বিদ্রোহী কবিতার জীবনবৃত্তান্ত

ওয়াকিল আহমদ

সূচনা : কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় শ্রীনলিনীকান্ত সরকার কর্তৃক সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় ২২ পৌষ ১৩২৮ সন মতাবেক ৬ জানুয়ারি ১৯২২ সালে। প্রকাশমাত্র কবিতাটি এমন জনপ্রিয়তা পায় যে, ঐ সপ্তাহে বিজলীর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। ১৩২৮ সনের কার্তিক মাসে মোজাম্মেল হক কর্তৃক সম্পাদিত মাসিক ‘মোসলেম ভারতে’ও এটি প্রকাশিত হয়। তবে অনিয়মিত হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে পত্রিকাটি মুদ্রিত আকারে বের হয় ঐ বছর মাঘ মাসে। এই মাঘ মাসে মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকাতেও কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। সুতরাং বিজলীর মাধ্যমে পাঠক প্রায় তিন মাস আগেই বিদ্রোহী কবিতা পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৩২৮ সালে উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক সম্পাদিত মাসিক ‘বসুমতী’তে এটি পুনঃপ্রকাশিত হয়। বিদ্রোহী কবিতাসহ ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৯ সনের কার্তিক মাসে (অক্টোবর, ১৯২২)। বস্তুত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা ও প্রকাশের পরপরই পাঠক-প্রকাশকের মধ্যে হিড়িক পড়ে যায়, যা অন্য কোনো কবির কবিতা বা কাব্যের ক্ষেত্রে এরূপটি ঘটে নি।
বিদ্রোহী কবিতা রচনার ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ((১৮৮৯-১৯৭৩)। তিনি ঐ সময় কাজী নজরুল ইসলামের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁরা ৩/৪-সি, তালতলা লেনের দোতলা বাড়ির একটি কক্ষে একত্রে থাকতেন। মুজফ্ফর আহমদ বলেন, নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোন এক গভীর রাত্রে বিদ্রোহী কবিতাটি রচনা করেন। চিন্তা ও লেখার দ্রুত গতির সাথে তাল রেখে নজরুল দোয়াতের কালি ও কলম ব্যবহার না করে কবিতাটি পেন্সিলে লিখেছিলেন। পরদিন সকালবেলা কবি সর্বপ্রথম তাঁকেই কবিতাটি পড়ে শোনান। মুজফ্ফর আহমদ নিজের নিরুত্তাপ স্বভাববশত কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নি। ‘স্মৃতিকথা’য় তিনি লিখেছেন- ‘‘সকালে আমি যখন বিছানা ছেড়ে উঠলাম তখন নজরুল বললেন- ‘শোন, একটি কবিতা লিখেছি।’ বলেই তিনি পুরো কবিতাটি পড়লেন। আমি তার প্রথম শ্রোতা, কিন্তু নিজের স্বভাব-দোষে নিরুত্তাপ শ্রোতা।’’ (স্মৃতিকথা, পৃ. ২৩৬)
বিদ্রোহী কবিতার দ্বিতীয় শ্রোতা আফজালুল হক। তিনি শান্তিপুরের কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের পুত্র ছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘‘সামান্য বেলা হতে ‘মোসলেম ভারতে’র আফ্জালুল হক সাহেব আমাদের বাড়ীতে এলেন। নজরুল তাঁকেও কবিতাটি পড়ে শোনাল। তিনি তা শুনে খুব হৈ চৈ শুরু করে দিলেন, আর বললেন, ‘এখনই কপি করে দিন কবিতাটি, আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।’ পরম ধৈর্যের সহিত কবিতাটি কপি করে নজরুল তা আফ্জালুল সাহেবকে দিল। তিনি এই কপিটি নিয়ে চলে গেলেন।’’ (ঐ, পৃ. ২৩৭)
বিদ্রোহী কবিতার তৃতীয় শ্রোতা ছিলেন আলীপুর বোমার মামলায় দ-ভোগী, আন্দামান প্রত্যাগত অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর সহকর্মী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ দ্বারা পরিচালিত সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকার দেখা-শোনা করতেন। মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘‘…বাড়ীতে ফিরে আসি বারোটার কিছু আগে। আসামাত্রই নজরুল আমায় জানাল যে ‘অবিনাশদা’ এসেছিলেন। তিনি কবিতাটি শুনে বললেন, ‘তুমি পাগল হয়েছ নজরুল, আফ্জালের কাগজ কখন বার হবে তার স্থিরতা নেই, কপি করে দাও ‘বিজলী’তে ছেপে দিই আগে। তাঁকেও নজরুল সেই পেন্সিলের লেখা হতেই কবিতাটি কপি করে দিয়েছিল।’’ (ঐ, পৃ. ২৩৮)
অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য দেরি করেন নি, পরের সপ্তাহ ৬ জানুয়ারি ১৯২২ সালে বিজলীতে কবিতাটি প্রথম ছেপে প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘‘বিদ্রোহী প্রথম ছাপানোর সম্মান সাপ্তাহিক ‘বিজলীরই প্রাপ্য।….সাপ্তাহিক কাগজে বার হওয়ার কারণেই কবিতাটির প্রচার খুব বেশী হয়েছিল। শুনেছিলাম সেই সপ্তাহে ‘বিজলী’ দু’বারে ঊনত্রিশ হাজার ছাপা হয়েছিল। ধরতে পারা যায় প্রায় দেড়-দু’লক্ষ লোক কবিতাটি পড়েছিলেন। তার ফলে নজরুলের কবি-প্রতিষ্ঠা খুব বেশী রকম বেড়ে গেল।’’ (ঐ, পৃ. ২৩৮, ২৪১)
কি ছিল এই কবিতায় ? কবিতার বিষয়, ভাষা, ছন্দ, সুর, আবেদন- সবকিছুতে অভিনবত্ব ও স্বাতন্ত্র্য ছিল। কবিতার মূল বিষয় ‘বিদ্রোহ’। তিনি শিরোনাম ছাড়াও কবিতার অভ্যন্তরে বার চারেক ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।-
১. আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর।
২. মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত।
৩. আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন !
৪. আমি চির-বিদ্রোহী-বীর।
কবিতার সূচনা হয়েছে নাটকীয় ভাবে- ‘‘বল বীর-/ বল উন্নত মম শির!/ শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!’’ কবি তাঁর ‘বীরকে পাঠকের কাছে কেবল নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেন নি, তার স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কেও পাঠককে অবহিত করেছেন। তাঁর কল্পিত বীরের ‘শির’ শুধু উন্নত নয়, ‘চির উন্নত’। কতখানি উন্নত তা গুণান্বিত (য়ঁধষরভু) করে বলেছেন- ‘‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’/ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’/ ভূলোক, দুলোক, গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর।’’ বীরের এমন উচ্চশির দেখে হিমালয়ের মাথা নত হয়ে আসে- ‘‘শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির।’’ শেষ বাক্যে বীরের একই কণ্ঠস্বর শোনা যায়- “আমি চির-বিদ্রোহী-বীর/ আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির।” এরপর কবিতার বাকি চরণগুলিতে কবির কল্পিত বীর উত্তম পুরুষ ‘আমির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নানাভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছে। এর সবটাই বীরের স্বগতোক্তি (সড়হড়ষড়মঁব)। কবি বিদ্রোহের বার্তা, বহুবিধ রূপ ও নানামুখী কর্মের বিবরণ দিয়ে ক্ষান্ত হন নি, এর পরিসমাপ্তির কথাও বলেছেন- “যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।” সুতরাং কবিতাটি আপাদমস্তক বিদ্রোহের সুর ও ঝংকার দ্বারা ম-িত। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা করে নজরুল ইসলাম সবার চোখে ‘বিদ্রোহী কবি’ রূপে আখ্যাত হন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দশ বছর বয়স থেকে কবিতা রচনা শুরু করেন, কিন্তু ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ রচনার পূর্ব পর্যন্ত তিনি নিজের কবি-প্রতিভার দৈবীসত্তা অনুভব করেন নি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। তাঁর অনুভূতি ছিল- “না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।/ জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,/ ওরে উথলি উঠেছে বার,/ ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।” বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমে নজরুল ইসলাম এক অলৌকিক শক্তির অধিকারী কবি হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করেন। “আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়েছে সব বাঁধ।” কবি আবেগ-তাড়িত ভাবাবেশে আচ্ছন্ন থেকে এক রাত্রে কবিতাটি রচনা সম্পন্ন করেন। কালক্ষেপ হবে ভেবে তিনি কালিকলমের স্থলে পেন্সিল ব্যবহার করেছিলেন। এতে তাঁর ভাবাবেগের তীব্রতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা প্রমাণিত হয়। বিশ্বের নানা উৎস থেকে উপাদান সংগ্রহ করে কবিতার যে ডালি সাজিয়েছেন, তার জন্য পাঠাগার বা গবেষণাগারের প্রয়োজন হয় নি; কবির মনোভূমি থেকে সেসব অবলীলায় উৎসারিত হয়েছে। এ হলো ঈশ্বরপ্রদত্ত (এড়ফ-মরভঃবফ) কবি-প্রতিভার ফল, যাকে আমরা দৈবীসত্তা (ফরারহব ংঢ়রৎরঃ) বলেছি। লালন শাহ এরূপ দৈবীসত্তার প্রেরণাকে ‘পোনামাছের ঝাঁক’ বলেছেন। তাঁর মাথায় যখন এরূপ অলৌকিক তরঙ্গের উদয় হতো, তখন শিষ্যদের ডাকতেন এবং মুখে মুখে গান রচনা করে গেয়ে শোনাতেন।
ভার্জিনিয়া ।