বিএনপির ভবিষ্যৎ কী?

বিশেষ প্রতিনিধি : কোন পথে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্ত মিলবে-একক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না দলটি। প্রশ্নবিদ্ধ দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার মায়ের মুক্তি চান কি না, দুর্বোধ্য ঠেকছে তাদের কাছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তেও পেকেছে গোলমাল। গোটা বিষয়টি সরকারের জন্য স্বস্তির। খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং গোটা বিএনপিকে নিয়ে অনেকটা রিলাক্সে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। খালেদা জিয়ার বয়স ও শারীরিক অবস্থা, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ব্যবহার এবং মিথ্যা মামলার ফিরিস্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তদবির চালানোর একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিএনপিতে। কিন্তু এর বিরোধিতা আসে তারেক রহমানের কাছ থেকে। এর রহস্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে দলের ভেতরে। প্রায় আড়াই বছর ধরে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে মামলা ৩৬টি। তিনি জামিনে আছেন ৩৪টিতে। অসুস্থতার কারণে ১ এপ্রিল থেকে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে।

দল এবং আইনজীবীদের বরাতে বলা হয়েছিল, তার মুক্তি সময়ের ব্যাপার মাত্র। আইনজ্ঞসহ অনেকেই মত দিয়েছিলেন, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই তাকে বের আনা সম্ভব হবে। আর নির্বাচনে অবশ্যই খালেদা জিয়া একাটি বড় ইস্যু ছিলেন। কিন্তু সেটা মাঠে মারা গেছে। সরকারের ভূমিকা খালেদার জন্য আশাপ্রদ নয়। তার মুক্তি পাওয়া, না-পাওয়া নির্ভর করছে সরকারের মর্জির ওপর। সরকার চাইলে খালেদা জিয়াকে জীবনভর জেলে রেখে পচিয়ে-গলিয়ে শেষ করতে পারবেÑতা দলের যে কেউ উপলব্ধি করতে পারছে। সেক্ষেত্রে বিএনপির কাছে হাতিয়ার মাত্র দুটি। আন্দোলন এবং বিদেশি চাপ। অথচ লন্ডন থেকেও কোনো নির্দেশনা আসছে না। কৌশল সুনির্দিষ্ট না করে কেবল দল সংগঠিত করার নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে বারণও করা হচ্ছে।
অন্যান্য ছোটখাটো বিষয়ে লন্ডন থেকে হুটহাট নোট এবং নির্দেশ এলেও মায়ের মুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সংকেত আসছে না তারেক রহমানের কাছ থেকে। এর ফলে এলোমেলো কথাবার্তার সঙ্গে বিক্ষিপ্ত-সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে দলটিকে।

দলের এ দশায় খালেদা জিয়ার কারাবাসে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক ও বিশ্লেষণে মাত্রা জোগান দিচ্ছেন কেউ কেউ। দলের সব সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের কাছ থেকে আসছে এমনও নয়। কারাগার থেকে পাঠানো খালেদা জিয়ার নির্দেশ পালিত হচ্ছে। কার্যকর হচ্ছে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা পল্টন অফিসের কান্ডারি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সিদ্ধান্তও। ড. মোশাররফ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর রায়রাও ফেলনা নন। তাদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন দেখছেন অনেকে। খালেদার কারাবাস ও তারেকের লন্ডনবাস তাই দলের কারো জন্য বেশ লাভজনক। তারেক রহমান দেশে এবং খালেদা জিয়া মুক্ত থাকলে এমন সুবর্ণ সুযোগ তারা পেতেন না। সুবিধাভোগীরা অর্থসম্পদ রক্ষায় সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে চলছেন। বাকিরা ভুগছেন সিদ্ধান্তহীনতায়।

খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তার নিজের দেশান্তরি দীর্ঘায়িত হলে বিএনপির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, সেই ভাবনার সুযোগ দিচ্ছেন না তারেক রহমান। সামনে খালেদা জিয়াকে আরো অনেক মামলাই তাড়া করতে পারে। মামলার যে সংখ্যা, তাতে এগুলো নিষ্পত্তি হতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে। তার ওপর রাজনৈতিক প্রেক্ষিত পাল্টে গেছে। রাজনৈতিক রাষ্ট্র চলে গেছে প্রশাসনিক রাষ্ট্রের দিকে। আওয়ামী লীগ গোটা সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনকে সঙ্গী করে এগোচ্ছে। সুফলও পাচ্ছে। এক-এগারোর সময় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের ঘটনাকে মানুষ দেখেছে রাজনৈতিক নেতাদের আটক হিসেবে কিন্তু এবার খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সরকার দক্ষতার সঙ্গে সেটা হতে দেয়নি। ক্ষমতাসীনদের জন্য এটি বাড়তি সাফল্য এবং নির্ভার থাকার মূল রহস্য।