বাদ দিলেই সব বাদ হয়ে যায় না

আমেরিকা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়াই করেন, তাঁরা পরাজিত হন না। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত আমেরিকানরাও তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয়ী জাতি। তবে এই বিজয় অর্জন এমনি এমনি রক্ত ছাড়া হয়নি। স্বাধীনতার জন্য তাদেরও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। স্বাধীনতার বেদিমূলে আমেরিকানদেরও রক্ত দিতে হয়েছে। জীবনও দিতে হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য আসলে সব জাতিকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়। স্বাধীনতাহীনতায় যারা বাঁচতে চায় না, তারা অবশ্য সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত থাকে। তারা শত্রু যত পরাক্রমশালীই হোক-তাদের ভয় পায় না। আর যে জাতি একবার সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে যায়, তার ফল লাভ অনিবার্য।

আমেরিকানরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সংবিধানও দিয়েছে। নারীসমাজের ভোটাধিকার দিতে অনেক দেরি করলেও কোনো দলই নিজেদের ক্ষমতাকে লম্বা করার অসৎ উদ্দেশ্যে সংবিধান কাটাছেঁড়া করেনি। আমেরিকায় নারীসমাজের ভোটাধিকার প্রাপ্তি ঘটে ১৯২০ সালে। ১৯১৯ সালের ৪ জুন কংগ্রেস নারীদের ভোটের অধিকার দিয়ে আইন পাস করে। ১৯২০ সালের ১৮ আগস্ট সে আইন সংবিধানের ঊনবিংশতম সংশোধনীর মাধ্যমে গৃহীত হয়। আমেরিকার স্বাধীনতার বয়স প্রায় ২৫০ বছর ছুঁই-ছুঁই। এর মধ্যে সংশোধনী হয়েছে মাত্র ২৭টি। অর্থাৎ মাত্র ২৭ বার কাটাছেঁড়া হয়েছে সংবিধান। কিন্তু একটিবারও সংশোধনী আনা হয়নি কোনো দলের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার আকাক্সক্ষায়!

সংবিধানের প্রতি আমেরিকার জনগণ, রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলের শ্রদ্ধা ও আস্থা থাকার কারণে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে না। রাজনীতি নিয়েও ওই রকম নোংরামি দেখা যায়নি, যে রকম নোংরামির ফলে অনেক দেশে মাঝেমধ্যেই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চেপে বসে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও কেবল ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য অনেক শাসক স্বৈরাচারে পরিণত হন। তাদের অনেকেই নির্বাচিত স্বৈরাচার কিংবা নির্বাচিত একনায়ক বলে অভিহিত হন।

যাদের সম্পর্কে এসব মন্তব্য, তারা অবশ্য নির্বিকার থাকেন। ক্ষমতার গন্ধ তাদের অন্ধ করে দেয়। বোধ-বুদ্ধি তাদের লোপ পায়। ভুলে যান অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতির কথা। যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসার সুযোগ পান, সেই জনগণকে কোনো রকম দমন-পীড়ন চালাতে দ্বিধা করেন না। পুলিশ-র‌্যাব এবং রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা জনগণকে দমনের জন্য ব্যবহার করতে লজ্জা পান না। জনগণের কোনো রকম ন্যায্য দাবি, ন্যায্য অধিকারের কথা তারা শুনতে চান না। জনগণের যেকোনো দাবিকে তারা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র বলে গণ্য করেন। তাই শেষ পর্যন্ত জনগণই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

এ দেশে অর্থাৎ আমেরিকায় ক্ষমতাকে স্থায়ী কিংবা দীর্ঘ করার প্রবণতায় কাউকে বা কোনো দলকে রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা সংবিধানকে ব্যবহার করার নজির দেখা যায় না। সংবিধানের মূল চেতনাকে নির্বাসন দিয়েও কাউকে আমেরিকাকে তার আদর্শচ্যুত করার উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। মানবিকতার দর্শনে যেমন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, তেমনি আমেরিকানদের কাছে ‘সবার উপরে আমেরিকা সত্য’। এই সত্যকে প্রায় আড়াই শ বছর ধরে আমেরিকার সংবিধান সংরক্ষণ করে আসছে। আজ সেই সংবিধানের মূল চেতনায় হাত দিয়ে বসেছেন বহু অঘটনঘটনপটিয়সী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আমেরিকা যে ইমিগ্র্যান্টদের দেশ, সাংবিধানিক এ সত্যটি আজ বাদ দিতে উদ্যত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর সমর্থনে রিপাবলিকানদের একটি কট্টর গ্রুপকে দেখা যাচ্ছে। আসলে এই কট্টরপন্থীদের কারসাজিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পপুলার ভোটে বিপুল ব্যবধানে হেরেও ইলেক্টোরাল ভোটের জোরে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মার্কিন সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী কর্ম সাধনে উৎসাহিত দেখা যাচ্ছে। অভিবাসীদের বিরুদ্ধাচরণের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ আমেরিকায় মুসলিমবিরোধী নানা পদক্ষেপ গ্রহণেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রথম প্রমাণ মেলে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তাঁর নির্বাহী আদেশে ৭টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ট্রাভেল ব্যানের নির্দেশ জারির মধ্য দিয়ে। আদালতের রায়ে তখন অবশ্য সেই নির্দেশ কার্যকর হতে পারেনি। কিন্তু তিনি এই ইমিগ্র্যান্ট-বিরোধী তৎপরতা থেকে সরেও আসেননি।

আসলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ট্রাম্পের এক বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর দ্বারা মানুষের কল্যাণকর কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। বরং একটার পর একটা কলঙ্কের দায় নিয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে পর্নো তারকা ডেনিয়েলসের মামলা ঝুলছে। এ রকম আরও মামলা তাঁর পিছু তাড়া করছে। আমেরিকার যারা প্রজ্ঞাবান, রুচিবান এবং সুসংস্কৃত মানুষ, তারা আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করছেন। আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মন্তব্য শোনা যায়, তাতে রুচিবান এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনো প্রেসিডেন্ট হলে তিনি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করে সরে দাঁড়াতেন। কিন্তু তিনি সেই দলের নন। দেশের এবং দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে বলে মনে হয় না। অনেক প্রেসিডেন্টের ভূমিকা নিয়েই আমেরিকানদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন দেখা গেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ দেশের মানুষের যত প্রশ্ন এবং অসন্তোষ এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি।

চলতি সপ্তাহের ঠিকানায় (২৩ মার্চ, ২০১৮) প্রথম পৃষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে : ‘ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে স্থান হবে ট্রাম্পের : ব্রেনান’ শিরোনামে। জন ব্রেনান একজন সফল ও কীর্তিমান পুরুষ। সিআইএর প্রাক্তন প্রধান। দায়িত্ব পালনকালে বহির্বিশ্বে খুবই সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তিনি ট্রাম্পকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা বলার মধ্য দিয়ে তাঁর চরম উষ্মা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পকে একজন কলঙ্কিত নেতা অভিহিত করে ব্রেনান গত ১৭ মার্চ ট্রাম্প সম্পর্কে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নীতিবিবর্জিত পন্থায় আপনার অর্থোপার্জন, চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির পরিপূর্ণ খতিয়ান যখন সর্বসমক্ষে প্রকাশ পাবে, তখন কলঙ্কিত জননেতা হিসেবে আপনার স্থান হবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।’

ইতিহাসের আলোকে ব্রেনান আরও যেসব কথা বলেছেন, তা-ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রণিধানযোগ্য। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে কঠিন এক সত্য উচ্চারণ করেছেন, প্রেসিডেন্ট হয়তো অনেককে বলির পাঁঠা বানাতে পারবেন। তবে আমেরিকাকে ধ্বংস করতে পারবেন না। ‘আমেরিকা উইল ট্রাম্প ওভার ট্রাম্প!’ এটিই সত্য। এটিই ইতিহাস-সমর্থিত বাস্তবতা। ইতিহাসের জ্ঞান যারা ধারণ করেন, তাদের মুখেই এমন বাস্তবনিষ্ঠ কথা উচ্চারিত হবে।

ইতিহাস সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্ঞান কতটুকু, জানা নেই। তবে তাঁর কথাবার্তা, দাম্ভিকতা এবং একগুঁয়েমিপনা দেখলে মনে হয় না তিনি ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা জ্ঞান রাখেন! ইতিহাস সম্পর্কে যারা জ্ঞান রাখেন, তারা দাম্ভিকতা বা একগুঁয়েমি প্রকাশ করেন না। তারা ইতিহাস মান্য করে চলেন। ইতিহাস মানবসভ্যতার প্রতি যেমন সদয়, তেমনি ইতিহাসকে যারা বিকৃত করে এবং যারা ইতিহাসকে অস্বীকার করে চলতে চায়, তাদের প্রতি ইতিহাস বড়ই নির্মম!

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিহাস এড়িয়ে অনেক কিছুই করতে পারেন। ‘আমেরিকা ইমিগ্র্যান্টদের দেশ’- এই চেতনাকেও অস্বীকার করতে চাইতে পারেন। কিন্তু তিনি চাইলেই ইতিহাসকে থামিয়ে দিতে পারেন না। মনে রাখা দরকার, ইতিহাস কারও কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। ইতিহাসের শিক্ষাই মানুষকে গ্রহণ করতে হয়। কেউ অস্বীকার করতে চাইলে ইতিহাস তাঁকে শিক্ষা দিয়ে দেয়। তাই ট্রাম্প ইমিগ্র্যান্টদের ভূমিকা ও অবদান বাদ দিতেই চাইলেই আমেরিকার ইতিহাস থেকে ‘আমেরিকা ইমিগ্র্যান্টের দেশ’ এ কথা বাদ হয়ে যাবে না। আমেরিকা ইমিগ্র্যান্টের দেশ ছিল, আমেরিকা ইমিগ্র্যান্টের দেশ আছে এবং আমেরিকা ভবিষ্যতেও ইমিগ্র্যান্টের দেশই থাকবে। এই সত্যকে যিনি যতটা মান্য করে এবং ধারণ করে চলবেন, আমেরিকা বিশ্বের বুকে তত শক্তিশালী দেশের গৌরব অর্জন করবে।