বিএনপির নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে

নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশে বিরাজমান পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলেও দল ও দেশ পরিচালনা করতে যোগ্য, দক্ষ নেতৃত্ব বিএনপিতে রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে দিন দিন বড় হয়ে আসছে। রাজনীতিসচেতন মানুষ নেতৃত্বহীনতার কারণে বিএনপির প্রতি দারুণ আশাহত হয়ে পড়েছেন। এই বাস্তবতায় সরকারি দলও তাদের পরিকল্পনা, কর্মকৌশল চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্ব যে কতটা দুর্বল, গত কয়েক বছরে তা অনেকবারই প্রমাণিত হয়েছে। ক্রমে এই অযোগ্যতা, ব্যর্থতার দিকগুলো প্রকটভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
বর্তমানে লোডশেডিং রাজধানীসহ দেশজুড়ে মানুষকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। সরকার ঘোষণা করেছে, দৈনিক এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন হচ্ছে কমই। দুই থেকে তিন ঘণ্টা, এমনকি দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে মানুষ। মহানগরসহ সকল শহরেও মানুষের কষ্ট অসহনীয়। ভরা বর্ষায় দেশজুড়ে বৃষ্টিহীনতা গরমের মাত্রা অনেক বাড়িয়েছে। চরম অসহনীয় এই অবস্থার মধ্যেও ঢাকাসহ দেশের কোথাও বিএনপির উদ্যোগে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ হয়নি।
বিদ্যুতে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে শুরু থেকেই। বিশেষ করে, বেসরকারি খাতে রেন্টাল বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে উদ্যোক্তাদের যে অস্বাভাবিক হারে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বিশ্বে তা নজিরবিহীন। এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ নিয়ে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী কোনো মহল, গোষ্ঠী, ব্যক্তিবিশেষ ও দুর্নীতি দমন কমিশন আদালতের দ্বারস্থ হতে পারত, কিন্তু বিএনপির সাবেক বিদ্যুৎমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ কেউ সে পথে যাননি। জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে সরকারবিরোধী নানা কথা, নানা অভিযোগ আনছেন। কিন্তু তাতে দেশের মানুষ প্রভাবিত হচ্ছে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস দুর্র্নীতির মামলায় অভিযুক্ত এবং বোমাবর্ষণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনেক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জনশ্রুতি রয়েছে, সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় তিনি জামিনে নিরাপদেই রয়েছেন। অতি সম্প্রতি অসম্ভব রকম সোচ্চার হয়েছেন তিনি। সরকারের পতনঘণ্টা বেজে গেছে মনে করেই সম্ভবত তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, লোডশেডিং সরকারের পতন ঘটাবে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ইকবাল হাসান টুকু। তিনিও প্রকাশ্যে সদম্ভে বলেছেন, লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে শিগগিরই সরকারের পতন ঘটবে। রাজনীতিতে মৃদুভাষী সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, চিন্তাচেতনার ধারক হিসেবে সমাদৃত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনিও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে লোডশেডিং দিয়ে সরকারের পতন ঘটার কথা বলেছেন! অথচ গোটা বিশ্বের জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ অধিকাংশ পণ্যের সরবরাহ স্বল্পতা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিজনিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নেননি তারা।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রতিদিনই লোডশেডিং হয়েছে। দিনে সাত-আট ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থেকেছে বিভিন্ন এলাকা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বিদ্যুৎহীনতা নিয়ে দেশের মানুষের চরম তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সহনীয়ই নয়, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে একটা উন্নত অবস্থায় নিয়ে এসেছে সরকার। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির শিকার আরো অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশ। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে না দেশের মানুষ। সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তারা মাঠে নামেননি।
দীর্ঘ সময়েও সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত করতে পারছে না বিএনপি। সরকারি দল, বিশেষ করে ছাত্রলীগ, নব্য আওয়ামী লীগারদের দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারে অতিষ্ঠ মানুষ। তাদের নির্যাতন, প্রশাসনকে ব্যবহার করে লাগাতার দুরাচারের বিরুদ্ধে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের তেমন কোনো ভূমিকাই নেই। শিক্ষাব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে, সামাজিকভাবে মানুষ অসহায় অবস্থায় আছে। বিএনপি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। দাঁড়ায়নি ভয়াবহ বন্যাদুর্গত মানুষদের পাশেও। সীমিতভাবে কিছু এলাকায় কিছু লোক এগিয়ে এলেও ঢাকায় বসে বড় বড় কথা বলেন, জনদরদি সাজেন যে নেতারা তাদের স্বল্পসংখ্যককেই দেখা গেছে সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বন্যা ও ভাঙনপীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে।
পদ্মা সেতু নিয়ে বড় রকমের রাজনীতি চলছে। এ রাজনীতিতে চরমভাবে হেরে গেছে বিএনপি। পর্যুদস্ত হয়েছে বিশ্ব মোড়লও। দুর্নীতির অভিযোগ আনতে গিয়ে বিএনপি নেতৃত্বের যোগ্যতা, শিক্ষা, দূরদর্শিতা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে, নির্বাচনে পড়বেই। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে অভিযোগ করলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যয় ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা, কী করে তা ৩০ হাজার কোটি টাকা হলো? কোথায় গেল এই বিপুল অর্থ? ঢাকায় বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ আরো অনেকেই দুর্নীতির গন্ধ খুঁজে পেয়ে একই সুরে কথা বলেছেন। প্রচণ্ড অসন্তোষ, ক্ষোভ প্রকাশ করে এসবের জবাব এসেছে পদ্মা সেতু নির্মাণ-সংক্রান্ত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত জাতীয় পরামর্শ কমিটির প্রধান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. বসুনিয়ার কণ্ঠে। সরল-সহজ প্রকৃতির খ্যাতিমান শিক্ষক বলেই ফেললেন, যারা এসব কথা বলছেন তারা মূর্খ, অর্ধশিক্ষিত।
সরকারের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করে তাদের নিয়ে রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার মতো অনেক ইস্যু ছিল, এখনো আছেও বিএনপির হাতে। কিন্তু বিএনপি তা ব্যবহার করতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে তারা জনগণের সাথে অধিকতর সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেছে। নির্বাচনে সরকারি দলের ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশাসন ব্যবহার, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাবলি পুঁজি করে তারা সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে পারত। লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, সিন্ডিকেট ভাঙতে শোচনীয় ব্যর্থতা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সরকারবিরোধী আন্দোলনের অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দলীয় নেত্রীর মুক্তির জন্যই আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি, সেখানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত, সর্বাত্মকভাবে রাজপথে নামবে, তা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ।