বিএনপির ১৫ দিনের মরণখেলা

নিজস্ব প্রতিনিধি : সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলমান রাখলেও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে কি না, হলেও তা সব দলের অংশগ্রহণে সর্বজনীন হবে, নাকি বিগত দুই সংসদ নির্বাচনের মতো কৌশলে সরকারি দলের বিজয় নিশ্চিত করা হবে-এসব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটানো হয় কি না, সে প্রশ্নও ইদানীং বড় হয়ে আসছে। প্রতিবেশী ভারত ও বিশ্বমোড়ল সরকারি ভাষ্যানুযায়ী তাদের পক্ষে অবস্থান নিলেও তাদের মনোভাবে তার প্রতিফলন এখনো ঘটছে না। ভবিষ্যতে তাদের ভূমিকা কতটা সরকারের পক্ষে থাকে, সে সংশয়ও দেখা দিচ্ছে।
নির্বাচন বর্জন করার পূর্ব ঘোষণায় অটল রয়েছে বিএনপি। তারা নির্বাচন প্রতিহত করার কথাও বলছে। তাদের প্রধান সহযোগী জামায়াতে ইসলামী রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয়, নীরব রয়েছে। তাদের নির্লিপ্ততা দৃশ্যমানভাবে দেখা গেলেও ভেতরের চিত্র ভিন্ন। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য সর্বাত্মক তৎপরতাও চালাচ্ছে। তবে তা দৃশ্যমানভাবে নয়। নির্দিষ্টসংখ্যক নেতাকর্মীর মাধ্যমে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন প্রতিহত করার ব্যাপারে জামায়াত-বিএনপি পারস্পরিক বোঝাপড়া গভীরতর হয়েছে। সরকার বাস্তবভিত্তিক সমঝোতায় এসে গ্রহণযোগ্য ছাড় দিলে জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করতে বিএনপির অন্যতম সহযোগী হওয়ার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে নির্বাচনমুখী হবে।
ঈদের পর নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি দেওয়ার কথা বিএনপির। তারা এখনো তা না করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে রয়েছে। বিএনপির একাধিক নেতৃস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগামী মাসে তারা বৃহৎ আকারে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেবে। এই কর্মসূচিও হবে শান্তিপূর্ণ। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রামসহ অপরাপর মহানগরগুলোতে তারা অভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। সকল জেলা, উপজেলায়ও কর্মসূচি দেওয়া হবে। সব জায়গায়ই কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন যাতে তেমন একটা সৃষ্টি না হয়, সেদিকে বিশেষ সতর্ক তারা। বিএনপি এ যাবৎ ঢাকাসহ সর্বত্র শান্তিপূর্ণ অহিংস কর্মসূচি পালন করেছে। সরকার একে বিএনপির রাজনৈতিক-সাংগঠনিক দুর্বলতা বলে মনে করে আত্মতৃপ্তি লাভের প্রয়াস পেয়েছে। বিএনপির এসব কর্মকাণ্ড জনসাধারণের মনে আস্থা দিয়েছে যে তারা নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের পথে যাচ্ছে না। অগ্নিসন্ত্রাস, বোমাবাজির পুরোনো ঘটনাবলি টেনে সরকারি মহল বিএনপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে বলেও মনে হয় না। দৃশ্যমানভাবে সন্ত্রাস, বোমাবাজি, নৈরাজ্যবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মসূচি এ যাবৎ পালন করলেও বিএনপির শেষ খেলাটা হবে ভিন্নতর। তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকেই কিংবা আগেই বিএনপি তার সহযোগীদের নিয়ে রাজপথে নবরূপে আবির্ভূত হবে। তারা লাগাতার দুই সপ্তাহ হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি দেবে। রাজপথ-রেলপথ-নৌপথ অবরোধ করবে। চট্টগ্রাম, খুলনা, কক্সবাজার, পায়রা সমুদ্রবন্দর, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর অচল করে দেওয়া হবে। সারা দেশ থেকে কর্মীদের সংগঠিত করে পরিকল্পিতভাবে তাদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়োজিত করা হবে। এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, যাতে গোটা দেশ অচল হয়ে পড়ে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। ভয়ংকর উদ্বেগজনক হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হলে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ের মতো নতুন নূর হোসেনের সৃষ্টি করাও হতে পারে। অর্থাৎ পরিণতি যা-ই হোক, বিএনপি চূড়ান্ত আঘাত হানবে। অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপও যদি ঘটে, তারা ক্ষান্ত হবে না। বিএনপি মনে করে, সরকার ও সরকারি দলের দুঃশাসন, অত্যাচার, নির্যাতনে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত, নিগৃহীত। বিএনপির আরো অভিযোগ, নির্বাচন সামনে রেখে তাদের মাঠের সক্রিয় নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার, বাড়ি বাড়ি হানা দেওয়া হচ্ছে। তাদের ভাষায় পুরোনো সাজানো মামলায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের খোঁজা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে। মাদক মামলায় আসামি করে অনেককে আটক করা হচ্ছে। তারা মনে করে, আগামীতে কোনোভাবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারলে বিএনপিকে অস্তিত্বহীন করে তুলবে। জাতীয় সরকার বা অন্য কোনো নামে বা অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় এলেও বিএনপি-জামায়াতের নতুন ক্ষতির কিছু নেই। কিছুদিন বেঁচে থাকার মতো শ্বাস তো অন্তত নিতে পারবে। বর্তমান সরকারের মতো বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া করবে না। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও বর্তমানের দুর্বিষহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়াকেই মুখ্য করে দেখছেন বিএনপির অনেকেই। অনাকাক্সিক্ষত এই প্রক্রিয়াকে দেশি-বিদেশি কোনো কোনো প্রভাবশালী শক্তি উৎসাহিত করছে কি না তা-ও পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ।