বাবা-মা শুয়ে আছে কবরের দেশে

মোহাম্মদ সোহরাব আলী :

বাবা মা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে ওই কবরের দেশে। সবাইকে হারিয়ে এতিম হয়ে বুকটা শূন্য করে বেঁচে আছি পৃথিবী নামক ভূখণ্ডে। কত যে তাদের কথা পড়ে মনে। তারা বেঁচে থাকতে এতটুকু তাদের অভাববোধ করিনি। তারা যে আমাদের জীবনে কত বড় পাওয়া, মরে যাওয়ার পর তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

বাবা-মা ছাড়া মনে হচ্ছে পৃথিবী অন্ধকার। বাবা-মায়ের মতো আর কাউকে খুঁজে পাই না। তাদের কথা মনে পড়লে হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে ওঠে। হঠাৎ একা কোথাও চলে যাই। ফাঁকা মাঠে অথবা কোনো নির্জন জায়গায় গিয়ে বসে থাকি। মাথায় হাত দিয়ে কী যে ভাবি, তা জানি না। হৃদয়ে কম্পন শুরু হয় এবং হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদি। বুকে চিনচিন ব্যথা করে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মনে হয় শক্তি নেই। যেখানে হাত দিই, প্রচুর ব্যথা অনুভব করি। এ ব্যথ্যা ওষুধ খেলে আর কমে না। এ ব্যথা বাবা-মা হারানোর ব্যথা। এখন মনে হয়, বিদেশ থেকে দেশে গিয়ে তাদের কেন আরো সেবাযত্ন করিনি। প্রাণটা ভরে আরো কথা কেন বলিনি। চোখটা ভরে কেন আরো দেখিনি। তাদের সাথে আরো বেশি সময় কেন কাটাইনি।
বাবা-মায়ের মতো আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। কত লোকের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কথা বলি কিন্তু হৃদয়ে প্রশান্তি আসে না। মনে হয়, কী যেন না পাওয়ার বেদনা। কেমন যেন মনে হয় আমি কি আসলে কারো সঙ্গে কথা বলছি!
মন চলে যায় অন্যদিকে। মন খোঁজাখুঁজি করে সেই আমার বেহেশতি বাবা-মাকে। কই আমার বাবা-মা। দাও তাদেরকে, তাদের সাথে বলব কথা প্রাণখুলে। কত রকমের খাবার খেতে লোকে ডাকে। কোনো খাবার আর খেতে ইচ্ছা করে না। খাবার যত স্বাদই হোক আর ভালো লাগে না। মনে হয়, বাবা-মায়ের সাথে বসে দুটি ডাল-ভাত খেতে পারলে আত্মাটা শান্তি পেত। মায়ের হাতের তৈরি খাবারের তুলনা হয় না। মা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করত, মায়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে কত সুন্দর করে মাথা মুছে দিত, কান্নাকাটি করলে চোখের জল মুছে দিত-তা কত মিস করি। ও আমার জন্ম দুঃখিনী মা, ও আমার গর্বিত বাবা-তোমাদের অবদান ভুলিনি, কোনো দিন ভুলতে পারব না।

পৃথিবীর সব ভালোবাসার মধ্যে স্বার্থ থাকলেও বাবা-মায়ের ভালোবাসার মধ্যে কোনো স্বার্থ নেই। পৃথিবীটা শূন্য মনে হয়। কেউ মারতে এলে প্রতিবাদ না করে পিঠ পেতে দিতে ইচ্ছা হয়। কারো প্রতি আর এতটুকু হিংসা জাগে না। নিজেকে একেবারে অসহায় মনে হয়। বাচ্চাদের মতো হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়লে মা মা করে ডাকি। এই আমি হাঁটছি, হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়লে থমকে দাঁড়াই। মনের অজান্তে কী যেন বলি, নিজেও জানি না। পাগলের মতো এদিক থেকে ওদিকে যাই। কত যে ছোটাছুটি করি কিন্তু মাকে আর খুঁজে পাই না। বাবা-মা দুজনকেই বেশি বেশি মনে পড়ে। কখনো রাতে মায়ের কথা মনে পড়লে চোখ দিয়ে পানি পড়ে বালিশ যায় ভিজে। মা মা করে কত যে হাউমাউ করে কাঁদি। বালিশের ওপর মাথা রেখে কত যে আচারি-বিচারি করি। কখনো ওয়ালের সাথে মাথা রেখে গুঁতা মারি। কত হা-হুতাশ করে কত কিছু যে বলি কিন্তু বাবা ও মাকে আর খুঁজে পাই না। যে মূল্যবান রতন জীবনে হারিয়েছি আর কোনো দিনও ফিরে পাব না। যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর পূরণ হবে না কোনো দিন।

মা অসুস্থ ছিল বটে, কিন্তু পৃথিবী থেকে যে এ রকম হঠাৎ করে বিদায় নেবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি। মা মরে যাওয়ার তিন দিন আগেও কথা হয়েছিল। মা বলল, ঠিক আছে, অফিসে যাও। পরে সময় করে আবার কল দিয়ো। সেই ছিল মায়ের সাথে আমার শেষ কথা। আমি অফিসে কাজ করছি, হঠাৎ দেশ থেকে কল করে বলল, মা আর বেঁচে নেই। শুনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো মনে হলো। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বলে কী, মা মারা গেছে! শুধু কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি। আমি কী করব? কোথায় যাব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার সুপারভাইজার, আমার কলিগরা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করে। পরে বাসায় চলে আসি অফিস থেকে। বাসায় এসে সবার সাথে কথা বলে হাউমাউ করে কাঁদি। কী বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা, বলে শেষ করা যায় না। ভিডিও কল দিয়ে মাকে দেখলাম। তার নিথর শরীর খাটের ওপর পড়ে আছে। মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল, আমার সাথে কথা বলবে। এত মা মা বলে ডাকলাম, একবারও আর উত্তর দেয়নি।

সারা রাতে আর ঘুম হয়নি। কত যে হাহুতাশ করছি। দুঃখের সাথে বলতে হয়, যারা বিদেশে থেকে মায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনে, তারা যে কত কষ্ট পায়, তা তারাই কেবল বোঝে। তারা কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে ফেলে। মায়ের মতো এই পৃথিবীতে আর কাউকে পাবে না আর বাবার মতো ছায়া দেয় এমন বটগাছ আর কোথাও খুঁজে পাবে না। আর সেই মা যদি যায় মরে, কলিজা যায় ফেটে। আর বাবা যদি যায় মরে, দাঁড়াব কার কাছে গিয়ে। সুযোগ হয়নি বাবা ও মায়ের সাথে শেষ দেখা করার। কত অসহায় দিন কাটাই। পরিবার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, ক্যারিয়ার ও চাকরি সবই আছে। কেবল নেই মা-বাবা।
মা-বাবার শূন্যতা আর কোনো দিন পূরণ হবে না। শুধু তাদের সব স্মৃতি চোখের পাতায় ভাসে।

বাবা-মা একই গোরস্থানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে। গোরস্থানে গেলে প্রথমে পাই বাবার কবর, তারপর পাই মায়ের কবর। গোরস্থানে যতক্ষণ থাকি, শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ে। বাবার কবরের পাশে গেলে মনে পড়ে, বাবার কত স্মৃতি। আর মায়ের কবরের পাশে গেলে মনে পড়ে মায়ের কত স্মৃতি। কতবার যে রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছতে হয়। বাবা মারা গেছে ২০১৬ সালে আর মা ২০২২-এ। তাদের কবর দেখতে গেলে কবরে কোনো ঘাস, লতাপাতা থাকলে সুন্দর করে পরিষ্কার করে দিয়ে আসি। দোয়া-দরুদ পড়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বাসায় ফিরে আসি।

ফেরার পথে কত কথা যে পড়ে মনে। মা-বাবা কবরদেশে কীভাবে শুয়ে আছে। যে বাবা-মায়ের সাথে একদিন কথা না বলে থাকত পারতাম না। কল দিলেই আগে বলত, বাজান, শরীল ভালো আছে, কী দিয়ে ভাত খেয়েছ? কত যে ভালোবাসত, কথা বললে হৃদয় শীতল হয়ে যেত। কোথায় শুয়ে রয়েছ তোমরা। আর পারি না। আত্মা ফেটে যাচ্ছে। বুকটা ধড়পড় করছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গা থরথর করে কাঁপছে। চোখে অন্ধকার দেখছি। আমার জনম দুঃখিনী মা। বাবা মরে গেলেও তুমি তো বেঁচে ছিলে। কত স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে। আমার সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে আল্লাহর ডাকে পরপারে চলে গেলে আমাকে একা ফেলা রেখে। মনে পড়ে কত কথা। একটা মাছ কিনলে সবচেয়ে বড় পিস তুলে দিতে আমার পাতে। একটু জ্বর এলে তোমার চিন্তা যেত বেড়ে। আমি একটু দেরি করে বাসায় ফিরলে অমনি বের হতে খোঁজ নিতে। এখন আর কেউ ডাকে না, কেউ খোঁজ নেয় না। তোমাদের ছাড়া আমি একা, অনেক একা। স্বপ্নে তোমরা এসে দিয়ো মাঝে মাঝে তাই দেখা।