বামেরা যখন ব্যথানাশক মলম

রাজনৈতিক ডেস্ক : রাজনৈতিক কারণে ১৪ দলের শরিকদের সংসদে বিরোধী দলে থাকাই ভালো’ মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রিসভায় না রাখায় ১৪ দলের শরিক বামরা যখন কেন তাদের মন্ত্রিসভায় নেয়া হচ্ছে না’ জানতে চান, তখন ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ কার্যকর’ করতে সরকারকে এ পথেই হাঁটতে হচ্ছে। কিন্তু ১০ বছর মন্ত্রী-এমপি বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক বামরা বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতালোভী আদর্শচ্যুত ১৪ দলের শরিক এই বামদের মুখে কী সংসদে শ্রমিক-জনতার কথা আসবে? বছরের পর বছর ধরে যারা স্তুতি গাইতে অভ্যস্ত তারা কী সংসদে সরকারের মন্দ কাজের বিরোধিতার ঝুঁকি নেবে?

বামদের বড় অংশের অবস্থা এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তেওড়া তালে রাগ কীর্তন’ ঢং এ লেখা সোনার খাজার পাখি’ গানের মতোই। ১৮৯২ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে নাট্যগীতিতে’ লেখা খাঁচার পাখি ছিল, সোনার খাঁচাটিতে; বনের পাখি ছিল বনে/একদা কী করিয়া মিলন হলো দোঁহে; কী ছিল বিধাতার মনে/ বনের পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই; বনেতে যাই দোঁহে মিলে/ খাঁচার পাখি বলে, বনের পাখি আয়; খাঁচায় থাকি নিরিবিলে/…/এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে; তবুও কাছে নাহি পায়/খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে; নীরবে চোখে চোখে চায়/…/ দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা; কাতরে কহে কাছে আয়/…/খাঁচার পাখি বলে, হায় মোর শকতি নাহি উড়িবার।’ দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকা বামদের সংসদে বিরোধী দলের ভ‚মিকা পালনের নৈতিক শক্তি আছে তো।

মন্ত্রী-এমপি হওয়ার লোভে আদর্শ-দর্শন বিসর্জন দিয়ে কার্যত কাফনের কাপড়ের মুড়িয়ে’ দলকে নৌকায় তুলেছেন। আওয়ামী লীগের কাছে নীতি-দর্শন বন্ধক রাখা বামদের এখন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভ‚মিকা পালন সত্যিই দুরূহ। ঢাকনা খুলে দিয়ে খাচার পাখিকে উড়তে বলা হলে পাখি যেমন উড়ার শকতি’ পায় না; তেমনি নৌকায় উঠে ক্ষমতার স্বাদ আর বৃত্তবৈভবে ভরপুর বামেরা নৈতিক শক্তি খুইয়েছেন।

নৌকায় চড়লেই মন্ত্রী-এমপি’ এই বাস্তবতা বাম রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে যেন বিলীন হচ্ছে। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ যে’কটি বাম দল এখনো স্বকীয়তা বজায় রেখে গণমানুষের পক্ষে থাকার চেষ্টা করছে; তারাও কার্যত এখন টকশোনির্ভর। ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামবিদ্বেষী চিন্তা-চেতনার কারণে গণমানুষ থেকে তারা কার্যত বিচ্ছিন্ন। এক দিকে আলেম-ওলামা বিদ্বেষ’ অন্য দিকে সবাই নেতা হতে চায়’ মানসিকতায় তারা জনগণের হƒদয়ে পৌঁছাতে পারছেন না। বর্তমানে দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই শ্রেণীর পেশাজীবী, ব্যবসায়ীরা মধ্যপন্থী ধারার দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাম নেতারা বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ রক্ষায় নিজেদেরকে শ্রমিক-মেহনতি শ্রেণীর, ক্ষেতমজুরের স্বার্থের কথা প্রচার করেন। অথচ যাপিত জীবনে তাদের অধিকাংশই ভোগ-বিলাসে অভ্যস্ত। বামদের নেতৃত্ব, সম্পৃক্তি, দাবি-দাওয়া, কর্মসূচি-সমাবেশ, আচার-আচরণ, আবেগ-অনুভতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি সবকিছুই এখনো পর্যন্ত ভোগবাদী মধ্যবিত্ত ওরিয়েন্টেড’। এরা শ্রমিক শ্রেণীর ভ্যানগার্ড’ এর বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুবিধার দিকে মনোযোগী। বামদের মধ্যে যারা নৌকায় চড়ে ক্ষমতায় যেতে পারেননি; তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু যারা ক্ষমতায় গেছেন, তারা অর্থবিত্তে পাল্টে ফেলেছেন জীবনধারা। মুখে মেহনতি মানুষের কথা বলেন, বাস্তবে জীবনযাপন করেন বিলাসী। রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দীলিপ বিশ্বাস, ফজলে হোসেন বাদশা, মঈন উদ্দিন খান বাদলদের দিকে তাকালে কী দেখি? নির্বাচন কমিশনের দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায় ১০ বছরে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ২২ গুণেরও বেশি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, মেননের স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৩০ টাকা। মেননের নিজের ১০ বছরে বার্ষিক আয় বেড়েছে ৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকার বেশি। অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টাকার বেশি। স্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে তার বার্ষিক আয় প্রায় চার গুণ ও অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে তিন গুণ। স্থাবর সম্পত্তির দিক থেকে গত ১০ বছরে মেননের স্ত্রী হয়েছেন কোটিপতি। নবম ও দশম নির্বাচনী হলফনামায় তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তি না থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ২৪০ টাকা। অন্য দিকে, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর গত ১০ বছরে আয় ও সম্পদ বেড়েছে কয়েক গুণ। হলফনামায় হাসানুল হক ইনু লিখেছেনÑ পেশা রাজনৈতিক কর্মী ও প্রকৌশলী। আয়ের বড় অংশ আসে ব্যবসা, বেতন-ভাতা, ব্যাংকের লভ্যাংশ ও টিভি টকশো থেকে। ইনুর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বার্ষিক আয় সাত লাখ ৪৪ হাজার ১২৯ টাকা, বেতন-ভাতা থেকে আয় ২৩ লাখ ২৭ হাজার ৫৮০ টাকা, আর টিভি টকশো ও ব্যাংক সুদ থেকে পান তিন লাখ ৮৯ হাজার ৯১৪ টাকা। দশম সংসদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেয়া তথ্যানুযায়ী পাঁচ বছরে ইনুর আয় বেড়েছে কয়েক গুণ। পাশাপাশি স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে অনেক, যা হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। এটা নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামা। বাস্তবে এই অর্থ আরো বহুগুণ বেশি। আর দীলিপ বিশ্বাস নির্বাচন না করায় অর্থের হিসাব জানা যায়নি। ১৪ দলীয় জোটের এই বামরা আগে তোপখানা রোডের ছোট হোটেলগুলোতে দুপুরের আহার করলেও এখন দুপুরের খাবার খান অভিজাত হোটেলে।

১৯৩৭ সালে উপমহাদেশে ভোটের রাজনীতি শুরু হরে বামরা মুসলিম লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। ’৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৫০ সালে সেনাবাহিনীর এক অংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। ইতিহাসে ওটা লাহোর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে পরিচিতি। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠিত হলে ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাপ বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশে সক্রিয় হয়। তবে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাম কিছু কর্মী আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হয়। তখন ছিল বামদের রমরমা যুগ। ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বাম উত্থান ঘটে। গঠিত হয় ন্যাপ। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল’ জারি হলে ১৯৬২-৬৩ সালে বামদলগুলো বিদেশি প্রভু ইস্যুতে সোভিয়েতপন্থী ও চীনাপন্থীতে বিভক্ত হয়। তখনো বামরা গণমানুষের পক্ষেই ছিল। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্বে অনেক বামকর্মী নেতৃত্বে আসেন। আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হলেও ’৬৯ গণ-অভ্যুত্থানে মওলানা ভাসানীর ভ‚মিকা ছিল মুখ্য। ’৭০ এর নির্বাচনে অংশ না নেয়া বামদের জন্য ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

যুগের পর যুগ ধরে বিকল্পের সঙ্কল্প’ ছিল বামদের আদর্শ। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বামরা (বাসদ ছাত্রলীগ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসুতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ ভ‚মিকা পালন করে। স্বৈরাচার এরশাদকে হটাতে গড়ে ওঠে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রæয়ারি রক্তঝরা ছাত্রমিছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে হটাও এরশাদ’ আন্দোলনে প্রকাশ্যে জোট বাধতে তাগিদ দেয়। গড়ে ওঠে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫-দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট। বাম পাঁচ দল মিলে গঠন করে বাম জোট। এমনকি ’৯০ এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করতে বামদের গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা ছিল। ’৯১ এর নির্বাচনে বামরা সাতটি (সিপিবি পাঁচ, ন্যাপ এক, গণতন্ত্রী পার্টি এক) আসন পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মিখাইল গর্ভাচেভের গøাসন্ত-প্রেরেস্ত্রইয়া নীতি গ্রহণ করায় সিপিবিসহ বাম শিবির ওলটপালট হয়ে যায়। পাঁচদলীয় বামগুচ্ছের সঙ্গে ’৯০ পরবর্তী বামদের আটদলীয় জোট, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং বাম বিকল্পের ২১ দফা কর্মসূচি এখন ইতিহাস। ঘাটে ঘাটে জোট-ফ্রন্ট করে বাম দলগুলো গণমানুষের কথা বলেছে। কিন্তু নৌকায় উঠে ক্ষমতার পাহাড়ে বসে সেই বামদের এখন বেহাল দশা। ১৯৭২-৭৫ এ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে গণবাহিনী গড়ে তোলা বাম নেতারা এখন সংসদে যখন বঙ্গবন্ধুর স্তুতি গায় তখন আওয়ামী লীগ নেতারাও লজ্জা পান। বিদ্রƒপের হাসি ঠেকাতে ঘোষণা দেন আমরা ভুলের কাফফারা’ দিচ্ছি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্প শক্তি গঠনে বামরা ১১ দলীয় জোটও করেছিল। কিন্তু নৌকায় উঠে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে মহাজোটের চৌকাঠে মুখ থুবড়ে পড়ে ১১-দলীয় বামফ্রন্ট; নিখোঁজ হয়ে যায় বামফ্রন্টে ২১-দফা কর্মসূচির বাম-বিকল্পের সঙ্কল্প। অবৈধ ক্ষমতা দখলের অভিযোগ তুলে এরশাদের বিরুদ্ধে যে হাসানুল হক ইনু আদালতে মামলা করেন; এরশাদ যাকে অকৃতজ্ঞ’ বলে গালি দেন; সেই ইনু মন্ত্রী হয়ে এরশাদের পা ছুঁয়ে ছালাম করেন। যদিও বামফ্রন্টের শরিক সিপিবি একটি মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বাসদ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম দল ও সমমনা সংগঠন নিয়ে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা গড়ে তোলে। ইতিহাসে এটাও দেখা যায়, ২০১১ সালে ঢাকায় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে ভারতকেও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গণমানুষের অধিকার আদায়ে সেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার চ্যাম্পিয়নরা দিল্লির তুষ্টিতে এখন নৃত্য করছে। এক সময়ের বনেদি’ বামরা এখন মন্ত্রী-এমপি হওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত। নরমাংসের স্বাদ’ পেলে বাঘ যেমন বেপরোয়া হয়ে উঠে; ক্ষমতার স্বাদ’ পেয়ে বামদের বড় অংশ এখন বেজায় বেপরোয়া। তারা মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া। লোভাতুর জিহŸা নিয়ে বামরা সংসদে কী ভমিকা রাখবেন?

বাংলাদেশের রাজনীতির জীবন্তকিংবদন্তি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ কয়েক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রাশেদ খান মেনন-হাসানুল হক ইনু প্রকৃত বামপন্থী নয়; এদের যাপিত জীবনে বাম-রাজনীতির ছিটেফোঁটাও নেই। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত এদের রাবিং বাম’, টাইগার বাম’ বলা যেতে পারে’। দেশের মানুষ রাবিং বাম ও টাইগার বামকে মূলত ব্যথানাশক মলম হিসেবে জানেন। দেখা যাক এই বামরা বিরোধী দলের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়ে জাতীয় সংসদে ঐক্যফ্রন্টের আট এমপির অনুপস্থিতি’ ক্ষমতাসীনদের ব্যথা’ কতটুকু দূর করতে পারেন।