বিশ্বজুড়ে আর্তমানবতার প্রতিকারবিহীন হাহাকার!

মুহম্মদ শামসুল হক

বিজ্ঞানের অমর অবদান এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করেছে। অথচ ভোগবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার খপ্পরে পড়ে সনাতনী মূল্যবাধ ও মানবিক আবেগ-উচ্ছ্বাস-অনুভূতি নির্বাসনে গিয়েছে এবং আর্তমানবতার প্রতিকারবিহীন হাহাকার সত্য ও ন্যায়ের যুপকাষ্ঠে মাথা ঠুকরে মরছে। মানুষের অবয়বধারী বিশ্বমোড়লদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত আধিপত্যবাদ এবং যাবতীয় যুদ্ধসরঞ্জাম ও ক্ষেপণাত্র বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আয়ের অদম্য লোভ-লালসা গোটাবিশ্বকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ডে পরিণত করেছে।
বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক এবং সরকার প্রধানদের মনের গহীনে লালিত পাশবিক প্রবৃত্তি জন্মসূত্রে লাভ করা সহজাত সুকুমার বৃত্তিরাজি এবং মনুষ্যত্ববোধকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। তাই গোটাবিশ্বকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়ে এবং যুদ্ধাবস্থা ও যুদ্ধপ্রস্তুতির ধারা অব্যাহত রেখে বিশ্ব মোড়লরা গোটা বিশ্বকে অঙ্গুলি হেলনে উঠ-বস করাচ্ছে আর চুন থেকে পান খসে পড়ার মত সামান্য কারণেই যুদ্ধ বাধিয়ে বেশুমার ফায়দা লুটছে। অনবদ্য কারণে আজ আর্তমানবতার প্রতিকারবিহীন হাহাকার কারও বিবেককে দংশন করেনা এবং একের দুঃখ-দুর্দশা অন্যের হৃদয়ে আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনা, পরস্পরের দুঃখে মানুষ বিচলিত হয়না এবং সাহায্য-সহযোগিতার হাতও আশানুরূপ বাড়িয়ে দেয়না।
ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে কলিঙ্গযুদ্ধে লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানির প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে মৌর্য বংশীয় মহারাজ অশোক রাজসিংহাসন পরিত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে কন্যা দক্ষিণা মিত্রসহ বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। আবার মুগল স¤্রাট শাহ আলমের দুরারোগ্য ব্যাধি উপশমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানের বিনিময়ে ইংরেজ বণিকরা ভারতবর্ষে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য করার এবং সুতানটী ও কাসিম বাজারে কুটির স্থাপনের অনুমতি পেয়েছিল। পরবর্তীতে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের সক্রিয় সাহচর্য এবং পৃষ্ঠপোষকতায় তারা নবাব আলী বর্দী খানের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র নবাব সিরাজকে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরতীর তীরবর্তী পলাশীর আ¤্রকানকে পরাজিত এবং পরবর্তীতে জাফরাবাদের অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে মীরজাফরের পুত্র মিরণের পরামর্শে সিরাজের দুধভাই মোহাম্মদী বেগের মাধ্যমে খুন করে ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। অবশ্য উক্ত জঘণ্য পাপের দায় থেকে বাপে তাড়ানো ও মায়ে খেদানো ক্লাইভ, সিপাহ সালার মীরজাফর কেউই অব্যাহতি পায়নি। ইতিহাস স্বাক্ষর বহন করে যে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ক্লাইভ শাস্তি এড়াতে গিয়ে সেভিং ব্লেডের সাহায্যে আত্মহত্যা করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিল। আর ক্লাইভের গাধা নামে পরিচিত কুলাঙ্গার সিপাহসালার মীরজাফর কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে পঁচে গলে মৃত্যুবরণ করেছিল। অনেকের মতে, মীরজাফরকে দিয়ে ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম কুষ্ঠরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। আর ইতিহাসধিকৃত মীরজাফরের ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং লুৎফার প্রণয় প্রত্যাশী মিরণ বিনামেঘে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছিল। এদিকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘসেটী বেগমকে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। অবশ্য সিরাজের দুধভাই মোহাম্মদী বেগের করুণ পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়েছিল বলে জানা যায়।
ভারতবর্ষে ১৯০ বছর শাসন, শোষণ এবং লুন্ঠনের পর অবশেষে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষ ত্যাগের প্রাক্কালে কংগ্রেসের পরামর্শে এবং অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর যোগসাজসে পূর্ব বাংলা মুসলিম লীগের তৎকালীন সভাপতি একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যদের যৌক্তিক দাবির প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না জানিয়ে প্রায় বার শ মাইল দূরবর্তী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি অঞ্চলকে ধর্মের নামে জোড়াতালি দিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা প্রদান করেছিল।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার গগনচুম্বী ব্যবধান রাতারাতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। কেন্দ্রীয় রাজধানী করাচীতে স্থাপন, সেনা-নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর এবং প্রধানগণ, সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষপদগুলোর পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের মুখের ভাষা, মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নেয়ার উদ্যোগ থেকে শুরু হয় বীর বাঙালির প্রতিবাদ- প্রতিরোধ। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সে প্রতিবাদ প্রতিরোধের রূপ ধারণ করে এবং সালাম বরকত রফিক জব্বারসহ অগণিত দামাল বাঙালির রক্ত¯œাত হয়ে মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিমের ভরাডুবি, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধান মন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা, আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান, ঐতিহাসিক ৬ দফা উপস্থাপন, ১৯৬৫ সালে ১৭ দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ চলাকালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত করুণ অবস্থা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা মামলার আসামীদের নিঃশর্ত মুক্তি, ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে আকস্মিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলবর্তী এলাকার লাখ লাখ বাঙালির মৃত্যু, প্রবল আন্দোলনের মুখে এশিয়ার লৌহ মানব হিসেবে পরিচিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পদত্যাগ ও সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর ইত্যাদি ঘটনাপঞ্জী সকলেরই কমবেশি জানা ও দেখা আছে। সর্বশেষ ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টিতে জয়লাভ এবং সামরিক যান্তা ইয়াহিয়া ও পিপলস পার্টী প্রধান জুলফিকার আলীর গোপন আঁতাত ও ষড়যন্ত্রের ফলে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দলের কাছে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্থলে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ ও যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্ন ও সর্বশেষে ২৫ মার্চের কালোরাতে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির উপর সশস্ত্র পাকহায়েনাদের লেলিয়ে দিয়ে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর ঢাকা ত্যাগ এবং জাতির জনক শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে রচিত মানব ইতিহাসের কালো অধ্যায় অনেকেরই পড়ার সুযোগ হয়েছে। যাহোক, ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানী তথা বর্তমান বাঙালিদের বহুলাংশে পাপমোচন হয়েছে। অবশ্য স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটি থেকে সাম্প্রদায়িক এবং একাত্তরের পরাজতির শক্তির সমূল উৎপাদন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তাই পাকিস্তানীদের দোসর এবং একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মারা মাঝে মাঝে বিষধর সাপের উদ্যত ফণা তুলে ধর্মের নামে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাম্প্রতিদায়িতার বিষবাষ্প ছড়াতে এবং চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে নিরীহ লোকের প্রাণহানির চেষ্টা করে। মূলত সরকার এবং শান্তিপ্রিয় জনগণকে বিব্রত করাই এদের মুখ্য উদ্দেশ্য। তবে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান যে কোন মূল্যে প্রতিহত করে আসছে দৃঢ়তার সাথে।
এদিকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জন্মনেয়া পাকিস্তানকে জন্মলগ্নের পাপের প্রায়শ্চিত্ত এখন ও করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠা লাভের প্রায় ৭৪ বছর পরও ধর্মের নামে সাবেক পশ্চিম পাকিস্তানে মসজিদ মন্দির উপাসনালয়সহ সর্বত্র বর্বরোচিত ও পাশবিক চোরাগোপ্তা হামলায় নিষ্পাপ ছাত্র-ছাত্রী, সেনা কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার নিরীহ লোকের প্রাণ ঝরছে প্রতিনিয়ত। এই পাশবিক ও বর্বরোচিত হামলার হাত থেকে পাকিস্তানের নিরীহ জনগণ কবে নাগাদ মুক্তি পাবে তা একমাত্র ভবিতব্যের বিচার্য।
এদিকে বিগত ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বার লাখ বাস্তুহারা রোহিঙ্গার গগনবিদারী আর্তনাদ মায়ানমারের নিষ্ঠুর শাসকদের অন্তরে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে কিংবা আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও ভেটো পাওয়ারসম্পন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাবে এ জঘণ্য মানবিক সমস্যার সুরাহা হচ্ছেনা। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিতা মিয়ানমারের নেত্রী অং শাং সুচি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে নানা কলা-কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন ও অকারণ কালক্ষেপণ করছেন। অগত্যা কানাডা সুচিকে দেয়া সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও মিয়ানমারের উপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তাÑভাবনা করছে। শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সমস্যা কোন দিকে গোড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষার প্রহর গণনা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
আবার ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস্তুভিটি থেকে উৎখাত হওয়া ফিলিস্তিনীদের গলাফাটা করুণ আর্তনাদ পাশ্চাত্য বিশ্বের সুরক্ষিত হর্মের দেয়াল বিদীর্ণে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। মাথা গোঁজার ন্যূনতম ঠাইয়ের আশায় নিরীহ প্যালেস্টাইনীরা যখন অনেকটা খালি হাতে আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিহ হানাদার ই¯্রায়েলী বাহিনীর ট্যাঙ্কের নিচে জীবন বলি দিচ্ছে , পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠ তখন প্যালেস্টাইনীদের প্রতিরোধকে আগ্রাসী কর্মকান্ড আখ্যা দিচ্ছে। পক্ষান্তরে আগ্রাসী ই¯্রায়েলী বাহিনী ও সরকার যখন অধিকৃত গাজা এবং পশ্চিম উপকূলে সুরক্ষিত হর্ম তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন বিশ্বমানবতার ধ্বজাধারী পশ্চিমা বিশ্ব উদ্বাহু বাড়িয়ে তাকে স্বাগত জানায়।
স্মর্তব্য, ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে লাখ লাখ তাজা প্রাণ ঝরিয়ে আমেরিকা নিজকে পারমাণবিক শক্তির একক অধীশ্বর হিসেবে জাহির করেছিল। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে চলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মহড়া। সেই মহড়া আজও পুরোদমে চলছে। বর্তমান বিশ্বে যতগুলো পারমাণবিক বোমা সংরক্ষিত আছে তা পৃথিবীর মত কয়েকটি বিশ্বকে বার কয়েক পুড়িয়ে ছাই-ভস্মে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে বলে জনান্তিকে প্রকাশ। যাহোক, পারমাণবিক বোমা বহনকারী বিমানের পাইলট না-কি ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা অবলোকনের পর বদ্ধ পাগল হিসেবে সারা জীবন কাটিয়ে অবশেষে পরলোক গমন করেছেন। কিন্তু যাদের হুকুমে এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল তাদের কেউ অনুশোচনার অনলে দগ্ধ হয়েছেন তেমন খবর পত্রিকার পাতায় মিলেনি। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিহতের লক্ষে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ও পরবর্তীতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যত তা পরাশক্তির পারপাস সার্ভ করছে বলে বিশ্বের নির্যাতিত ও নিগৃহিত দেশগুলোর অভিযোগ।
নিতান্ত সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করতে হয় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দগদগে ক্ষত শুকানোর আগেই ১৯৬২ সালে ভিয়েতনামকে নতুন মারণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির কত বছর লাগবে তা দেশের সরকার এবং জনগণই ভাল জানেন।
আবার ১৯৭১ সালে মাতৃভূমির মাটি থেকে পাক হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার মরণপণ লড়াইয়ে ৩০ লাখ বীর বাঙালির রক্তসাগর বইয়ে দেয়ার ইতিহাস রচনার অব্যবহিত পরপরই আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে লাখ লাখ তরতাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে বোমা ও গোলার আঘাতে। উল্লেখ্য, ১৯৭০ এর দশকে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর পর রাশিয়ার দুর্ধর্ষ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে গিয়ে হাজার হাজার আফগানকে বুকের তাজা রক্তের স্রোতে বইয়ে দিতে হয়েছিল। আফগানদের প্রবল প্রতিরোধ এবং কেচকা মারের নিকট হেরে গিয়ে রাশিয়া আফগানিস্তান ত্যাগে বাধ্য হলেও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর দায়ে রাশিয়ার সরকারকে বিশ্ববাসীর নিকট জবাবদিহি করতে হয়নি।
২০০১ সালে টুইনটাওয়ার ধ্বংসযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে ইরাক এবং আফগানিস্তানে যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল লাখ লাখ লোকের প্রাণহানির পরও অদ্যাবধি এর পরিসমাপ্তি ঘটছে না। অথচ ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং আফগানিস্তানের মোল্লা ওমরের শাসনের ইতি ঘটানোর লক্ষে পরিচালিত যুদ্ধে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি সত্ত্বেও অদ্যাবধি পাশ্চাত্যের কোন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে বিবেক কিংবা রাষ্ট্রীয় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। তবে সদ্বিবেচক জনতা কোন হোমরা-চোমরাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাতে ব্যর্থ হলেও প্রকাশ্যে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে পিছপা হয়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ২০০১ সালের সামরিক অভিযানের জন্য আমেরিকা এবং তার মিত্রবাহিনীকে যে আদৌ জবাবদিহি করতে হবে না । আবার মরু বসন্তের ধুয়া তুলে লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফিসহ বহু তাজাপ্রাণ ছিনিয়ে নেয়া হলেও সেই বসন্তের হাল- হকিকত বর্তমান বিশ্ববাসীর অজানা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মুসলমান নারী-পুরুষ শিশু-বৃদ্ধ প্রাণ হারাচ্ছে এবং পশ্চিমা বিশ্ব এ সকল কর্মকান্ডে কখনো সক্রিয়ভাবে কখনো পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যাহোক, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে গোটাবিশ্বকে নিয়ে গড়ে উঠেছে গ্লোবাল ভিলেজ আর সমগ্র বিশ্ব এখন মানুষের নখদর্পণে। তাই বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অজ পাড়াগায়ে কোন শ্রুতিমধুর/ শ্রুতিকটু শব্দ উচ্চারিত হওয়ামাত্রই প্রচার মিডিয়া তাকে লুপে নেয় বিদ্যুৎ গতিতে। তাই মুসলিম টেররিস্ট শব্দটি বর্তমানে পাশ্চাত্য মিডিয়ার নিত্য-নৈমিত্তিক খাবারে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, মানুষ এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনপ্রবাহকে উপজীব্য করেই মূল্যবোধ, ধর্মানুশীলন, যাবতীয় রীতি-নীতি, শুভ-অশুভ, ভাল-মন্দ, সৃষ্টি-ধ্বংস ইত্যাদির সূত্রপাত হয়েছে। আর ধর্ম-গাত্রবর্ণ-গোষ্ঠী-ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বিচার ইত্যাদির বিচারে বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৭ শ কোটি মানুষ হাজারো দল-উপদলে বিভক্ত হলেও আদি পিতা আদম এবং বিবি হাওয়া থেকে বিশ্বের এই বিরাণ ভূমিতে মানুষের জন্ম ও বসবাস শুরু হয়েছে – এ ব্যাপারে কোন ধরনের বিবাদ- বিসম্বাদ নেই। অবশ্য পরবর্তীতে সময়ের অগ্রযাত্রায় বংশবৃদ্ধি ও জনারণ্য সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে আদম সন্তানরাই বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রে বিভক্ত হয়ে বিশ্বের নানা দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্বতন্ত্র আবাস গড়ে তুলেছে। তবে সহস্র ধরনের মতপার্থক্য সত্ত্বে আদি মানব ও মানবীর সার্থক মিলনের ফলেই যে মানুষের বংশ বিস্তারের ভিত রচিত হয়েছে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির গড়মিল, ধর্মীয় মতবাদের বিভিন্নতা, ভাষা ও জাতি-গোষ্ঠীগত বৈষম্য সত্ত্বেও মানবের সাথে মানবের কিংবা মানবীর সাথে মানবীর মিথুন প্রক্রিয়ায় মানব শিশুর জন্ম ও মানুষের বংশ বিস্তারের ধারার সূত্রপাত হয়েছে- এ ধরনের বর্ণনা কোথাও মিলবে কি-না তা আমার অবাঙ্মনসগোচর। সৃষ্টির ঊষালগ্নে অরণ্যচারি ও গুহাবাসী আদি মানবগোষ্ঠীকে যাবতীয় প্রাকৃতিক বৈরিতা ও প্রতিকূলতার সাথে অহর্নিশ লড়াই করেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। সেই প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের আর্ত আহাজারিতে কোন দেবতার পক্ষ থেকে সাড়া মিলেনি। মানুষই পরস্পরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৈরিতার সাথে অকুতোভয়ে লড়েছে, স্যাঁতসেঁতে ও শ্বাপদসঙ্কুল বনবাদাড় উজাড় করে নিরাপদ বসতি গড়েছে। তাদের এই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় ইন্ধন যুগিয়েছিল মানবিক মূল্যবোধ, অসহায়কে সাহায্য, সর্বহারা আশাহতকে প্রাণবন্ত করে তোলা এবং যে কোন ধরনের সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা। আর এই পারস্পরিক সমভাগী ও সমব্যথী হওয়ার মনোবৃত্তিই আদি মানব সমাজের ভিত রচনা করেছিল। অথচ হাজার হাজার বছর পর মানব সভ্যতার পরম উৎকর্ষ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরম মাহেন্দ্রক্ষণে সামাজিকতা ও অন্যের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির করার মানসিকতা বা মানবিক মূল্যবোধ নির্বাসনে গেছে। সিন্দাবাদের একচোখা দৈত্যের মত আমার এবং আমার পরিবারের একান্ত ঘনিষ্ঠজনদের স্বার্থে গোটা সমাজের লোকজনকে অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দিতে আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। সৎ-অসৎ, ভাল-মন্দ, পাপ-পুণ্য, নীতি-দুর্নীতে যে কোন মূল্যে আমাকে ও আমার স্বজনদের টিকে থাকতে ও রাখতে হবে, হাজার মুখের গ্রাস অস্ত্রের বা গায়ে জোরে কেড়ে নিয়ে সুখের সুরক্ষিত হর্ম আমাকে গড়তেই হবে।
ঊপনিষদের ঈসা বাস্য মিদং সর্বম, গীতার যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বঞ্চময়ী পশ্যতি, কবীর হীন পতিতের ভগবান, ত্রিপিটকের অহিংসা পরম ধর্ম, জীবে প্রেম করে যে জন সেজন সেবিছে ঈশ্বর, গড হ্যাজ সেন্ট মেন টু সার্ভ দ্য ডিসট্রেসড হিউম্যানিটি, পবিত্র কুরআনের হাল জাজায়ুল ইহসানে ইল্লাল ইহসান- বিভিন্ন ধর্মের এ সকল অমর ও শ্বাশত বাণী পর্যালোচনা করলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে সৃষ্ট জীবকে ভালবাসা ও সৃষ্ট জীবের সেবার মাধ্যমে জগদীশ্বরের সন্তুষ্টি লাভের তাড়না রয়েছে প্রতিটি ধর্মের মূল বিধান বা নির্দেশে। অথচ বর্তমানের সংঘাতময় বিশ্বে ও স্বার্থের রজ্জুতে আঁটসাঁট বাধা জীবনে উপরোল্লেখিত ধর্মীয় বাণীর স্থান কোথায়।
বিশ্ব মুসলিমের অজানা নয় যে একনাগাড়ে ৪০ দিন ও রাত বৃষ্টিপাতের পর হযরত নূহ (আ) এর নৌকো পাহাড়ের শীর্ষে গিয়ে ঠেকেছিল। তখনকার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য হযরত নূহ (আ) কাককে প্রেরণ করেছিলেন বার্তাবাহক হিসেবে। নৌকো থেকে বের হওয়ার পর মৃতদেহ দেখে কাক তা ভক্ষণে লেগে যায় এবং হযরত নূহ (আ) এর আদেশের কথা ভুলে যান। ফলে হযরত নূহ (আ) রুষ্ট হয়ে কাককে অভিসম্পাত করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় কাক মহাপ্রলয়ের আগ পর্যন্ত মরা খেয়ে জীবন ধারণ করবে। আর কবুতর হযরত নূহ (আ) এর নির্দেশে পাহাড়ের চূড়ায় পা ডুবিয়ে পানির গভীরতা পরিমাপের চেষ্টা করেছিল। তাই হযরত নূহ (আ) এর দোয়ায় কবুতরের পা দুটি দৃষ্টিনন্দন। উপসংহারে বলতে হচ্ছে: মহাপ্লাবনের পর নূহ (আ) কিস্তি শেষমেষে ঠেকেছিল পাহাড়ের শীর্ষ দেশে। তবে ভোগবাদী বিশ্ব নেতাদের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা এবং আর্তমানবতার প্রতিকারবিহীন হাহাকারের জাহাজ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা একমাত্র মহান আল্লাহই ভাল জানেন।
সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউ ইয়র্ক।