বিভিন্ন ধর্মে নারী শিক্ষা

ইয়াসমিন নূর

স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধির দাবি অনুযায়ী নারীকে শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিত রাখার কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। কেননা, সে এমন একজন মেয়ে যে বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের সম্পত্তির অংশীদার, সে একজন স্ত্রী যে স্বামীর সম্পত্তির ও স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া মোহরানার মালিক, সে একজন মা যার ওপর সন্তানের লালন-পালনের ভার ন্যস্ত, সে একজন গৃহকর্ত্রী যার ওপর গোটা পরিবারের ভালো-মন্দ দেখাশোনার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ন্যস্ত, সর্বোপরি সে একজন মানুষ যাকে যাবতীয় কাজে পুরুষের পাশে সহযোগী হয়ে দাঁড়াতে হয়। বিশ্ব সংসারে যার কাঁধে এমনি দায়িত্বভার তার ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি পুরুষের তুলনায় কম গুরুত্ব পায় কোন যুক্তিতে? অর্থ-সম্পদের তত্ত¡াবধান, সন্তান প্রতিপালন, পরিবারের উন্নতি সাধন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরামর্শ দান, নানামুখী কর্মসম্পাদন প্রতিটি ক্ষেত্রেই তো যথার্থ জ্ঞান থাকা দরকার। এ জ্ঞান নিশ্চয়ই জন্ম সূত্রে কেউ পায় না মানুষকে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে তা অর্জন করতে হয়। আর এ জন্যই সচেতন মানুষ দ্বারা বিশ্বসমাজে গড়ে উঠেছে পর্যায়ক্রমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কেননা শিক্ষাই মানুষকে সভ্যপ্রাণীতে পরিণত করার সর্বোত্তম মানদÐ। এ কারণেই প্রতিটি ধর্মেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নর-নারী নির্বিশেষে সবাইকেই শিক্ষার্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। তবে প্রসঙ্গের আওতায় থেকে এখানে শুধু নারী শিক্ষা বিষয়ে কিছু ধর্মীয় বাণী তুলে ধরার প্রয়াস করা হলো।

এ সম্পর্কে খ্রিষ্টধর্মে বলা হয়েছেÑ ১। স্ত্রী লোকদের বিজ্ঞতা তাহাদের গৃহগাঁথে, কিন্তু অজ্ঞানতা স্বহস্তে তাহা ভাঙিয়া ফেলে।’ (বাইবেল; হিতোপদেশ; ১৪:১); ২। হীনবুদ্ধি স্ত্রী লোক কলহকারিণী, সে অবোধ কিছুই জানে না।’; (ঐ;ঐ;৯:১৩); ৩। নারী সম্পূর্ণ বশ্যতাপূর্বক মৌনভাবে শিক্ষা গ্রহণ করুক।’; (ঐ; ১তীমথিয়;২:১) বৌদ্ধধর্মে বলা হয়েছে প্রকৃতি, তুমি পুণ্যবতী, মাতঙ্গ (হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত নিম্নশ্রেণির হিন্দু সম্প্রদায়) হইলেও তুমি অভিজাত বর্গের আদর্শ হইবে। তুমি হীন জাতীয় হইলেও ব্রাহ্মণরা তোমার কাছে শিক্ষালাভ করিবে। ন্যায় ও ধর্মের পথ হইতে ভ্রষ্ট হইও না, তুমি সিংহাসন স্থারাজ মহিষীর গৌরবকে মøান করিবে।’; (বুদ্ধবাণী; নীতিকথা ও আখ্যায়িকা; ক‚পনিকটস্থ নারী) হিন্দুধর্মে তো নর-নারীর একত্রে যজ্ঞে অংশগ্রহণের প্রমাণ মেলে। যেমনÑ হে অগ্নি তুমি বলশালী, পরিণীত দম্পতি ধর্মকর্ম দ্বারা জীর্ণ হয়ে একত্রে তোমাকে প্রচুর হব্যপ্রদান করছে।’

(ঋগেবদ; ৫মÐল; ৪৫সুক্ত; ১৫ঋক) একই চিত্র দেখা যায় ঋগেবদের ১ম মÐলের ১৭৩ সূক্তের ২য় ঋকে। তা ছাড়া ঋগেবদের ৫ম মÐলের ২৮ সূক্তের ১-৬ঋকে বিশ্ববারা নামক নারীকে ঋষির কার্য সম্পাদন করতেই দেখা যায় যা তার শাস্ত্রজ্ঞ হওয়ার বা শাস্ত্রপ্রণেতা হওয়ারই প্রমাণ বহন করে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে ১। ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে।” (আল-কুরআন; সুরা-তাওবা; আয়াত-৭১) ২।

“বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?”-(ঐ; সুরা-যুমার; আয়াত-৯) বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষ হিসেবে নারীর জন্যও জ্ঞানার্জন একান্ত আবশ্যক। এ কারণেই ইসলাম প্রচারক রাসুলুল্লাহ (স) তাদের জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। এ সম্পর্কে আবু সাইদ খুদরি (র.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, এক মহিলা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (স.) আপনার বক্তব্য শোনার সুযোগ পুরুষরাই লাভ করছে। তাই আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটা দিন নির্দিষ্ট করে দিন। তিনি বললেনÑ “অমুক অমুক দিনে তোমরা সমবেত হও তারা সমবেত হলে তিনি তাদের কাছে গেলেন।” (বুখারি ও মুসলিম)

লেখক : গবেষক ও ইসলামি গ্রন্থ রচয়িতা