বাংলা রোড ১৯৭১

এইচ বি রিতা

অপারেশন সার্চলাইট স্ফুলিঙ্গ সে রাতে
রক্তাক্ত লাশের সারি ছিল গলিতে গলিতে।
ক্ষুব্ধ জনতার ক্ষুব্ধ প্রলয় পুঞ্জিভুত মনে
বাংলা রোডে নিরস্ত্র বাঙালি শোকপ্রভাতে।

নরপতির নির্যাতন অচিন্তপূর্ব সে আঘাতে
বসতহীন শোকার্ত মানুষ গ্রাম ছাড়ে শূন্য হাতে
ঘর পুড়ে, লাশ জড়ো হয় ভুখ- লড়াইয়ে
বাঙালি রুদ্ধশ্বাসে জেগে উঠে নতুন প্রভাতে।

নৌকা যোগে বুট পায়ে খান সেনা ঢুকে গ্রামে
রাজাকার পিক ফেলে পথের দোসর নামে
খান সেনা হাঁক ছাড়ে ”হেই ইধার আও, ইস তারাফ”
ডাক শুনে বাঙালির মেরুদ-ে শীতল স্রোত নামে।

আসন্ন আতঙ্কে দুর্বল প্রাণ সৃষ্টিকর্তাকে স্মরে
বেয়নেটের আঘাতে রূক্ষ্ম চামড়ায় জ্বালা ধরে
খান সেনা হাঁকে, ‘‘জেব মে কেয়া হেয় নিকাল”
এরপর তড়িৎ গুলিতে যায় কত শত মগজ উড়ে।

মায়ের কোলে নিহত শিশু খান সেনাদের গুলিতে
নির্বাক পিতা দেখে শোষণের পুরুষাঙ্গ কন্যার যোনিতে
হাজারো জননী হাটে পাগল দিশেহারা নয়নসলিলে
বাংলা রোডে লাশের সারি ভেসে যায় গাঙ্গেয় প্রপাতে।

আধমরা নিস্পৃহ শরণার্থীর চলমান মিছিলের ঢল
আহার নেই, ঘুম নেই, ক্লান্তিতে অসাড়; না আছে বল
ঘরহীন স্বজনহীন মগজের কোষে গাঁথা বোমারু বিমান
ভাবলেশহীন চোখে আশ্রয়ের খোঁজে শত মানুষের দল।

কৃষ্ণনগর হাসপাতালে গাদাগাদি মৃত্যুর চাদরে
কিছু মানুষ জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছে পড়ে
জ্বর-ব্যাধি, কলেরা, গনেরিয়ায় নিরন্তন লড়াই
কতক শকুন অপেক্ষায়; কখন কোলের শিশুটি মরে।

রেশনের চালে এক বেলা, শেষটুকু কাটে অনাহারে
ক্ষুধায় কাঁদে কঙ্কালসার শিশু, জননীর স্তনযুগল ছিঁড়ে
লক্ষ্য কোটি মানুষের উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি স্থবির
বাংলা রোডে মৃত্যুর ছায়া, আহা! কত শত মানুষ মরে।

লক্ষ মানুষ ভাতের কষ্টে মরে, লক্ষ মরে শোকে
স্বামীহারা নববধূ বলো তবে নালিশ করে কাকে
জননী কাতর পুত্র শোকে, ভাই তার বোনের সম্ভ্রমে
শত শত মানুষ আকাশ ডেকে; ইতিহাস সাক্ষী রাখে।

শত শত চোখ ঘুম খোঁজে, নির্ঘুম কালোরাত্রি শেষে
শত শত চোখ নির্লিপ্ততায়, তখনো হিসেব কষে
কত শত নারী যারজ বীজ, বাংলা রোডে পুঁতে
একাত্তুরের গণহত্যা; অবিস্মরণীয় রয় ইতিহাসে।