দকোষ, অনুবাদ, শিলালিপি, মুদ্রালিপি ইত্যাদি ঐ দুই ভাষায় রচিত হয়েছে। দিল্লিতে আমির খসরুর মতো বিখ্যাত কবির এবং বহু সংখ্যক ইতিহাসগ্রন্থ-প্রণেতার আবির্ভাব হয়েছিল, কিন্ত লখনৌতি-গৌড়, কিংবা ঢাকা-সোনারগাওয়ে অনুরূপ মানের কোন কবি-ঐতিহাসিকের আবির্ভাব হয় নি। অর্থাৎ আরবি-ফারসি ভাষার প্রতিভাবান কোন কবি-সাহিত্যিক-পণ্ডিতের জন্ম হয় নি। এর কারণ কি হতে পারে? এক ইরান ছাড়া যেসব দেশের অধিবাসী বঙ্গদেশে এসেছিলেন, তাঁদের মাতৃভাষা ফারসি ছিল না; অনুরূপ আরব ও কয়েকটি দেশ থেকে আগত অভিবাসীর মাতৃভাষা আরবি ছিল। খালজি-মামলুক-বলবন বংশের শাসকদের ভাষা ছিল তুর্কি; এমন কি, মুঘলদের মাতৃভাষা ছিল তুর্কি। আফগানদের মাতৃভাষা ছিল পস্তু। এদেশে আরবি-ফারসি ছিল শিক্ষার ভাষা। লোকে ধর্ম-কর্ম করার জন্য আরবি এবং রাজকার্য পরিচালনার জন্য ফারসি শিক্ষালাভ করতো। মাতৃভাষা ব্যতিরেকে অন্য ভাষায় জ্ঞানচর্চা সম্ভব হলেও সৃজনশীল রচনা সম্ভব হয় না, এটা পরীক্ষিত সত্য। একই কারণে ইংরেজ আমলে বাঙালি রচিত ইংরেজি সাহিত্য গড়ে ওঠে নি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত চেষ্টা করেও সফল হন নি।

মুসলিম শাসক ও সহযোগীশ্রেণি প্রথম থেকে শেষাবধি সিংহাসন দখল ও রক্ষা, রাজ্যবিস্তার ও সম্পদাহরণ, বিদ্রোহদমন, বহিঃশত্রুর আক্রমণরোধ ইত্যাদি ব্যাপারে যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে ব্যস্তসময় অতিবাহিত করেছেন। তাঁরা শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময়-সুযোগ কমই পেয়েছেন। বঙ্গদেশে তাঁদের সৃষ্টিমূলক প্রধান গৌরব মসজিদ, মাদ্রাসা, দুর্গ, স্মৃতিসৌধ, নগ্র-ফটক ইত্যাদি নির্মাণে স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে সীমিত রয়েছে, যার প্রেরণা তাঁরা পূর্বপুরুষের নিকট থেকে পেয়েছিলেন। মুসলিমবিশ্বের শাসকগণ বহু অর্থব্যয়ে নির্মিত, কারুকার্যখচিত ও দৃষ্টিনন্দিত এ ধরনের ইমারতকে ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক বলে মনে করতেন। গৌড়ের স্থাপত্যগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে কতক মসজিদ ও দুর্গ আজও টিকে আছে, যা তাঁদের কীর্তিকলাপের গৌরব ও মহিমার স্বাক্ষর বহন করে।
ইসমাইল গাজি: বারবক শাহের সেনাপতি স্বীয় শৌর্যবীর্য ও চরিত্রগুণে বাংলার ইতিহাসে কিংবদন্তী পুরুষে পরিণত হয়েছেন। পীর-যোদ্ধা হিসাবে তাঁর খ্যাতি লোকস্মৃতিতে আজও অম্লান হয়ে আছে। ইসমাইল গাজি (মৃত ১৪৭৪) মক্কার অভিজাত কোরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভাগ্যের অন্বেষণে ইরান ও ভারত হয়ে বাংলার রাজধানী লখনৌতিতে আগমন করেন। তিনি সে সময় বন্যা থেকে রাজধানী-শহর রক্ষার জন্য সুলতান বারবক শাহকে বাঁধ নির্মাণের পরামর্শ ও পরিকল্পনা প্রদান করে তাঁর প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। সুলতান তাঁকে বহু সম্মানে ভূষিত করেন। পরপর দুটি যুদ্ধে সেনাপতির নেতৃত্ব দিয়ে জয়ী হলে তাঁর আধিপত্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পরিণামে তা হিতে বিপরীত হয়। ঘোড়াঘাটের সেনাধ্যক্ষ ভান্দসী রায় ঈর্ষাবশত সুলতানকে ইসমাইলের বিরুদ্ধে ভুল পরামর্শ দিয়ে তাঁকে শত্রুভাবাপন্ন করে তোলেন। ইসমাইল কামরূপের রাজার সাথে মিত্রতা স্থাপন ও আঁতাত করে বিদ্রোহ করার ষড়যন্ত্র করছেন- ভান্দসী রায়ের এরূপ অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে সুলতান তাঁর মৃত্যু দণ্ডাদেশ দেন। ইসমাইল গাজি রাজসেনার সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হলে তাঁর মস্তক ছিন্ন করে সুলতানের নিকট প্রেরণ করা হয়। তাঁর দেহ মান্দারণে এবং মস্তক কাঁটাদুয়ারে সমাধিস্থ করা হয়। তিনি অন্যায় মৃত্যুর শিকার হলেও ভক্তের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন। তাঁর উভয় সমাধি ও দরগাহ এ যুগে ভক্তের কাছে তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। তাঁর নিকটজন হিসাবে মুহম্মদ শাহ ও শেখ মুহম্মদ দুই ব্যক্তির নাম জানা যায়। প্রথম জন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ও সহযোদ্ধা ছিলেন, দ্বিতীয় জন ছিল বিশ্বস্ত ভৃত্য।

এবার স্থাপনার শিলালিপি সম্বন্ধে আলোকপাত করা যায়। তাঁর রাজত্বকালে রচিত এ যাবত মোট ১৮টি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলির স্থান, কাল, নির্মাতার নাম একটি তালিকায় নিম্নে প্রদান করা হলোঃ
স্থান স্থাপনা নির্মাতা কাল
১. ত্রিবেণী, হুগলি মসজিদ উলুঘ আজমল খান ও ১ মহর্‌রম ৮৬০ হি/১১ ডিসেম্বর ১৪৫৫
খান ইকরার খান
২. বারা, বীরভূম ঐ খাকান উলুঘ আজল্‌কা খান ১ জামাদি আল-আহল ৮৬৪/২৩ ফেব্রুয়ারি ১৪৬০
৩. চিহিল গাজির মাজার, মসজিদ উলুঘ ইকরার খান ও খাকান ১৬ সফর ৮৬৫/১ ডিসেম্বর ১৪৬০
দিনাজপুর উলুঘ নুসরাত খান
৪. মহিসন্তোস, নওগাঁও, ঐ উলুঘ ইকরার খান ও ৮৬৫ হি./ ১৪৬০-৬১ খ্রি.
দিনাজপুর আশরাফ খান
৫. গৌড়, মালদহ ঐ খুরশিদ খান ১০ জামাদি আল-আহল ৮৬৫/২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৬১
৬. হাটখোলা, সিলেট ঐ ঐ ৫ সফর ৮৬৮/১৯ অক্টোবর ১৪৬৩
৭. দেওতলা, মালদহ জামি মসজিদ খান আল-আজম খাকান ৫ রজব ৮৬৮/১৯ মার্চ ১৪৬৪
আল-আজম
৮. পেরিল, মানিকগঞ্জ মসজিদ মজলিশ খুরশিদ ৫ শাওয়াল ৮৬৯/৩১ মে ১৪৬৫
৯. দেওতলা, মালদহ ঐ উলুঘ মুরাবিত খান (?) …
১০. ফিরোজপুর, গৌড় প্রবেশদ্বার খান জাহান ১ জ্বিলহজ্ব ৮৭০/১৯ জুলাই ১৪৬৬
১১. গোরাই, কিশোরগঞ্জ মসজিদ মজলিশ আল-আজম ২৯ রমজা ৮৭১/৪ মে ১৪৬৭
১২. গৌড়, মালদহ মধ্য প্রবেশদ্বার … ৮৭১ হি./১৪৬৬-৬৭ খ্রি.
১৩. বশিরহাট, ২৪ পরগনা সালিক মসজিদ মজলিশ-ই-আজম ৮৭১ হি./ ১৪৬৬
১৪. মহিসন্তোষ, দিনাজপুরমসজিদ খান আল-আজম উলুঘ খান ৮৭৬ হি./১৪৭১-৭২ খ্রি.
১৫. মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালি ঐ খান মুয়াজ্জম আজিয়াল খান ৮৭৬ হি./১৪৭১-৭২ খ্রি.
১৬. হাটহাজারি, চট্টগ্রাম ঐ রাস্তি খান ২৫ রমজান ৮৭৮/১৭ ফেব্রুয়ারি ১৪৭৪
১৭. কালনা, বর্ধমান ঐ দৌলত খান …
১৮. গাজিপুর, উত্তর প্রদেশ… উলুঘ ইকরার খান …
শিলালিপিতে সুলতানের উপাধিসহ নাম ও স্তূতিসূচক গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। অধিকাংশ শিলালিপিতে পিতার নামসহ তাঁর নাম ‘সুলতান রুকন আল-দুনিয়া ওয়াল-দ্বিন আবুল মুজাফ্‌ফর বারবক শাহ’ লেখা হয়েছে; দু-একটিতে ‘আবুল মুজাফ্‌ফর’-এর স্থলে ‘আবুল মুজাহিদ’ বলা হয়েছে। গৌড়ের ‘চাঁদ দরোয়াজা’র শিলালিপিটি (১৪৬৬) কবিতার আঙ্গিকে ১৭টি পয়ার বা জোড় চরেণ রচিত। এর ৬ষ্ঠ থেকে ১২তম পর্যন্ত মোট ৭টি জোড় চরণে সুলতানের উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল করিম এর ইংরেজি তরজমা করেছেন এভাবেঃ
৬. The Sultan, the protector of the Universe, the piller of religion, our Sultan Barbak Shah, the just and of high understanding.
৭. Son of the most renowned Sayyid in the cities, Sultan Mahmud Shah, model of justice.
৮. Can the princes of the two Iraq’s, and of Syria and of Yamen, be considered equal to Barbak Shah in generosity?
৯. Truly, there is no one in the realms of Allah who equals him in generosity and liberality; he stands alone in his time.
১০. His abode resembles paradise which pours and attracts wealth and dispels dissipation.
১১. (Behold) a water-course, flowing under the palace, resembling salsabil (a fountain in Paradise), whose streams afford consolation to the afflicted faqirs (indigent).
১২. Within the abode is soul refreshing rest, delightful as the fragrance of the sweet basil; binding those who love it like a cord. [Abdul Karim, p. 168].
শিলালিপির কাব্যিক ভাষায় সুলতানের উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে। স্তূতি-স্তাবকতার অন্তরালেও সুলতানের ন্যায়নীতি (justice), উদারতা (liberality) ও মহত্ত্বের (generosity) দিকটিও ফুটে উঠেছে, যা ইতিহাসসিদ্ধ ও প্রমাণিত সত্য ছিল। ত্রিবেণীর মসজিদের শিলালিপিতে (১৪৫৫) তাঁকে “আল-আদেল আল-বাজেল আল-ফাজেল আল-কামেল” (the just, the liberal, the learned and the scholar) বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি ন্যায়বিচারক, উদার-প্রকৃতি, শিক্ষিত ও জ্ঞানী সুলতান ছিলেন।
শিলালিপিতে প্রশাসন ও অন্য ক্ষেত্রে যেসব ব্যক্তির নাম-পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নে তার বিবরণ দেওয়া হলোঃ
উলুঘ আজমল খান: ত্রিবেণীর শিলালিপিতে (১৪৫৫) মসজিদের নির্মাতা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার ইংরেজি তরজমা হলো- ‘‘This mosque was erected by the great Khan and the great Khaqan, Ulugh Ajmal Khan, may Allah keep him safe in both the worlds, the Sar-i-khail of the great Khan Iqrar Khan, extraordinary superintendent of the Royal robes, commander and minister of the ÔArsa Sajla Mankhabad, and the town of Laobala may his greatness last forever;’’
এখানে দু’জন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির নাম রয়েছে- উলুঘ আজমল খান এবং ইকরার খান; প্রথম জন দ্বিতীয় জনের অধীনস্থ কর্মচারী ছিলেন। মসজিদ-সংলগ্ন শিলালিপিটি উলুঘ আজমল খান প্রণয়ন করেন। তাঁর নামের আগে উপাধি হিসাবে ‘খান আল-আজম’ (great khan) ও ‘খাকান আল-আজম’ (great khaqan) শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে। সেকালে মহৎ ব্যক্তিদের ‘খান’ (nobles) বলা হতো। তিনি ‘খান আল-আজম’ ইকরার খানের অধীনে ‘সর-ই-খইল’ ছিলেন, যার পদাতিক সেনাধিনায়ক (commander of the army) ও অশ্বারোহী সেনাপ্রধান (chief of the cavalry) উভয় প্রকার অর্থ পাওয়া যায়।
ইকরার খান
ত্রিবেণীর একই শিলালিপিতে বর্ণিত ইকরার খান ছিলেন রাজকীয় পোশাকের সুদক্ষ তত্ত্বাবধায়ক (commander of the royal robes) এবং অরসহ্‌ সাজলা মন্‌খাবাদ ও শহর লাওবলা নামক স্থানের লস্কর (commander) ও উজির (minister)। সুলতান আমলে অরসহ প্রশাসনিক একক অঞ্চল, যা মুঘল আমলে ‘সরকারে’র সমতুল্য ছিল। শিলালিপি ও মুদ্রালিপিতে বিভিন্ন অর্থে ‘উজির’ পদবির ব্যবহার পাওয়া যায়। ইকলিম, অরসহ্‌ এবং শহর ত্রিবিধ অঞ্চলের অধিকর্তাকে উজির বলা হয়েছে। আবার ‘সর-ই-লস্কর’, ‘কোতোয়াল’ এবং ‘শরাবদার-ই-গইর-ই-মুহল্লি’ প্রভৃতি পদবিধারী ব্যক্তিকেও উজির বলা হয়েছে। অর্থাৎ উজির পদবি ধারন করেন এমন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি সরকারি ভিন্ন ভিন্ন চাকুরিতে নিয়োগ লাভ করতেন। ত্রিবেণীর উক্ত শিলালিপি ছাড়াও দিনাজপুরের চিহিল গাজি (১৪৬০) ও নওগাঁওয়ের মাহিসন্তোষ (১৪৬১) এবং উত্তর প্রদেশের গাজিপুর (তারিখ লুপ্ত)- এই তিনটি শিলালিপিতেও ইকরার খানের নাম-উপাধি উৎকলিত হয়েছে। ইকরার খান মাহিসন্তোষের মসজিদটি আশরফ খানের মাধ্যম অথবা সহযোগিতায় নির্মাণ করেন। সম্ভবত আশরফ খান তাঁর উর্ধতন কর্মকর্তা ছিলেন। বিভিন্ন কর্মস্থলে একাধিক মসজিদ নির্মাণ করে তিনি একদিকে যেমন ধর্মীয় নিষ্ঠার, অপরদিকে তেমনি প্রশাসনিক যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।

নুসরাত খান: খান আজম ওয়া খাকান মুয়াজ্জম উলুঘ নুসরত খান ইকরার খানের নির্দেশে দিনাজপুরের চিহিল গাজির মসজিদ ও সমাধি নির্মাণ করেন। তিনি জোর-বারোর মহলের ‘জঙ্গদার’ ও ‘শিকদার’ ছিলেন।। ‘শিক’ হলো প্রশাসনিক একক অঞ্চল; এর প্রধানকে শিকদার বলা হয়। নুসরত খান প্রশাসন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে প্রথম এরূপ আঞ্চলিক নাম ও পদবি চালু হয়।
আজলকা খান: বীরভূমের বারার মসজিদের (১৪৬০) নির্মাতা ছিলেন খাকান আজলকা খান; তাঁকে সম্মানসূচক ‘খান আল-আজম, খান আল-মুয়াজ্জম’ বলা হয়েছে। তাঁর পিতার নাম তারবিয়াত খান, যিনি ঢাকা শরের প্রধান গুমশ্তাহ্‌ (সর-ই-গুমশ্তাহ্‌) ছিলেন। গুমশ্তাহ্‌ রাজস্ব বিভাগের একজন পদস্থ কর্মচারি, যিনি প্রজার নিকট থেকে খাজনা আদায় করে রাজকোষাগারে জমা দিতেন। ব্রিটিশ আমলেও জমিদারদের কাচারিতে গুমশ্তাহ্‌ ছিলেন। গুমশ্তাহ্‌র উপরতলার পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন ‘আমিল’। শিলালিপিতে আরও বলা হয়েছে যে, আজলকা খান জনৈক ইমামের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন, যিনি ‘মৌলানা’ বা শাস্ত্রজ্ঞানী ছিলেন। তিনি ‘কাজি’ নামে অধিক জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর পিতা কাজি আহমদ ছিলেন পান্ডুয়ার শেখ আলাউল হকের পুত্র। ‘আলাই পরিবারের সন্তান হিসাবে ঢাকায় তাঁর সম্মনার্থে মসজিদ নির্মাণ যথার্থ ছিল।

খুরশিদ খান: গৌড়ের মসজিদ (১৪৬১) এবং সিলেটের হাটখোলার মসজিদের (১৪৬৩) নির্মাতা ছিলেন খান আল-আজম খুরশিদ খান। তাঁর পদবি ছিল ‘সর-ই-নওবত-ই-গইর মহল্লিয়ান’ (commander of the extraordinary guards)। মানিকগঞ্জের পেরিল মসজিদের (১৪৬৫) নির্মাতার নাম ছিল মজলিশ খুরশিদ; তাঁরও একই পদবি ছিল। এর থেকে অনুমিত হয় যে, খুরশিদ খান ও মজলিশ খুরশিদ একই ব্যক্তি ছিলেন।

উলুঘ মুরাবিত খান: শেখ জালাল তাব্রিজির স্মৃতিজড়িত দেওতলার ‘জামি মসজিদের নির্মাতা ছিলেন ‘খান আল-আজম ওয়া খাকান আল মুয়াজ্জম’। তিনি সুলতান বারবক শাহের উপদেষ্টা ছিলেন। এটি কোন ব্যক্তির নাম নয়, তাঁর উপাধি। দেওতলার অপর একটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে সুলতানের নাম আছে, কিন্তু খণ্ডিত হওয়ায় নির্মাতার নাম ও নির্মাণের তারিখ জানা যায় না। ব্লকম্যান তাঁর নিজস্ব পাঠে এর নির্মাতা হিসাবে ‘উলুঘ মুরাবিত খানের নাম করেছেন। অধ্যাপক আবদুল করিম তাঁর সমর্থনে উলুঘ মুরাবিত খানকে উক্ত জামি মসজিদের নির্মাতা ও পদবির অধিকারী বলে মনে করেন।

খান জাহান: গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত ফিরোজপুরের একটি প্রবেশদ্বারের শিলালিপিতে (১৪৬৬) খান জাহানের নাম লিপিকৃত হয়েছে। পণ্ডিতগণ মনে করেন, এটি ব্যক্তির নামও হতে, আবার উপাধিও হতে পারে। খান-ই-জাহান নামে একজন খোজা (নপুংসক) হাবশি বারবক শাহের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি পরবর্তী সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহেরও উজির ছিলেন। একই খান জাহান প্রভাবশালী হয়ে উঠে ৮৯১ হিজরিতে বিদ্রোহ করেন এবং ‘সুলতান শাহজাদা’ নাম ধারণ করে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন।

মজলিশ আল-আজম: বসিরহাটের সালিক মসজিদের শিলালিপিতে (১৪৬৬) সুলতানের নাম নেই, কেবল তারিখ আছে; নির্মাতার নাম নেই, কেবল উপাধি ‘মজলিশ খান’ ও ‘মজলিশ-ই-আজম’ উৎকীর্ণ হয়েছে। তাঁকে মহান ও পরোপকারী মজলিশ বলা হয়েছে। সুদূর দক্ষিণের একটি অনুন্নত স্থানে সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা উপাধি দ্বারাই অধিক পরিচিত ছিলেন, হয়তো সে কারণে প্রকৃত নামের উল্লেখ নেই।

অজিয়াল খান: বাকেরগঞ্জ বর্তমানে পটুয়াখালির মির্জাগঞ্জের মসজিদের শিলালিপিতে (১৪৭১-৭২) নির্মাতা অজিয়াল খানের নাম খোদিত হয়েছে; তাঁর উপাধি ছিল ‘খান মুয়াজ্জম’। পিতার নাম মুন্‌ঝ মালাকু মযহারউদ্দিন। পটুয়াখালি সর্বদক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপাঞ্চল; সেখানে মসজিদ নির্মাণ ইসলাম বিস্তারের প্রথম যুগকে সূচিত করে।
রাস্তি খান: হাটহাজারির জোবরা গ্রামের মসজিদের নির্মাতা ছিলেন রাস্তি খান। তিনি ইতিহাস-খ্যাত ব্যক্তি ছিলেন; তাঁর স্মরণেই মসজিদটিকে ‘রাস্তি খান মসজিদ’ বলা হয়। এটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। শিলালিপিতে (১৪৭৪) তাঁকে ‘মজলিশ আলা’ (শাসনকর্তা) বলা হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, দরবেশ মাহি সওয়ার তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সেনাধ্যক্ষ ও শাসনকর্তা পরাগল খান তাঁর পুত্র ছিলেন। পরাগল খানের পুত্র ছুটি খান পিতার পদ অলংকৃত করেন। রাস্তি খান দীর্ঘকাল থেকে বংশপরম্পরায় চট্টগ্রামবাসী ছিলেন। চট্টগ্রামে তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত জনহিতকর বহু কীর্তি রয়েছে।

দৌলত খান: বর্ধমানের কালনার মসজিদ ও শিলালিপির প্রণেতা ছিলেন দৌলত খান। তাঁর পিতার নাম হুসাইন খান। সুলতান ফতেহ শাহের আমলে গৌড়ের মহদিপুরের ২টি মসজিদের নির্মাতাও ছিলেন দৌলত খান। এখানে তাঁর পিতার নাম নেই, কিন্তু পদবি ও উপাধির উল্লেখ আছে। উভয় শিলালিপিতে তাঁর নামের পূর্বে ‘খান আল-আজম’ ও ‘খাকান আল-মুয়াজ্জম’ উপাধি এবং নামের পরে ‘ওয়াজির-ই লস্কর’ (সেনাবিভাগের মন্ত্রি) লেখা হয়েছে। মহদিপুরের তৃতীয় শিলালিপিতে তাঁর নাম-পদবি ছিল এরূপঃ ‘the great Khan and the exalted Khaqan, who trust on the authority of the beneficent Lord, the exalted Khan Daulat Khan, the Wayir in charge of the army (commander-in-chief of the army)’. [A. Karim, Ibid., p. 209]। [চলবে]
ভার্জিনিয়া।