বিশ্বজুড়ে উদ্যোক্তা উদ্ভাবনের কারিগর এমইএ

আকিব মাহমুদ : বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়কে উদ্যোক্তা উদ্ভাবনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী অলাভজনক সংগঠন এমইএ (মুসলিম এন্টারপ্রিনিওর অ্যাসোসিয়েশন)। শিক্ষার্থী ও পেশাদারদের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করাই ‘এমইএ’র মূল উদ্দেশ্য। তবে মহামারি করোনার সময়ে কমিউনিটির পাশে থেকেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ‘এমইএ’।

চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়েপড়া প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে গোটা বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত; গণহারে সংক্রমণের আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা মেনে মানুষ যখন বাড়িতে বসে অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিল তখন ‘এমইএ’র সদস্যরা ছুটে বেড়িয়েছেন এক দরজা থেকে আরেক দরজায়। জনপ্রতিনিধি না হয়েও তারা মহামারিকালে পালন করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ভূমিকা। খাবার নিয়ে ছুটে গেছেন জীবন ঝুঁকি উপেক্ষা করেই।

এ ব্যাপারে ‘এমইএ’র সদস্য ফারহানা আখতার বলেন, করোনা মহামারির শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র লকডাউন ঘোষণা করে। দীর্ঘদিন ঘর থেকে বের হতে না পারায় এবং খাদ্যদ্রব্যের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। তখন সাহায্যপ্রার্থীদের জন্য আমরা হটলাইন সার্ভিস চালু করে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানিয়ে দেই। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে আমাদের কাছে খাদ্য সহযোগিতা চেয়ে ফোন কল আসা শুরু হয়। আমরা শুরুতে হান্ড্রেড মিল চ্যালেঞ্জ নেই। ডোর টু ডোর খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় যা খুবই অপ্রতুল ছিল। ফলে দ্বিতীয় ধাপে আমরা আবার হান্ড্রেড মিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি। এ ছাড়া ফুড প্যান্ট্রি চালু করা হয় ট্রান্সফোটেক একাডেমির ক্যাম্পাসে। কিন্তু সংক্রমণের মাত্রা বাড়তে থাকায় আমাদের কাছে আরও ফোন কল আসতে শুরু করে। আমরা সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে ৩য় ধাপে খাদ্য বিতরণ শুরু করি। এভাবে কোভিড-১৯ এর সময়ে ২ হাজারের অধিক মানুষকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে এমইএ।

তাছাড়া বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মুসলিম পেশাদার এবং উদ্যোক্তাদের সাথে তাদের পডকাস্ট / ওয়েবিনার সিরিজ চালু করে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ৪ হাজার ডেডিকেটেড সদস্যদের নিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে ‘এমইএ’। যেখানে রয়েছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রেস্টুরেন্ট মালিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ ১০০ এরও বেশি পেশাজীবী। যাদের মধ্যে প্রায় ৫ জন রয়েছেন ডেডিকেটেড ইনভেস্টর হিসেবে। যারা প্রত্যেক মুসলিম কোম্পানি স্টার্ট আপের ক্ষেত্রে ফান্ড সহায়তা প্রদান করে থাকেন।
তাছাড়া চলতি বছরেই যুক্তরাষ্ট্রের পেনিসিলভানিয়াতে মারিফাহ রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পে তিন দিনব্যাপী মুসলিম এন্টারপ্রিনিয়রশিপ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এই কনভেনশনে ব্যবসাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের ব্যবসায়ি নেতারা ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট থেকে আগত একাধিক ব্যবসায়ি নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেদের ব্যবসায়িক সাফল্য তুলে ধরেন কনভেনশনে।

রিটেইল ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা করতে গেলে কি ধরনের ব্যবসায়িক সমস্যা আসতে পারে এবং এসব সমস্যা থেকে উত্তোরনের উপায় ও কৌশল প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয় এই কনভেনশনে। স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়িকে ব্যবসা প্রসারে ঋণ প্রদানেরও আশ্বাস দেয়া হয়। সম্মেলনের শেষদিন ব্যবসায়িদের নিয়ে ব্যবসার ক্ষতি ও প্রসার বিষয়ক বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিচারক ও সাধারণ ব্যবসায়িদের বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ব্যবসার সাফল্যের ভিত্তি মজবুত করতে বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়। ফলে ব্যবসায়িরা সহজে নিজেদের ব্যবসার অবস্থান মূল্যায়ন করতে পারেন এবং আরও সাফল্যে দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কি কি করণীয় তা ঠিক করেন। এমইএর এই কনভেনশনে তিনজন নারী উদ্যোক্তাসহ ৭টি স্টার্ট আপ কোম্পানি অংশগ্রহণ করে।

শুধু তাই নয় ‘এমইএ’ কমিউনিটির মানুষদের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনে সবসময়ই কমিউনিটির পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত বিশ্বে ঈদের আনন্দ ছিল ম্লান। কিন্তু মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদের দিনে শিশুদের মুখ যেন মলিন না থাকে তাই শিশুদের মাঝে খেলনা বিতরণ করে তাদের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয় এমইএ।

তাছাড়া ২০১৯ সালে আমেরিকার স্থানীয় নির্বাচনে মুসলিম নারী প্রার্থীদের সমর্থন করে এমইএ। তাদের নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্তসহ অন্য বিষয়গুলোও পরিচালনা করে এমইএ।
এমইএর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ গালিব রহমান বলেন, বিশ্বের সকল মুসলিম উদ্যোক্তাকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে একে অপরের ব্যবসায়িক সমস্যা দূরীকরণ ও সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করা। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই গৃহহীন রয়েছেন। তাদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণ। নারীদের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রতি মাসে ইভেন্ট পরিচালনার মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের সমস্যা শুনে তাদের সহযোগিতা করা। বিশ্বজুড়ে ক্যারিয়ার ফেয়ার চালু করা যার মাধ্যমে দক্ষ তরুণরা সহজেই নিজেকে গড়ে তোলতে সক্ষম হয়।

তাছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম কমিউনিটিকে একত্রিত করে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমবাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে এমইএ সব ধরনের সহায়তা দেবে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য ৪ হাজার সদস্যের সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল রহমান। পাকিস্তানি বাবা-মায়ের সন্তান আবদুল রহমানের জন্ম নিউইয়র্কের কুইন্সে। তিনি কুইন্স কলেজের অর্থনীতি অনার সোসাইটির প্রথম মুসলিম প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দুর্দান্ত নেতৃত্বের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। বর্তমানে আবদুল ফিনান্স অ্যান্ড টেক নিয়ে কাজ করছেন।

অপরদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ গালিব রহমান। যিনি একজন বাংলাদেশি। তিনি নিউইয়র্কে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন শেষ করে জেপিএম, ক্যাপজেমিনি, আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, এক্সচেঞ্জারে গ্লোবাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি তার প্রতিষ্ঠান ট্রান্সফোটেক একাডেমির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ এবং জব প্লেসমেন্টের ব্যবস্থাও করছেন। তাছাড়া ট্রান্সফোটেক ইন্কের সহযোগী সংগঠন সেরা ডিজিটাল এবং সফটওয়্যার ও ডিজিটাল বিপণন সংস্থা ডিপ্লয়মি পরিচালনা করছেন। বিশ্বব্যাপী তাদের একটি দল রয়েছে যা তাদের ক্লায়েন্টদের জন্য ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, এসইও, সোশ্যাল মিডিয়া বিপণন, আইটি, সাইবার সিকিউরিটি, অনলাইন বিপণন এবং অন্যান্য প্রযুক্তি পরিষেবা দিয়ে থাকে।