বাসা ভাড়া পাচ্ছেন না বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী

চট্টগ্রাম : সম্ভ্রম হারিয়েছেন একাত্তরে। থাকার ঘরটিও পুড়িয়ে দিয়েছিল হায়েনারা। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁইও হয়নি তার। কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে একসময় বনে-জঙ্গলেও দিন কাটিয়েছেন অসহায় রমা চৌধুরী।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না এই একাত্তরের বীরাঙ্গনার। তাই বাধ্য হয়ে চিকিৎসকদের বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেয়েও দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বিছানায় রোগ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি। রোগীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবার আর শুধু বিনামূল্যের সরকারি ওষুধ দিয়েই চলছে তার কোনোমতে প্রাণে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চমেক হাসপাতালের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩ নম্বর কেবিনে, এখানে শুয়ে-বসে জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করছেন তিনি। ৮৩ বছরের জবুথবু রোগক্লিষ্ট শরীরটির নড়াচড়াও এখন সীমিত। কয়েক মাস আগে কোমর ভেঙে শয্যাশয়ী হয়েছেন এখানে। এর আগে একাধিক রোগ তো ছিলই। গত ২৫ মার্চ হাসপাতাল কেবিনের বেডেই কথা হয় এই বীরাঙ্গনার সঙ্গে।

স্মৃতিচারণ করেন তিনি তার জীবনের দুঃসহ সেই অধ্যায়ের। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে নেমে পড়েন। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা সম্ভ্রমহানির শিকার হন। এরপর জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তার বাড়ি। এ ঘটনার ক্ষত না শুকাতেই দুই বছর পর তার দুই সন্তান সাগর (৫) ও টগর (৩) মারা যায়। এত ধকল সহ্য করতে না পেরে দেশান্তরী হন তার স্বামী। তবে এতেও দমে যাননি রমা। নেমে পড়েন নতুন যুদ্ধে। শুরু করেন শিক্ষকতা। শিক্ষকতা জীবনে ১২টির বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, কারও কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। আমি চাই একটু ভালোবাসা। তবে অনেকেই আমাকে এড়িয়ে চলেন। সরকারের উচ্চপদস্থ কেউ আমার খোঁজখবর নেননি। এমনকি কেউ ফোন পর্যন্ত করেননি। উল্টো চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অপদস্থ হয়েছি।

এবার সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী। স্বাধীনতা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপনে যখন ব্যস্ত জাতি, তখনই বিছানায় রোগ যন্ত্রণায় ভুগছেন এক বীরাঙ্গনা। জীবনযুদ্ধে জয়ী এই নারী এখন ভালো নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে ব্যাধির নামের মিছিল। কোমর ভাঙা ছাড়াও ডায়াবেটিস, গলব্লাডারে পাথর, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অ্যাজমাসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগের হামলায় কাবু তিনি। অর্থাভাবে ভালো করে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এই সাক্ষী।

রমা চৌধুরীর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও তার বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না রমা চৌধুরীর। এমনকি অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না কোনো বাসা। ১৭ বছর ধরে বসবাস করেছেন চেরাগী পাহাড় সংলগ্ন লুসাই ভবনের একটি মাত্র কক্ষে। আলাউদ্দিন বলেন, ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রমা চৌধুরী কারও কাছে হাত পাতেন না। নেন না কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও। নিজে বই লিখে তা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়েই চলে তার সংসার। সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থের উৎস না থাকায় এখন চিকিৎসাও বন্ধের পথে। এমতাবস্থায় সরকারকেই তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে হবে।

জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করা এই নারী সব ধর্মের অনাথ শিশুদের জন্য একটি আশ্রম খোলার উদ্যোগ নেন কয়েক বছর আগে। বই বিক্রির টাকা দিয়ে দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয় গড়ে তোলেন তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে থমকে যায় তার সেই স্বপ্নের অনাথালয়। রমা চৌধুরী বলেন, আমার স্বপ্ন দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খোলার। কিন্তু প্রথম উদ্যোগেই ধাক্কা খেলাম। যদি আমার স্বপ্ন পূরণে সরকার এগিয়ে আসে, তাহলে আমার এই অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণ হবে।

১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। তিন বছর বয়সে হারান বাবাকে। মা মতিময়ী চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় চালিয়ে যান পড়াশোনা। এইচএসসি পাস করার পর শিক্ষকতাকে বেছে নেন তিনি। বোয়ালখালীর বেঙ্গরা কেবিকেআর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের যোগদান করেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তিনিই ঢাবি থেকে স্নাতকোত্তর করা চট্টগ্রামের প্রথম কয়েকজন নারীর মধ্যে অন্যতম।

অসীম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মহীয়সী সংসার চালিয়েছেন নিজের লেখা বই ফেরি করে। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো- নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য, ’৭১-এর জননী, স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন, শহীদদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি।