বাঙালির করোনা বিলাস

রশীদ জামীল: শুরুর দিকে বাংলাদেশের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো অঞ্চলে করোনা আছে শুনলে বিশ্ববাসী যখন অন্য রাস্তা ধরে, বাংলাদেশের মানুষ তখন করোনা দেখতে যায়। প্রবাসীকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। কোয়ারেন্টাইন বস্তুটা কেমন, তা দেখার জন্য শত শত মানুষ গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে। করোনা নিয়ে তর্কাতর্কি করে আহত ১০, নিহত ১-এমন খবরও পত্রিকায় বেরোয়। বিশ্ব যখন করোনার ধাক্কা সামলে উঠে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, বাংলাদেশ তখন করোনার কাছে জিম্মি। এর কারণ কি কেয়ারলেসনেস, নাকি ডোন্ট কেয়ার মেন্টালিটি-আমরা জানি না। হয়তো দুটোই। পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে-কেউ জানে না।
বাংলাদেশ সেই একই ভুল করল-যে ভুলটি করেছিল ইউরোপ-আমেরিকা। প্রথম প্রথম করোনাকে পাত্তাই দিতে রাজি হলো না। রাজি যখন হলো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। করোনা নিয়ে দেশবাসীকে আপডেট দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সাবরিনা ফ্লোরা। এই ভদ্রমহিলা প্রতিদিন একটি করে নতুন শাড়ি পরে ক্যামেরার সামনে উপস্থিত হচ্ছিলেন। অবশ্য তিনি তথ্য দিতেন, নাকি তথ্য গোপন করতেন, সেটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই কানাঘুষা চলত।
করোনাকে পেন্ডামিক ঘোষণা করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গোটা বিশ্ব হিমশিম খেতে লাগল করোনায়। তথ্যপ্রযুক্তির শীর্ষে থাকা দেশগুলো কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। সুতরাং বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ মানে কোনোভাবেই সরকারের ব্যর্থতা ছিল না। তাহলে হিডেন হিডেন খেলার তো দরকার ছিল না। সরকারের তরফ থেকে করোনা আক্রান্ত এবং হতাহতের সঠিক তথ্য নিয়ে জাতির সাথে একধরনের লুকোচুরি খেলা চলতে থাকল। অথচ যথাসময়ে সঠিক তথ্য প্রকাশ করলে সরকারের কোনো ক্ষতি ছিল না। মানুষ সতর্ক হতো।
দেখা গেল, প্রতিদিনই স্বজনের মৃত্যুর সংবাদ শেয়ার করছেন অনেকেই। কারো দাদা, কারো মামা, কারো ফুফু। গ্রামের মুরব্বি চাচা অথবা পাশের বাড়ির কেউ। কেউ মরছেন হার্ট অ্যাটাকে, কেউ কিডনি রোগে, কেউ স্ট্রোক করে। বেশির ভাগই বার্ধক্যজনিত কারণে। কিন্তু করোনায় কেউ মারা যাচ্ছেন না। আর গেলেও মৃত্যু-পরবর্তী টেস্টে জানা যাচ্ছে, তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন না।
করোনার আঘাতে ইউরোপ-আমেরিকা-আফ্রিকার দেশগুলো যখন পুরোই বিধ্বস্ত, বাংলাদেশ তখনো নির্ভার ছিল! সরকারের দায়িত্বশীলদের মুখ ছিল লাগামছাড়া। তাদের আবোল-তাবোল বকওয়াস শুনে দেশের মানুষ সেই পুরোনো কথাটিই নতুন করে ভাবতে লাগল। কথাটি ছিল, বাংলাদেশে সব সময় পাগলদেরই মন্ত্রী বানানো হয়, নাকি মন্ত্রী হওয়ার পর পাগল হয়!
করোনা তখনো বাংলাদেশে হানা দেয়নি-এরই মাঝে সরকারের জবরদস্ত এক নেতা জানালেন, ‘শেখ হাসিনার মতো নেত্রী পেয়েছিলাম বলে করোনার বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি।’ খেলা শুরুর আগেই জয়ের কথা শুনে আমরা অবশ্য অবাক হইনি। নির্বাচনের আগেই জয়ী হওয়া জায়েজ হলে খেলা শুরুর আগে জয়ী হওয়াই যায়।
তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একজন মানুষও কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়নি-এরই মাঝে সরকারের আরেক নেতা বললেন, ‘আমাদের নেত্রী করোনা সমস্যা ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছেন।’ একটি বাচ্চার জন্মের আগেই জানাজা হয় কেমন করে; এই প্রশ্নটি নেতাজিকে কেউ করেছিলেন কি না, আমরা জানি না!
সরকার+আওয়ামী লীগের জাঁদরেল আরেক নেতা জাতিকে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জানালেন সেটা হলো, ‘আওয়ামী লীগ করোনার চেয়েও শক্তিশালী!’ কথাটি বলে তিনি করোনাকে আন্ডার এস্টেমেট করলেন, নাকি নিজ দল আওয়ামী লীগকে একটি ভয়ংকর দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেন-তিনিই জানেন। বিশ্ববাসী জানে করোনা একটি ভয়ংকর জিনিস।
সরকারের এক দায়িত্বশীল জানালেন, ‘করোনা সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে মারাত্মক কিছু নয়। সুতরাং এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই!’ এত এক্সপার্ট একজন মানুষ, যিনি কোনো সিমটম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই রেজাল্ট বলে দিতে পারলেন, তাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দরকার ছিল। অন্তত কেরানি পদে হলেও।
একজন তো ছাড়িয়ে গেলেন সবাইকে। কথাটি কোট করতেও ভয় করছে। তিনি বলে বসলেন, ‘করোনা তো কি, স্বয়ং আল্লাহ নেমে এলেও বাংলাদেশে কিছুই করতে পারবেন না!’ মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তিনি একটি মুসলমান নাম ক্যারি করেন।
বাংলাদেশে করোনা তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করল এপ্রিলের শুরুর দিকে। বাড়তে লাগল কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর সংখ্যা। মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হতে শুরু করল একের পর এক মানুষের নাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার কাছে মনে হলো তার নেতারা ঠিক বলেননি। তিনি বা তার দল করোনা থেকে মোটেও শক্তিশালী নয়। আত্মরক্ষার উপায় খুঁজে পেরেশান হতে লাগলেন; ঠিক যেমনটি হয়েছিল রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড।
অনেক লম্বা একটা সময় পেয়েছিল বাংলাদেশ। সময়টাকে কাজে লাগাতে পারলে পৃথিবীতে বাংলাদেশ হতে পারত একমাত্র দেশ, যে দেশটি মুক্ত থাকতে পারত করোনার আক্রমণ থেকে। তিনটি কারণে সেটি পারেনি। অথবা তিনটি দলের অবিবেচনাপ্রসূত কথাবার্তার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।
নাম্বার এক
সরকারের অব্যবস্থাপনা অথবা ধীরে চলো নীতি। প্রায় তিন মাস সময় ছিল বাংলাদেশ সরকারের হাতে। আত্মরক্ষার উদ্যোগ নিতে পারত। শুধু একটি কাজ করলেই দেশ সুরক্ষিত থাকত। ভাইরাসটি আশপাশের দেশেও ছড়াচ্ছে; এই নিউজ শোনার সাথে সাথে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটগুলো বন্ধ করে দিতে পারত। ন্যূনতম যে কাজটি করতে পারলে বেঁচে যেত দেশ, সেটি হলো দেশের ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টগুলোকে ফুল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বিদেশ থেকে যত লোক বাংলাদেশে ইন করেছিল, দুই সপ্তাহের জন্য সবাইকে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যেতে পারত। তাদের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা চলত। সুস্থরা বাড়ি যেত। তাহলে ভাইরাসটি বাইরে ছড়ানোর সুযোগ পেত না।
নাম্বার দুই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন জাতিকে ব্রিফ করছিল। তাদের উচিত ছিল সঠিক তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা। অথচ দেখা গেল, করোনা নিয়ে একধরনের লোকোচুরি খেলা চলছে। দেশের পত্রপত্রিকা বিভিন্ন জেলায় ডজন ডজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ জানাচ্ছে, কিন্তু কাউকে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া বলতে পারছে না। তাদেরকে বলতে হচ্ছে সর্দি-কাশি-জ্বর বা গলাব্যথায় মারা গেছেন।
নাম্বার তিন
বাংলাদেশের আলেম সমাজ। দেশের কিছু আলেম শুরু থেকেই কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা অথবা আংশিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষকে মিসগাইড করতে থাকলেন। কেউ বললেন, করোনা মুসলমানের জন্য আসেনি। কেউ জানালেন করোনা কোনো নামাজিকে স্পর্শও করতে পারবে না। আবার কেউ বলতে থাকলেন, ইসলামে ছোঁয়াচে বলে কোনো রোগ নেই। রোগ সংক্রমিত হয় না। এটা বিশ্বাস করা যাবে না। তাহলে ইমান চলে যাবে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাবল, তাহলে আর চিন্তা কী! ব্যামার যেহেতু সংক্রমিত হয় না, তাহলে চলি যেমন চলছি।
এই তিন গ্রুপের ত্রিপাক্ষিক বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা বাংলাদেশের মানুষকে বেপরোয়া করে তুলেছিল। যে কারণে দেখাগেল, লকডাউন ঘোষণা করার পরও বাজারের অবস্থা যা ছিল তাই আছে। ব্যাংক-বীমা অফিস আদালতেও মানুষের কোলাহল কমছে না। মসজিদে মন্দিরে ধর্মীয় উপাশনালয়ে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। খেশারত দিচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে অভিনব কায়দায় চলছে করোনার মোকাবিলা। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান-পাট, অফিস-আদালত খোলা। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত সব বন্ধ। বাংলাদেশের হাট-বাজারে করোনা দিনে বেলা এসে হানা দেয় না, একজন থেকে আরেকজনের কাছে সংক্রমিত হয় না-এই ইনফরমেশন করোনা কোন মন্ত্রণালয়ে ফোন করে জানিয়েছে, কেউ জানে না। লেখক : কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক।
ব্রঙ্কস, নিউইয়র্ক।