বিএনপি আন্দোলনে যে কৌশলে সফল

নূরুল ইসলাম : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার বেশ সতর্ক বিএনপি। দলটি মনে করছে, এবার জোটবদ্ধ আন্দোলন নয়, আন্দোলন হবে নিজস্ব শক্তিতে। এবার বিএনপি একলা চলো নীতি গ্রহণ করে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করে প্রয়োজন হলে অন্যের শক্তি গ্রহণ করবে। জোটে থাকা কিংবা সরকারবিরোধী যারা রয়েছে, তাদের নিজস্ব শক্তি প্রমাণের জন্য আলাদাভাবে মঞ্চ তৈরি করতে বার্তা দিয়েছে বিএনপি। সব দলকে নিয়ে একক মঞ্চ থেকে এবার আর অতীতের মতো আন্দোলন করা হবে না। বিএনপির এই কৌশল যে দারুণ কাজে লেগেছে, তার প্রমাণ দলটির বিভাগীয় সমাবেশগুলো।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি নয়টি বিভাগে গণসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয় গণসমাবেশ। ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ, ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর ও ১৯ নভেম্বর সিলেটে সফল গণসমাবেশ করেছে দলটি। ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী ও ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ করা হবে। এর আগে প্রথম ধাপে ২২ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। প্রতিটি সমাবেশে আগে থেকেই গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল। পথে পথে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাধার মধ্যেও বাঁধ ভেঙে জনস্রোত তৈরি হয়। ওই সমাবেশগুলোতে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা মঞ্চে উঠতে চাইলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকে কাউকে ওঠানো হয়নি। এ পর্যন্ত বিএনপি এককভাবে সমাবেশ বাস্তবায়ন করে বিরাট সফল বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মতে, একক মঞ্চের আন্দোলন করায় বর্তমানে চাঙা দলটি। পথে পথে বাধা, হামলা আর গাড়ি সংকটের মধ্যেও বিভাগীয় শোডাউনের পর উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে ফিরে এসেছে আস্থা। এক যুগ ধরে হামলা-মামলা, কারাবরণ, পলাতক থাকা নেতাকর্মীরাও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। বিএনপির নেতারা উপলব্ধি করছেন, অতীতে এক মঞ্চে থেকে জোটবদ্ধ আন্দোলন করে লাভ তো হয়ইনি, উল্টো ক্ষতি হয়েছে ঢের। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তাই দলটি এবার কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮টি দল নিয়ে প্রথমে জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর আরও দুটি দলের সমন্বয়ে ২০ দলীয় জোট গঠন করা হয়। দীর্ঘ সময় কয়েকটি নিয়মতান্ত্রিক বৈঠক ছাড়া তেমন কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। শুধু জোটটিতে সব সময় আলোচনায় ছিল জামায়াতে ইসলামী। ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে শুধু জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতাকর্মী দিয়ে বিএনপিকে সাহায্য করেছে বলে অনেকে বলছেন। এ ছাড়া অন্যান্য দল থেকে বিএনপি তেমন সাড়া পায়নি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে কার্যকর কোনো গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি এই জোট। আলোচিত ওই নির্বাচনের আগে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। দাবি না মানলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার জোটের দাবি না মেনে একতরফা নির্বাচন করে। সে নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের ১৫৪ জন নির্বাচিত হন। আর আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়ে বিএনপি।
পরবর্তীকালে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ কয়েকটি দল মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেও সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জেসএসডির আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী থেকে গরম কিছু বক্তব্য ছাড়া কিছুই মেলেনি। এ ছাড়া সুলতান মনসুরের মুজিব কোর্ট বুকে নৌকা হাতে ধানের শীষের দ্বিমুখী চরিত্রের কারণে বিএনপির একটি অংশও ঐক্যফ্রন্ট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিএনপির আন্দোলনের মঞ্চ থেকে ড. কামাল হোসেন ও সুলতান মনসুর বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্লোগান তোলায় ওই সময় মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। বেলা শেষে নজিরবিহীন ভরাডুবি ঘটে। মাত্র ছয়টি আসন ভাগ্যে জুটে বিএনপির।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এবার আমাদের আন্দোলন জোটবদ্ধ নয়, আন্দোলন হবে যুগপৎ। যারা আমাদের দাবির সঙ্গে একমত হবে, তাদের নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলব। এ আন্দোলন হবে পৃথকভাবে, এক মঞ্চে নয়। অনেকটা স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মতো। যেমনটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট, বাম রাজনৈতিক দলগুলো একই আন্দোলন যুগপৎভাবে করেছিল। এ ছাড়া বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগ যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে, সেভাবে। চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার আগে নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে। তারপর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা হবে।