বিএনপি অসহায় আত্মসমর্পণ করবে, নাকি জয়মাল্য পরবে

নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশের এবং বিদেশেরও কোনো কোনো মহল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। সরকার, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংঘাতময় রাজনৈতিক অবস্থান দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলকেই একটা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি করেছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণকারী রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মহল শঙ্কিত নন। তাদের মতে, আশঙ্কা, সংশয়, শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অতীতের সংঘাতের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা ঘিরে একটা শান্তিপূর্ণ গ্রহণযোগ্য সমাধান হয়ে যাবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, তাদের এই আশাবাদী হওয়ার পেছনে যুক্তিও রয়েছে। প্রধান বিষয়টি হচ্ছে, পরস্পর বিরোধী অবস্থানে থাকা দুই দল ও তাদের সহযোগীদের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম চালাতে বাধ্য করছে।
বিএনপি ও তার সহযোগীরা বর্তমানে শান্তিপূর্ণ নানা কর্মসূচি পালন করছে। প্রশ্ন হলো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে তারা কি সরকারের পতন ঘটাতে পারবে, নাকি তাদের দাবিকৃত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক সমর্থন কুড়াতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তা বহাল থাকে কি না পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের যোগাযোগ এবং মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে খোলাখুলিই বলেছেন, যে দেশের নির্বাচন নিয়ে নিজ দেশেই প্রশ্ন উঠেছে, তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, সে দেশের অন্য দেশের নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার নেই। বিশ্ব মোড়ল বলে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এমন বৈরী মন্তব্য করা বাংলাদেশের নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচায়ক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অপর কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রকাশ্য বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তাদের জেনেভা কনভেনশন মেনে চলার পরামর্শ দেন। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের এতটা সাহসী ভূমিকা রাখার শক্তি জোগাচ্ছে কে। বাংলাদেশের এই ভূমিকায় ভেতরে ভেতরে অনেক দেশই সমর্থন করছে।
কূটনৈতিক মহল মনে করেন, বাংলাদেশের পেছনে প্রধানত শক্তি জোগাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ চীন। বাংলাদেশের গার্মেন্ট রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক আরো কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকা এবং সম্ভাব্য প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সরকার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বকে অসন্তুষ্ট রেখে এগোতে চায় না আওয়ামী লীগ। সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই অধিকাংশ দলের অংশগ্রহণে, বিশেষ করে ভোটার সাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চায় সরকার। রাতে ব্যালট বাক্স ভরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পুনরাবৃত্তিতে যাবে না সরকারি মহল। বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় সরকার, সরকারি দল ও তাদের সহযোগীরা। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। অতীতের ভুল তারা আর করবে না। নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ভালো রেজাল্ট করবে এবং তা সরকারি মহলের কাছে অভাবিত হলেও বিস্ময়ের হবে না। সরকারের তিন মেয়াদে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হলেও জনজীবনের দুর্ভোগ সর্বকালীন রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে, এই নির্মমতাও অস্বীকার করা যাবে না। ভোটের সুযোগে দেশের মানুষ কোন পথ বেছে নেয়, তা বলা যায় না। তেমন কিছুর আশা প্রবলভাবেই করছে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় অংশ।
সম্ভাব্য যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিএনপি শান্তিপূর্ণ অহিংস কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। তারা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মানববন্ধন করবে। রাজধানীসহ সব বিভাগীয় শহরে এক থেকে তিন দিনের লাগাতার অনশন ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুত রয়েছে। কোনো রকম চরম কর্মসূচি নেওয়া থেকে তারা বিরত থাকবে, যাতে সরকার ও সরকারি দল আক্রমণ চালানোর সুযোগ না পায়। পাশাপাশি সরকারও এমন কিছু পদক্ষেপ নেবে, যাতে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, নিলেও তাতে জনমত পক্ষে টানতে না পারে। বিদেশিরাও প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পায়। বিএনপির অন্যতম সহযোগী জামায়াত, নেজামে ইসলাম, হেফাজত রাজপথ ছেড়ে নির্বাচনে শরিক হলেও বিস্ময়ের হবে না। সরকারি দল ও সরকারের সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে সুপরিকল্পিতভাবেই এগিয়ে নিচ্ছেন তাদের কর্মপরিকল্পনা। অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া বিএনপির সামনে তখন আর কি পথ থাকবে!