বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা সংকটে

প্রণবকান্তি দেব : স্বজন, আশা করি ভালো আছেন অথবা ভালো থাকার কিংবা প্রিয়জনকে ভালো রাখার চেষ্টায় আছেন। এখানেও একই চিত্র। মোদ্দাকথা, কোথাও মানুষ ভালো নেই। মানুষের বড়ো দুর্দিন আজ চারদিকে!
প্রিয় পাঠক, সিলেটে আছড়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কান্না। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের এক বিরাট অংশ মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর নানা দেশে সিলেটের লোকজন কর্মসূত্রে অবস্থান করলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিশেষ করে দুবাই, কাতার, বাহরাইন, সৌদিআরব, কুয়েত ও ওমানের সাথে সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। দেশের অর্থনীতির মরা গাঙে বারবার জোয়ার তুলেছেন এই লাখ লাখ প্রবাসী। নিজেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও এসব প্রবাসীর ভূমিকা আছে উল্লেখ করার মতো। কিন্তু মহামারি করোনায় পাল্টে গেছে জীবনের হিসাব-নিকাশ। অনেকেই দীর্ঘদিন পর ছুটিতে এসে আর যেতে পারছেন না কর্মস্থলে। কারো ভিসা জটিলতা, কারো টিকিট, কারো ‘কফিল’ বিড়ম্বনা, কারো অর্থ সংকট ইত্যাদি। ফলে, নানামুখী সমস্যার কবলে দুর্বিষহ দিন যাপন করছেন তারা।
সিলেটের মোগলাবাজারের বাসিন্দা ছয়েফ উদ্দিন। থাকেন বাহরাইন। কাজ করতেন একটি নির্মাণ কোম্পানিতে। গত জানুয়ারিতে ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন। মে মাসে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর যেতে পারেননি। তিনি জানান, যে বাজেট নিয়ে দেশে এসেছিলেন তা কবেই শেষ। ধার কর্য করে চলছেন এখন। কবে যেতে পারবেন, তাও জানেন না। আবার মৌলভীবাজারের মুন্সিবাজার এলাকার চঞ্চল আহমদ করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতে দেশে আসেন দুবাই থেকে। ভিসার মেয়াদ চলে যাওয়ায় ফিরতে পারছেন না এখন আর। ভিসার জন্য আবেদন করেছেন নির্ধারিত ওয়েবসাইটে। অপেক্ষা করতে বলেছে ৬০ দিন। ইতিমধ্যে ফুরিয়ে গেছে সাথে নিয়ে আসা অর্থসম্বল। তিনিও জানেন না, কবে ফিরবে তার সোনালি দিন। এভাবেই চঞ্চল আহমদ এবং ছয়েফ উদ্দিনের মতো অসংখ্য প্রবাসী পড়েছেন বহুমুখী সংকটে। কুলাউড়া, বানিয়াচং, মাধবপুর, বড়লেখা, গোয়াইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলের অনেক প্রবাসী সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে মৌসুমী ব্যবসা শুরু করেছেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে সেখানেও সুবিধা করতে পারছেন না। সিলেট সদর এলাকার বাসিন্দা ওমান ফেরত ফারুক মিয়া নগরীতে ফলের ব্যবসা করছেন। জানালেন, ‘কবে ফিরে যেতে পারব জানি না, খেয়ে পরে তো বাঁচতে হবে।’ কিন্তু দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় অনেক কিছুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না।
এদিকে করোনার প্রভাব প্রবাসীদের নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের দুটি পৃথক গবেষণায়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপ ফলাফলে আইএমও জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে আসা প্রবাসীদের ৭০ শতাংশ জীবিকাহীন। তারা অর্থসহ স্বাস্থ্যগত নানা সংকটে ভুগছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, একেকজন অভিবাসী গড়ে পরিবারের তিনজন সদস্যকে সহায়তা করে থাকেন। এ সংকটের ফলে, দেশের রেমিট্যান্স নির্ভর জনগোষ্ঠির উপর যথেষ্ট বিরুপ প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বিদেশ ফেরত এসব প্রবাসী নানাভাবে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। কেউ বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে, কেউ আত্মীয়-স্বজন, কেউ স্থানীয় ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থা, কেউবা আবার স্থানীয় সুদের কারবারির কাছে হাত পাতছেন। অপরদিকে, ব্র্যাকের জরিপ প্রতিবেদনেও প্রবাসীদের সংকটময় জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ব্র্যাকের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, ইতালিসহ অন্যান্য দেশ থেকে ফেরত অভিবাসীরাও এসব সংকটের আওতায় রয়েছেন। তবে সরকার ইতিমধ্যে বিদেশ ফেরতদের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।
বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ এবং সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রবাসীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রয়েছে যারা করোনাকালীন এ সংকটময় মুহুর্তে হতাশায় দিন যাপন করছেন। এরা না-পারছেন দেশে কিছু করতে, না-পারছেন বিদেশ ফিরে যেতে। পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পার করছেন দিন। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবেশে বাংলাদেশিদের জন্য কড়াকড়ি, বিমানের টিকিট সংকট, করোনা রিপোর্ট প্রাপ্তিতে নানা বিড়ম্বনা-প্রবাসীদের দুর্ভোগ আরো এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পাঠক বন্ধুগন, সিলেটের প্রবাসীরা সংকটে থাকলে এর প্রভাব যে গোটা দেশের অর্থনীতিতে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে বিদেশ ফেরতদের সমস্যাগুলো সমাধানে।
আজ এখানেই ইতি টানলাম। শুভ কামনা রইল সবার জন্য।