বিজেপি ও মোদির চিন্তার কারণ হবেন প্রিয়াঙ্কা

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি খোঁচা মেরে বলেছিলেন ‘কংগ্রেস ১২৪ বছরের প্রাচীন দল’। ওই সময় সাংবাদিকরা এর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমি কি দেখতে বৃদ্ধা?’ এরপর মোদি অভিভাবকসুলভ খোঁচা মেরে বলেছিলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা আমার মেয়ের মতো।’ প্রিয়াঙ্কা তখন চটে গিয়ে বলেছিলেন, ‘কোনো ব্যক্তির আমার বাবা হওয়ার দরকার নেই। আমি আমার বাবাকে অনেক ভালোবাসি।’ বিশ্লেষকদের মতে, সেই দিনই বোঝা গিয়েছিল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর শক্তি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। পাঁচ বছর পর সেই প্রিয়াঙ্কা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় ক্ষমতাসীন বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্বেগের কারণ হতে যাচ্ছেন।

গকাল ভারতের জনপ্রিয় গণমাধ্যম এনডিটিভির ওয়েবসাইটে লেখা এক কলামে এই মতামত তুলে ধরেছেন দিল্লিভিত্তিক প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক আশুতোষ। তিনি বলেছেন, চারটি কারণে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মোদির কপালে ভাঁজ ফেলতে যাচ্ছেন। শুধু এনডিটিভিই নয়, গত ২৩ জানুয়ারি প্রিয়াঙ্কাকে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক করার খবরে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমেই বলা হচ্ছে, তিনিই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী ইন্ধিরা গান্ধী। গত ২৪ জানুয়ারি ভারতের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিশাল কাভারেজ পেয়েছে প্রিয়াঙ্কার কংগ্রেসে যোগদানের খবরটি।

আশুতোষ লিখেছেন, ‘২০১৪ সালে মোদির দায়িত্ব গ্রহণের মতোই প্রিয়াঙ্কার যোগদানও কি ভারতের রাজনীতির বড় মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হয়ে থাকবে? এর ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। তবে আমি বিশ্বাস করি, এটি চলতি বছরে অনুষ্ঠিতব্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য মোড় পরিবর্তনকারী (টার্নিং পয়েন্ট) হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিনি (প্রিয়াঙ্কা) রাজনীতিতে অতিথি ভ‚মিকা পালন করেছেন। কিন্তু তিনি হতে যাচ্ছেন কংগ্রেসের মুখ্য চালিকাশক্তি (প্রিন্সিপাল অ্যাক্টর)।’

আশুতোষ মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের পুরো আখ্যানই বদলে যাবে। এ মুহূর্তে প্রিয়াঙ্কাকে উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে কংগ্রেসের রাজনীতিতে এসেছিলেন তার বাবা রাজীব গান্ধী ও ভাই রাহুল গান্ধী। প্রিয়াঙ্কার ক্ষেত্রে এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি ওই উত্তর প্রদেশের ওই গÐিতেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখবেন। তিনি বরং কংগ্রেসের রাজনীতে বিরাট প্রভাব রাখতে যাচ্ছেন এবং তার কাছেই ‘সর্ব ভারতীয় প্রচারাভিযানের’ দাবি উঠতে পারে।

রাজীব গান্ধী যখন মারা যান, তখন সাংবাদিক আশুতোষ ছিলেন তরুণ প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘অন্য অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মতো আমিও অপেক্ষায় ছিলাম যে নেহরু গান্ধী পরিবারেরই কেউ কংগ্রেসের দায়িত্ব নেবে। তখন সোনিয়াকে সেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তখন তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর নরসিমা রাও যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন কংগ্রেসের আরেক প্রবীণ নেতা অর্জুন সিংহ আমাকে (লেখক আশুতোষ) বলেছিলেন, প্রিয়াঙ্কা হবে গান্ধী পরিবারের পরবর্তী আচ্ছাদন।’ তার মতে, রাহুল অতি ভদ্র; কিন্তু প্রিয়াঙ্কার রয়েছে রাজনৈতিক পুটতা, যা তার দাদির মধ্যে ছিল।’ লেখক বলেন, আমি তখন অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু অর্জুন সিং ছিলেন গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ। সুতরাং তার মন্তব্য এড়িয়ে যাওয়া কঠিনই ছিল।

আশুতোষ বলেন, রাজনীতিতে প্রিয়াঙ্কার সেই শক্তির জায়গা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখা গেল ২০১৪ সালের নির্বাচনে। যদিও তিনি তখন ছিলেন অতিথি ভ‚মিকায়। কারণ ওই সময় ক্যারিসমেটিক নেতা নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসকে সেকেলে এবং প্রিয়াঙ্কাকে মেয়ে বলে উচিত জবাব পেয়েছিলেন।

লেখকের মতে, যে অবস্থায় ২০১৪ সালে কংগ্রেসের পক্ষে উত্তর প্রদেশে প্রচার চালিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা, সেই কংগ্রেস আর নেই। এখন প্রয়াত কংগ্রেস নেতা অর্জুন সিংহের কিছু ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতাও তিনি খুঁজে পান।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র যে মুহূর্তে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন, তা হচ্ছে কংগ্রেসের অস্তিত্ব সংকট থেকে বের হয়ে আসার সময়। দলটি মাত্রই কিছুদিন আগে মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে বিধানসভার নির্বাচনে জয়লাভ করেছে, যা বিজেপির ঘাঁটি বলে বিবেচিত। এ ছাড়া রাহুল গান্ধীও আর ‘পাপ্পু (হাবাগোবা) নেই। মোদি এখন অনেক বেশি রক্ষণাত্মক এবং তার জনপ্রিয়তাও দিন দিন কমছে।

আশুতোষের মতে, প্রিয়াঙ্কা হতে যাচ্ছেন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ (অ্যাসেট)। তাই চারটি কারণে তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্বেগের কারণ হতে যাচ্ছেন।

১. প্রিয়াঙ্কার প্রকৃত কারিশমা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেসকর্মীদের সুরক্ষা দিয়ে আসছেন এবং তারাও ব্যাপক মাত্রায় তার প্রতি কৌত‚হলী। নির্বাচনকে সামনে রেখে তার উপস্থিতি কংগ্রেসের ভোট বাড়াবে এবং যারা রাহুলের কারণে দ্বিধাগ্রস্ত, তারাও এবার কংগ্রেসের দিকে তাকাবে।

২. প্রিয়াঙ্কা তার ভাই ও দলের সভাপতির কাছে বিশ্বস্ত। তাই সব সময় তিনি তার ভাইকে সৎপরামর্শই দেবেন।

৩. ভারত এখনো প্রধানত গ্রাম্য সমাজেই রয়েছে। আর গ্রাম্য সামাজেই সাবেক ক্যারিসমেটিক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভক্তকুল বেশি। এখনো গ্রামের মানুষ ‘ইন্দিরা আম্মা’ বলেই ডাকে। দাদীর বৈশিষ্ট্যগুণের কারণে সেই ভোট এবার টানবেন প্রিয়াঙ্কা।

৪. সর্বশেষ গুণটি হচ্ছে প্রিয়াঙ্কা অনেক স্মার্ট। ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সমর্থনের কারণে গত নির্বাচনে ভ‚মিধস বিজয় পেয়েছিল বিজেপি। এবার সেই সমর্থন নেই। ধারণা করা হচ্ছে, প্রিয়াঙ্কার যোগদানের মধ্য দিয়ে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে টানতে পারবে কংগ্রেস। লেখকের মতে, প্রিয়াঙ্কার যোগদানের মধ্য দিয়ে দুই ভাই-বোনের ক্ষমতার লড়াই নিয়ে যারা সন্দেহ করবে, তারা ভুল করবে।

গান্ধীর পরিবারের তরুণ সদস্য প্রিয়াঙ্কার দীর্ঘপ্রতীক্ষিত রাজনৈতিক অভিষেক ঘটেছে। নির্বাচনের কয়েক মাস হাতে রেখে তার এই যোগদানকে দলের সদস্যরা স্বাগত জানিয়েছেন।