বিয়ের বাজারেও ইয়াবা কারবারি বরের কদর!

কক্সবাজার : মারণনেশা ইয়াবা কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে চলে আসছে। ইয়াবা পাচারকে এখানকার মানুষ অপরাধকর্ম মনে করে না। এমনও দেখা গেছে, বিয়ের ক্ষেত্রে হবু বর ট্যাবলেট ব্যবসা করেএমন তথ্য আর্থিক সচ্ছলতা বিবেচনায় কনেপক্ষের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে ফলে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা ‘পাচারকর্ম’ না হয়ে কক্সবাজারে এটি হয়ে উঠেছে অন্য সব বৈধ ব্যবসার মতোই নিরেট ‘ব্যবসা’। যেই ব্যবসায় লাভ বেশি। ফলে অঘোষিতভাবে ‘ব্যবসাটি’ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এক ধরনের স্বীকৃতি পেয়ে যায়। আরেকটি বিশেষ তথ্য হলো, টেকনাফের মানুষ কিন্তু ইয়াবা সেবন করে না।

কক্সবাজারের একাধিক আত্মস্বীকৃত ইয়াবা পাচারকারী, শিক্ষাবিদ, পুলিশ প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। আর পারিবারিক ব্যবসার বিষয়টি স্পষ্ট হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ৭৩ জন শীর্ষ পাচারকারীর তালিকায় নজর দিলে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তৈরি করা এক হাজার ১৫১ জনের তালিকায়ও একই পরিবারের একাধিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ৭৩ জনের মধ্যে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, তার ভাই, ভাগিনা, স্বজনসহ ২৬ জনের নাম রয়েছে। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর দুই সন্তান মো. রাশেদ মাহমুদ আলী ও মাহবুব মোরশেদের নাম রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার দুই ছেলে দিদার মিয়া ও মোহাম্মদ শাহজাহানের নাম যেমন রয়েছেÑ টেকনাফ ডেইলপাড়ার কালা মোহাম্মদ আলীর দুই সন্তান মো. আমিন ও নুরুল আমিনের নামও স্থান পেয়েছে। পরিবারের সবাই এই কারবারে জড়িয়ে পড়ার আরো প্রমাণ মৌলভীপাড়ার হাজী ফজল আহম্মদের দুই ছেলে মো. একরাম হোসেন ও আবদুর রহমান; বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ ও তার ভাই টেকনাফ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন তালিকাভুক্ত শীর্ষ পাচারকারী। অর্থাৎ পরিবারগতভাবেই ইয়াবা ব্যবসা চলে এখানে। আর এই ‘ব্যবসাটি’ পেয়ে গেছে সামাজিক স্বীকৃতিও। কারণ ইয়াবা তথা মাদকবিরোধী দৃশ্যমান ও সক্রিয় সামাজিক আন্দোলন নেই কক্সবাজারের সমাজব্যবস্থায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার মতো জেলা পুলিশের তালিকা পর্যালোচনা করেও এই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে বাবা ও সন্তানসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম রয়েছে ইয়াবা পাচারকারীর তালিকায়।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর অনেকে নিজেদের নির্দোষও দাবি করেছে। যেমন সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর ছেলে মাহবুব মোরশেদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে বিরোধের কারণেই প্রতিপক্ষরা কৌশলে ইয়াবা পাচারকারীর তালিকায় তারা দুই ভাইয়ের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে।

ইয়াবা কারবারকে ‘পাচারকর্ম’ মনে না করে এই ‘ট্যাবলেট ব্যবসা’ শুরুর কথা জানিয়েছেন আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি, টেকনাফের বাসিন্দা জাফর আহমদ ও আলী আহমদ। তারা বলেছেন, ‘অন্যরা যখন ট্যাবলেট (ইয়াবা) ব্যবসা করে কোটিপতি হচ্ছিল স্বল্পসময়ের মধ্যে, তখন আমরাও সেই ব্যবসায় জড়িত হই। ইয়াবা মারণনেশা এবং এটি অবৈধ, সেটি ব্যবসা শুরুর সময় বুঝতে পারিনি। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরুর পর বুঝতে পারি, এটা অবৈধ।’

কক্সবাজারের একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারে দ্রæত ধনী লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে তারা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠেন। ইয়াবা কারবারই এর অন্যতম কারণ। তারা ট্যাবলেট ব্যবসায় যুক্ত হন এবং এলাকার অনেক যুবক ও বেকার শ্রেণির লোককে এর সঙ্গে যুক্ত করেন। তখন যুবক শ্রেণির হাতে টাকা চলে যায়। এরপর বিয়েশাদির ক্ষেত্রেও ট্যাবলেট ব্যবসায়ীদের কদর বাড়তে থাকে। আর্থিক সচ্ছলতার কারণে কনেপক্ষ কোনো রকম নীতি-নৈতিকতা না ভেবে ট্যাবলেট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন।

এমন এক বাস্তবতার মুখে টেকনাফ ও কক্সবাজারের সমাজ ইয়াবা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফের মহাপরিচালক এম এম সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের সামাজিক জীবন ইয়াবা আক্রান্ত। এই সামাজিকব্যাধি সারাতে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। তাই আমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের নিয়ে ইয়াবা তথা মাদকবিরোধী সমাবেশ করি।’ তিনি বলেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে ট্যাবলেট ব্যবসায়ীরা হয়তো একসময় গুরুত্ব পেত, তবে এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ইয়াবা পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এখন তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। ইয়াবা কারবার যে খারাপ, সেটা বিলম্বে হলেও সামাজিকভাবে মানুষ বুঝতে পারছে। এটা সামাজিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন।’

কক্সবাজারে ইয়াবা কারবার সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া প্রসঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘শুনেছি কক্সবাজারে বিয়ের ক্ষেত্রে ইয়াবা কারবারি যুবকরা বিশেষ গুরুত্ব পায় কনেপক্ষের কাছে। পাত্র বিবেচনায় ট্যাবলেট ব্যবসায়ীরা এগিয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘টেকনাফের মানুষ ইয়াবা পাচার করে, কিন্তু নিজেরা সেবন করে না। তারা পাচার করে অর্থ আয় করে।’ টেকনাফের মানুষ ইয়াবা সেবন করে না কেন এই প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘যতদূর জেনেছি, কক্সবাজারের মানুষ অন্য সব ব্যবসার মতো ইয়াবাকেও ব্যবসা মনে করে। ইয়াবা মাদক হিসেবে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করেনি। তারা শুধু ব্যবসা করে টাকা আয়ের দিকে ঝুঁকেছে।’ ইয়াবা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন কেন শুরু হচ্ছে না জানতে চাইল তিনি বলেন, ‘সামাজিক আন্দোলন মূলত স্থানীয় সচেতন মানুষের মধ্য থেকেই শুরু হতে হবে। পুলিশ সহযোগিতা দিতে পারে। তবে পুলিশ নিজ উদ্যোগে সামাজিক বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেনি। কারণ কাদের নিয়ে সামাজিক বা সচেতনতামূলক সভা করব? যেখানে জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধেই রয়েছে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ। তবে শিগগিরই সামাজিক আন্দোলন শুরু করা হবে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে। ফলে এক ধরনের বার্তা গেছে পাচারকারীদের মধ্যে। এবার সাধারণ মানুষকে মাদকের কুফল সম্পর্কে জানাতে এবং মাদক থেকে পরিবার ও সমাজকে দূরে রাখার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফেব্রæয়ারি মাস থেকেই সামাজিক আন্দোলন শুরু করা হবে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অভিযানের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র উদ্যোগ নিচ্ছে। কেউ স্বেচ্ছায় মাদক পাচার বন্ধ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে রাষ্ট্র তাকে সুযোগ দেবে এবং সহযোগিতা দিয়ে সামাজিকভাবে পুনর্বাসন করবে। যাতে ইয়াবা পাচার বন্ধ করে সে ভবিষ্যতে সুন্দরভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারে।’