বাড়ছে নিঃসঙ্গতা

এনামুল হক

পশ্চিমা সমাজে আজ এক নতুন সমস্যা। তা হলো নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ববোধ। সমস্যাটি বয়স্ক বা বুড়োদের মধ্যেই প্রধানত ছিল। ইদানীং তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যেও বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে। ধনী বিশ্বের চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকরা একাকীত্ব সমস্যাটি দিয়ে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন বোধ কমছে। গত জানুয়ারি মাসে ব্রিটেনে নিঃসঙ্গতা বিষয়ক এক মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সার্জন জেনারেল নিঃসঙ্গতাকে মহামারী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটা স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এতে মেদবহুলতা হচ্ছে, ধূমপান বাড়ছে। নিঃসঙ্গতায় আক্রান্তরা নিজেদের ঘরের দরজা বন্ধ করে আটকে রাখছে নিজেকে।
নিঃসঙ্গতা যে একটা সমস্যা এবং এর যে অস্তিত্ব আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এর প্রকৃতি ও ব্যাপকতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলার উপায় নেই। মেদবহুলতা স্কেলে মাপা যায়। কিন্তু আবেগকে পরিমাপ করার উপায় কি? নিঃসঙ্গতা সামাজিক একাকীত্বে কিংবা নির্জনতার সমার্থক নয়। গবেষকরা বরং নিঃসঙ্গতাকে অনুমিত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এমন এক অনুভূতি, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পছন্দের সামাজিক যোগাযোগ নেই। তবে প্রচুর বন্ধুবান্ধব ও পরিবার পরিজন থাকা সত্ত্বেও নিঃসঙ্গতা আঘাত হানতে পারে। নিঃসঙ্গতা সে সব সময় খারাপ, তাও নয়। নিঃসঙ্গতাই সঙ্গী পাওয়ার আগ্রহ জাগ্রত করে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, জাপানের ৯ শতাংশ, আমেরিকার ২২ শতাংশ ও ব্রিটেনের ২৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক সর্বদা অথবা প্রায়শ নিঃসঙ্গতাবোধ করে। কিংবা মনে করে তাদের কোন সঙ্গী নেই, সাথী নেই অথবা মনে করে তাদের পরিত্যাগ করা বা একঘরে করে ফেলা হয়েছে। অন্য এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৪৫ বছর বয়সোর্ধ ৩৫ শতাংশ আমেরিকান নিঃসঙ্গ। এদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমপক্ষে ছয় বছর এমন অনুভব করেছে। আর ৩২ শতাংশের মনে ১ থেকে ৫ বছর ধরে এমন অনুভূত হয়েছে। জাপানে ৫ লাখেরও বেশি লোক একটানা কমপক্ষে ৬ মাস বাড়িতে বসে থাকে এবং এ সময় তারা বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। আরেক সমীক্ষায় দেখা যায় ১৫ শতাংশ জাপানি নিয়মিত প্রায় একা।
নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্তের অস্তিত্ব যৎসামান্যই রয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নিঃসঙ্গতাও। একা একা থাকা লোকজনের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করলেই তা বোঝা যায়। ১৯৬০ সালের আগে আমেরিকা, ইউরোপ বা জাপানে এক ব্যক্তির পরিবারের সংখ্যা কদাচিৎ ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। আজ স্টকহোমের মতো শহরগুলোতে বেশির ভাগ বাড়ির সদস্য সংখ্যা মাত্র একজন। অনেকে স্বাধীন থাকার জন্য একা একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। তবে ধনী দেশগুলোতে এমনও অনেকে আছে, যারা বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামী/স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে একা থাকে।
নিঃসঙ্গতা অন্যভাবেও বাড়ছে। ১৯৮৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমেরিকান পরিবারের গড় আকার এক-ততীয়াংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। নিঃসঙ্গতা যে স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ তা নতুন কিছু নয়। সামাজিক জীবনের অনুকূল শক্তির প্রমাণের অভাব নেই। শুধু একটা দৃষ্টান্ত দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নত দেশে আত্মহত্যার ঘটনা হ্রাস পেয়েছে। সামাজিকভাবে একত্রিত হওয়া এর একটা বড় কারণ।
সম্প্রতি চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যের মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। ২০১৫ সালে ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এক মেটা-এনালিসিস চালায়। গড়ে সাত বছর সময়ের মধ্যে ৩৪ লাখ অংশগ্রহণকারীর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। তাতে দেখা যায় যে, নিঃসঙ্গ শ্রেণীভুক্তদের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে ২৬ শতাংশ বেশি। আর যারা একাকী বাস করে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে ৩২ শতাংশ বেশি। ছোট পরিসরের গবেষণায়ও নিঃসঙ্গতা, একাকীত্বের সঙ্গে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে আছে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার, মাদকাসক্তি, নিদ্রাহীনতা, বিষণœতা, মদের নেশা ও উদ্বেগ। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায় নিঃসঙ্গ মানুষদের তাড়াতাড়ি আলঝেইমার রোগও স্মৃতিলোপের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিঃসঙ্গতা কিভাবে স্বাস্থ্যহানি ঘটাতে পারে তাও দেখা গেছে বিভিন্ন সমীক্ষায়। প্রথমটি আচরণগত। পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে কোনো রকম উৎসাহ না পেয়ে নিঃসঙ্গ ব্যক্তিরা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো জৈবিক। নিঃসঙ্গতার কারণে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের মাত্রা বাড়তে পারে কিংবা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এতে শরীরের ক্ষতি সাধিত হয়। তৃতীয়টি হলো মনস্তাত্ত্বিক। নিঃসঙ্গতার পরিণতিতে বিষণতা বা উদ্বেগ বাড়তে পারে। অসুস্থ ব্যক্তিদের নিঃসঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ইকোনমিস্ট পত্রিকার জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের ছয়জন বলেছে যে, নিজেদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকার কারণেই তারা নিঃসঙ্গ বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। ১০ জনের মধ্যে তিনজন বলেছে, নিঃসঙ্গতাই তাদের নিজেদের ক্ষতিসাধন করতে বাধ্য করেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, নিঃসঙ্গতা স্বাস্থ্যহানির কারণ ঘটায়। আবার স্বাস্থ্যহানির কারণেও নিঃসঙ্গতা সৃষ্টি হয়।
নিঃসঙ্গতার কারণ কি? একটি সাধারণ কারণ হলো সঙ্গী বা সঙ্গিনীর অভাব। বিবাহিতদের বা একত্রে থাকা ব্যক্তিদের নিঃসঙ্গতা বোধ করার সম্ভাবনা কম। সঙ্গী বা সঙ্গিনী থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তরুণদের তুলনায় তাদের অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রায়শ ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক কম থাকে।
তারপরও নিঃসঙ্গতা বিশেষভাবে বয়স্কদের ব্যাপার নয়। আমেরিকা বা ব্রিটেনে বয়স ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে সুস্পষ্ট কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাপানে দেখা গেছে অপেক্ষাকৃত তরুণরাই বরং বেশি নিঃসঙ্গ। প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে তরুণ ও অতিবৃদ্ধদের (৮৫ বছরের বেশি) নিঃসঙ্গতার হার সব থেকে বেশি। বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতার একটা সুনির্দিষ্ট কারণ বিপতœীক হয়ে পড়া। তবে বয়স যাই হোক না কেন, কিছু কিছু গ্রুপের নারী-পুরুষের নিঃসঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। একটি হচ্ছে শারীরিক অক্ষমতা। অন্যটি হচ্ছে অভিবাসন। নেদারল্যান্ডসে এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬০ থেকে ৭৯ বছর বয়সের ওলন্দাজ বংশোদ্ভূতদের তুলনায় পোলিশ অভিবাসীদের মধ্যে নিঃসঙ্গতার হার বেশি। ২০১০ সালে চীনা ট্রেড ইউনিয়নের এক সমীক্ষায় বলা হয়, অভিবাসী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিঃসঙ্গতা।
নিঃসঙ্গতার জন্য সাধারণত শারীরিক অক্ষমতা, বিষণœতা, বিপতœীক হওয়া, জীবন সঙ্গীকে না নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাকে দায়ী করা হলেও কারও কারও মতে, এগুলোর চেয়ে বৃহত্তর একটি কারণ নব্য উদারতাবাদও দায়ী। ধনী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজের লোকেরা অন্য সমাজের লোকদের তুলনায় অধিকতর নিঃসঙ্গ এমন নয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের নিঃসঙ্গ মানুষদের মধ্যে ৩০ থেকে ৫৫ শতাংশ বেশ মারাত্মক নিঃসঙ্গতার শিকার। অন্য দিকে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের এমন শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ।
বলাবাহুল্য, দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো সাধারণত অধিকতর দরিদ্র এবং এসব দেশের কল্যাণমূলক বিধি ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম। নিঃসঙ্গতা বিষয়ক সমকালীন বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো প্রযুক্তি। স্মার্টফোন ও সামাজিক মিডিয়াকে তরুণদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখা হয়। ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য। বেশিরভাগ ধনী দেশের তথ্য উপাত্তে দেখা যায় যে, স্কুলে নিঃসঙ্গতা বোধ করা ১৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের সংখ্যা ২০০৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। স্মার্টফোনকে এ জন্য বলির পাঁঠা করা হয়। ২০০৯ সালে বাবা-মাকে ছাড়া ক্রমশ বাইরে যাওয়া আমেরিকান কিশোরীর সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পায়। এ সময়ের দিকেই মোবাইল ফোনের ব্যবহার সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, কিশোররা এ সময় অনলাইনে যুক্ত হতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার জন্যই যে তারা অধিকতর নিঃসঙ্গ হয়েছে, তা বলার উপায় নেই। বরং স্নাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রাম তাদের বন্ধুদের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার জরিপে দেখা যায় যতসংখ্যক তরুণ ভেবেছে যে, সামাজিক মাধ্যমের কারণে তাদের নিঃসঙ্গ অবস্থার অবনতি ঘটেছে, প্রায় ততসংখ্যক তরুণ আবার মনে করছে যে সামাজিক মাধ্যম তাদের জন্য সহায়ক হয়েছে। তার পরও কিছু মনস্তত্ত্ববিদের মতে, সযতেœ বাছাই করা অন্যদের ছবি দেখে তরুণদের মনে হতে পারে যে তারা বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং এই বোধ থেকে তাদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা দেখা দিতে পারে। আমেরিকায় ২৯ থেকে ৩২ বছরের তরুণদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, যারা সামাজিক মাধ্যম সবচেয়ে কম ব্যবহার করেছে, তাদের তুলনায় প্রায়শই এই মাধ্যম ব্যবহারকারীদের নিঃসঙ্গতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণেরও বেশি। তারপরও এটা পরিষ্কার নয় যে, সোশ্যাল মিডিয়া বেশি ব্যবহার করলে নিঃসঙ্গতা হয়, নাকি কম ব্যবহার করলে হয়। অন্যান্য সমীক্ষায় দেখা যায় যে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ও বিষণতার মধ্যে যোগসূত্রটি প্রকৃতপক্ষে দুর্বল।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ জিনেটিক্সের সঙ্গে নিঃসঙ্গতার জোরালো সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। ব্যক্তির জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ কারোর মৃত্যুও নিঃসঙ্গতার কারণ ঘটাতে পারে। আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকেও নিঃসঙ্গতা দেখা দিতে পারে। যারা মনে করে যে তারা অন্যদের সম্মান, মর্যাদা ও মনোযোগ আকর্ষণের যোগ্য নয়, তারা শেষ পর্যন্ত একাকীত্ব ও ক্রনিক নিঃসঙ্গতায় ভুগতে পারে।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নিঃসঙ্গতার নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব আছে। যেমন, বিষণœতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা, হƒদরোগ ও স্ট্রোক, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা হ্রাস, সমাজবিরোধী আচরণ, ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তি, আলঝেইমার রোগের শিকার হওয়া প্রভৃতি।
সূত্র : দি ইকোনমিস্ট