বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে ৫০ হাজার মামলা হয়েছে

রাজনীতি ডেস্ক : স্টাফ রিপোর্টার ২০০৭ সাল থেকে’ ১৮ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে সারা দেশে ৫০ হাজার ৭৪টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪৯ জনকে। এসব মামলায় ৩ হাজার ৯৪৭ নেতাকর্মী এখনও কারাগারে রয়েছেন। গত ২৫ জানুয়ারি বিএনপির এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার এসব তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়ার বিষয়টি সরকার আগেই ঠিক করে রেখেছে। দেশে যে আইনের শাসন নেই, ন্যায়বিচার সুদূরপরাহত সেটাই প্রমাণিত হচ্ছে। বিচার হবেÑ প্রধানমন্ত্রী যা চাইবেন তাই। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অল্প কিছুদিনের মধ্যে জেলে যেতে হবে বলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আদালত অবমাননার শামিল। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল বলেন, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির ২২ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে সাতটি বিভাগে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫২৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ২৪ হাজার ৭০৭ জন। গ্রেফতারের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৯ জন। গুম হয়েছেন একজন, খুন হয়েছেন একজন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এখন পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা হয়েছে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২১টি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৮৮টি মামলা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে তিনটি, মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে ৯টি, তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১৪টি, প্রয়াত এম কে আনোয়ারের বিরুদ্ধে ৩৪টি, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৫২টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৩৭টি, নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে সাতটি, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৯টি, সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা করা হয়েছে এবং মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ২৪ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে মোট ২৯৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশি মামলা হয়েছে আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে মোট ৯৬টি মামলা হয়েছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদের ২১ নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩০৮টি। ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে বেশি মামলা হয়েছে বরকত উল্লাহ বুলুর বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ৬১ মামলা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরে ৫৪টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ মোট আটজন যুগ্ম মহাসচিবের বিরুদ্ধে ২৭৭টি মামলা হয়েছে। যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২৯টি মামলা হয়েছে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে।
পাঁচজন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৭ জন সম্পাদকের বিরুদ্ধে মোট ৩৩৩টি মামলা হয়েছে। ১২ সহসম্পাদকের বিরুদ্ধে ১৪৩টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির ১৩৪ জন সদস্যের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার হাজিরার দিন গুলশান থেকে বকশিবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় একই দিনে চার-পাঁচটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে নেতাকর্মীরা ‘সুশৃঙ্খলভাবে’ থাকে এবং এসব মামলার কোনো ভিত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, যিনি সরকারের বিশেষ দূতÑ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হবে। তাহলে দেশনেত্রীর মামলার রায় কি পূর্বনির্ধারিত? এই অবৈধ সরকার পূর্বেই রায় লিখে রেখেছে। তাহলে এই বিচারের প্রহসনের তো কোন প্রয়োজন ছিল না। সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান, তিনবার নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ২৪টি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। তার মধ্যে দুইটি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সপ্তাহে তিন দিন দেশনেত্রীকে আদালতে হাজির হওয়ার নজিরবিহীন নির্যাতন, তারিখে তারিখে জামিন দেয়ার নজিরবিহীন আদেশÑ সমগ্র বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এটা এখন স্পষ্ট- নজিরবিহীন দ্রুততার সঙ্গে মামলা শেষ করার প্রচেষ্টা প্রমাণ করে এই সরকার বেগম জিয়াকে ভয় পায়। ভয় পায় বলেই তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। সরকারের এহেন প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের সমান্তরাল মাঠ হতে পারে না। নির্বাচন করতে হলে, অবশ্যই মাঠকে সমান্তরাল করতে হবে। বিরোধীদলের সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। অবিলম্বে গ্রেফতার ক্রসফায়ার, হত্যা-গুম বন্ধ করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয় বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের হিসাব সংবলিত কাগজে দলের পক্ষ থেকে কিছু বিষয়কে ‘রহস্যময়’ ও ‘অবিশ্বাস্য’। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে একই দিনে বিভিন্ন থানায় ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব মামলায় একই ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একই আসামি উত্তরা থানা এলাকা থেকে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে গিয়ে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করেছে। আবার ওই ব্যক্তিই আধ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলী, মিরপুর এলাকায় গিয়ে অপরাধ সংগঠিত করেছে। এসব মামলার এজাহার পড়ে মামলাগুলোকে ‘কাল্পনিক’ বলে মনে করছে বিএনপি। এ পর্যন্ত বিএনপির ২৩ হাজার নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অজ্ঞাত আসামির নাম দিয়ে পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য চলছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল।
সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুল হাই, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।