বিশ্বের ক্ষমতাধর নারী শেখ হাসিনা ১৯৮১ থেকে ২০১৯ অর্জন

বিশেষ ক্রোড়পত্রের প্রচ্ছদ

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী

গোটা বিশ্বের রাজনীতিতে কয়েকজন নারী রয়েছেন যারা অসীম ক্ষমতার অধিকারী ও প্রভাবশালী। এর মধ্যে উন্নত বিশ্বের দেশই বেশি। তা থাকলেও এই যাবৎকালে যেসব নারী রাজনীতিতে বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন, নারী নেতৃত্ব হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সফল করে তুলতে পেরেছেন। তাদের নাম নানাভাবে আলেচিত হচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ে স্থান পেয়েছে। নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখায় বাংলাদেশের নাম আলোচিত হচ্ছে। তার নামের পাশাপাশি ওই তালিকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ম্যার্গারেট থ্যাচার, শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাসহ বিভিন্ন খ্যাতিমান নারীদের নাম রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী নারীর তালিকায় শেখ হাসিনার নাম একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব বিভিন্নভাবেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কারণ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের টানা দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার নারী, বিরোধি দলের নেতাও ছিলেন এর আগে নারী। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনিও রাজনীতিতে একজন সফল নারী। রওশন এরশাদও এখন বিরোধী দলের নেতা। এর আগের মেয়াদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। তাদের ছাড়াও বাংলাদেশে নারী রাজনীতিকরা বিভিন্নভাবে সফলতার পরিচয় দিচ্ছেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সময় সরকার প্রধান হিসেবে সরকার পরিচালনার সাফল্য অর্জন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে একবার সরকার প্রধান ছিলেন, বর্তমান সময় নিয়ে টানা তিনবার, মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী। সংসদে বিরোধী দলের নেতাও ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগেরও সভাপতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার নিয়ে ১৫ বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে ২২ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্কে আসছেন। থাকবেন ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন। তার ঝুলিতে রয়েছে সাফল্যর জন্য বিভিন্ন দেশ, সংস্থা, সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার। তিনি এবারও নিউইয়র্কে দুটি পুরস্কার লাভ করবেন। সর্বশেষ লাভ করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আব্দুল কলাম অ্যাওয়ার্ড। তাকে তার কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ তুলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ। সেই উন্নত বিশ্বের তালিকায় নাম লেখাতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নের লক্ষ্যে ভিশন ২০৪১ ঠিক করে ক্ষমতাসীন সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এরপর আর থেমে থাকেনি তার পথচলা। পথ চলা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে চারবারের প্রধানমন্ত্রী। এবার আছেন টানা তৃতীয়বারের মতো। আর এই টানা তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। বারবার রাজনীতির নেতৃত্ব ছাড়ার আভাস দিয়েছেন তবে তার বিকল্প এখনও আওয়ামী লীগে কেউ তৈরি হয়নি। তিনি অবসরে গেলে তার জায়গায় কে আসবেন এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও তা ওই পর্যন্ত। কারণ তার দলের নেতা ও কর্মীরাও তার কোনো বিকল্প দেখেন না। ফলে তাকে থাকতেই হচ্ছে। তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। সরকার প্রধানের দায়িত্বও পালন করে চলেছেন।
বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনার রয়েছে অনেক সাফল্য। সে সাফল্য বিশ্বের দরবারেও পৌঁছে গেছে বিভিন্নভাবে। তবে তার সাফল্যর পাশাপাশি বিরোধি রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে তিনি নানাভাবে আলোচিত ও সমালোচিতও। বিরোধী রাজনৈতিক মহলে নানা করণে তার সিদ্ধান্ত সমালোচনা তৈরি করেছে। যা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতারা বলে আসছেন। বিশেষ করে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তারা প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার ভুল ত্রু টি তুলে ধরা ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক মহলের কাছে যত নেতিবাচক কথাই থাক না কেন আন্তর্জাতিক মহলে তিনিও তার সরকার চেষ্টা করেছেন দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার এবং দিনে দিনে তা বৃদ্ধি করার। কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, এই নীতিতে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিতে এগিয়ে চলেছে। শেখ হাসিনা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরালো করার জন্য বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশে প্রবাসী ও বিদেশিদের বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা চেষ্টা করছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সুনাম বাড়ানোর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আরো গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ ও জোরালো হওয়া দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এর আগে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি বলেও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। তবে সবাই আশা করে আগামী দিনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরো জোরালো করতে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত এক নজরে সংক্ষিপ্তকারে শেখ হাসিনার জীবনবৃত্তান্ত দেখলে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ৭ জানুয়ারি ২০১৯ শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সে বছরের ১২ জুনের সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ পরাজয় বরণ করে। শেখ হাসিনা বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে জটিলতা সৃষ্টি করলে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ঐ সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি এরশাদ আমলে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা তিনটি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই নির্বাচনের পরেই দেশ থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং এই আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সংগঠিত করেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপির ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় শেখ হাসিনা সবসময়ই আপসহীন। ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনায় দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সরকার ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের জন্য আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় স্থাপিত ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে এবং রায় কার্যকর করা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ হাসিনা সব গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সেসময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ৬ বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই তিনি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাঁকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। তাঁকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাঁকে দু’বার গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে আটক করে প্রায় তিন মাস গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দী হন। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় এক বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন।
শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিক‚লতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ অর্জন করেছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা। বাংলাদেশ পেয়েছে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা। শেখ হাসিনার অপরিসীম আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে আর্থসামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো ছিল : ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জন। এ ছাড়া তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ভূমিহীন, দুস্থ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩,২৬০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, পাঁচ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষিদের ঋণ প্রদান, চিকিৎসাসেবার জন্য সারা দেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কউিমনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৩৮.৪ থেকে ২০১৩-১৪ বছরে ২৪.৩ শতাংশে হ্রাস, জাতিসংঘ কর্তৃক শেখ হাসিনার শান্তির মডেল গ্রহণ ইত্যাদি। ২০১৪ সালের পর এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশকে মধ্যমআয়ের দেশে উন্নীতকরণ, ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক স্থল সীমানা চুক্তির অনুমোদন এবং দুই দেশ কর্তৃক অনুসমর্থন, (এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ৬৮ বছরের সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে), মাথাপিছু আয় ১,৬০২ মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, দারিদ্র্যের হার ২২.৪ শতাংশে হ্রাস, ৩২ বিলিয়ন ডলারের উপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন শুরু ইত্যাদি। শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিশ্বের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এ ছাড়া ফ্রান্সের ডাওফি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিপ্লোমা প্রদান করে। সামাজিক কর্মকাণ্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা সম্মানিত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো তাঁকে ‘হুপে-বোয়ানি’ (Houphouet-Boign) শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রানডলপ ম্যাকন উইমেন্স কলেজ ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল মর্যাদাসূচক ‘Pearl S. Buck’৯৯’ পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক ‘সেরেস’ (CERES) মেডেল প্রদান করে। সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালে ‘মাদার টেরেসা’ পদক প্রদান করে। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক রোটারি ফাউন্ডেশন তাঁকে Paul Haris ফেলোশিপ প্রদান করে। পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় কংগ্রেস ১৯৯৭ সালে তাঁকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু স্মৃতি পদক প্রদান করে। আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব কর্তৃক ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে তিনি ‘Medal of Distinction’ পদক ও ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে ‘Head of State’ পদক লাভ করেন। ২০০৯ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা পালনের জন্য শেখ হাসিনাকে ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কারে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভারসিটি পুরস্কার এবং দুইবার সাউথ সাউথ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৪ সালে ইউনেসকো তাঁকে ‘শান্তিরবৃক্ষ’ এবং ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাঁকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাঁকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এ ছাড়া, টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award-2015 প্রদান করে। শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচিয়তা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: “শেখ মুজিব আমার পিতা’, ওরা টোকাই কেন?, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, দারিদ্র্য বিমোচন, কিছু ভাবনা’’, ‘আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম’, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘সাদা কালো’, ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, Miles to Go, The Quest for Vision-2021 (two volumes)।
সূত্র মতে, শেখ হাসিনা ‘জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ এর সভাপতি। তিনি গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে বিশ্বাসী এবং দরিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। প্রযুক্তি, রান্না, সঙ্গীত এবং বই পড়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর স্বামী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে ইন্তেকাল করেন। শেখ হাসিনার জ্যেষ্ঠ পুত্র সজীব আহমেদ ওয়াজেদ একজন তথ্য-প্রযুক্তি বিশারদ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর একমাত্র কন্যা সায়মা হোসেন ওয়াজেদ একজন মনোবিজ্ঞানী এবং তিনি অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে কাজ করছেন। শেখ হাসিনার নাতি-নাতনীর সংখ্যা সাতজন।