বিশ্ব গণমাধ্যমে একাদশ জাতীয় নির্বাচন ও কিছু কথা

শিবলী চৌধুরী কায়েস: সম্ভবত ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল। দিনটি আজো ভুলিনি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক ফরেন প্রেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড-প্রেস-ফ্রিডম’ ডে। বিশ্বজুড়ে মুক্ত গণমাধ্যম তথা সংবাদ মাধ্যম সংশ্লিষ্টদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রতি বছরই এ ধরণের আয়োজন হয়ে থাকে। নিউইয়র্কের বুকে বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম একেবারে নগণ্য। একজন নবিন। একটু ‘নার্ভাস’ ছিলাম। কারণ ইংরেজীতেও তেমন পারদর্শী ছিলাম না। তাই বলে সাহসতো ছিল। পরিচয় হলাম অনেকের সাথে। বক্তব্য রাখলাম। উঠে আসে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গ। এভাবেই কেটে যায় ‘ওয়ার্ল্ড-প্রেস-ফ্রিডম’ ডে।
দুই).
একদিন জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ক্যাফেটেরিয়ায় ‘কফির উত্তাপ’ নিচ্ছি। কিছুক্ষণ পর উপস্থিত পূর্ব পরিচিত দু’জন সাংবাদিক। একজন রয়টার্সের, অন্যজন সম্ভবত আফ্রিকান কোন এক গণমাধ্যমের। তারা উভয়ে জাতিসংঘের সংবাদদাতা। স্টেট ডিপার্টমেন্টেও দেখা হতো। আলাপচারিতার একপর্যায়ে হঠাৎ একজন বলে উঠলেন- ‘তোদের পিএম ল্যায়ার (মিথ্যাবাদি)’। তার উত্তরে বললাম- ডোন্ট সে দ্যাট, আফটার-অল শি-ইজ আওয়ার প্রাইম-মিস্টিার’।
তিন).
২০১৪ বিতর্কিত ৫ জানুয়ারিকে এবার আরো ছাড়িয়ে গেছি। ২০১৮তে শেষ হওয়া একাদশ জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে অনেক মতামত শুনতে হবে। আমি প্রস্তুত। উত্তর দিতে হবে হাজারো কৌতুহলি প্রশ্নের। তবে এড়িয়ে যাওয়ার হয়তো সুযোগ আছে। সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। কারণ, তথ্য-প্রবাহের অবাধ বিচরণের যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। ফলে যেমন- ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসা শুনি, ঠিক তেমনি; ‘নিরাপদ-সড়ক’ দাবিতে ছাত্র কিংবা ‘কোটা-সংস্কার’ আন্দোলনের খারাপ খবরও। কথা শুনতে হয়, আমাদের স্বাধীনতা/স্বার্বভৌমত্ব/আইনের শাসন ও প্রশাসনের ন্যায় বিচার নিয়ে!
চার).
স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফরেন জার্নালিস্ট মেম্বার হওয়ার পর জাতিসংঘের নিয়মিত ক্রেডেন্সিয়াল অর্জনেও সক্ষম হই। আমি মূলত: একটু প্রচার বিমুখ মানুষ। এটা কাছের জনদের মত। অনেকের কাছে ঠিক উল্টোটাও হতে পারি। ২০১৪-২০১৮ টানা পাঁচবার ইউএন কাভার করছি। জাতিসংঘের সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ইউনাইটেড ন্যাশন্স করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-আনকা’র মেম্বার হলাম। ব্যস্ততার খাতিরে নিয়মিত যাওয়া হয় না। তবে, মাসে দু’চারবার যেতে হয়। ‘ক্রেডেনন্সিয়াল’ ঠিক রাখার স্বার্থে। সবচেয়ে বেশী যাওয়া হয় জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঘিরে। বাংলাদেশ থেকেও ছুটে আসেন একঝাঁক সহকর্মী। যদিও রাষ্ট্রীয় খরচায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের দীর্ঘ তালিকা প্রতি বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ছাড়িয়ে যায় সদস্য অনান্য দেশসমুহকেও।
পাঁচ).
পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত থেকেও এত বড় সরকারি বহর জাতিসংঘে আসার রেকর্ড নেই। প্রতিবছর অধিবেশনে অংশ নেন না অনেক দেশের সরকার প্রধানরা। রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের রেকর্ড ডেলিগেটের তালিকাও থাকে না। যা কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান। জাতিসংঘের অধিবেশনের সব কাজ করে থাকেন মূলত: স্থায়ী প্রতিনিধি। রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানের দায়িত্ব হচ্ছে কেবল সৌজন্য।
ছয়).
জাতিসংঘের অধিবেশন ঘিরে আমাদের সরকার প্রধানের সফর। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ক্ষমতাসীন দলীয় আর বিরোধীদের সরব উপস্থিতি ও কর্মব্যস্ততার পালা। সরব কমিউনিটির বাংলাদেশী গণমাধ্যমগুলো। একপক্ষের ‘অর্ভ্যথনা’ আর অন্যপক্ষের ‘প্রতিহত/প্রতিরোধের’ হুমকি-ধামকি। এ নির্ভর কর্মসূচি চলে টানা কয়েকদিন। এয়ারপোর্ট/হোটেল থেকে শুরু করে যা গিয়ে ঠেকে জাতিসংঘ সদর-দপ্তর পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী সফরসঙ্গী সাংবাদিক কিংবা ব্যবসায়ী’ দলীয় অভ্যর্থনায় সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বিপরীতে সরকার বিরোধীদেরও উপস্থিতি। দু’পক্ষের ‘মারমুখি’ অবস্থান আর ‘পক্ষ/বিপক্ষ’ শ্লোগান ‘নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের’ও দিশেহারা ভাব। একই সাথে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পরিচিত সাংবাদিকদের কৌতহলী প্রশ্নের জবাবও দিতে হয় আমাদের। তাদের মুখের অঙ্গ-ভঙ্গি দেখলে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়।

সাত).
বলতে পারি প্রতিবছরই জাতিসংঘ অধিবেশন ঘিরে চলে বিভাজনের কর্মসূচি। বিশ্বদরবারে একটা দ্বিধাবিভক্ত জাতির তকমা পাই আমরা। এ সবের মধ্যেই সাধারণ অধিবেশনে সরকার প্রধানের ভাষণ/বাংলায় ভাষণ’সহ বিভিন্ন সাইড-ইভেন্টে চলমান। প্রশ্ন জাগে স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা ‘চেতনা/মুক্তিযুদ্ধ/যুদ্ধাপরাধি’ এসব চাপ্টার থেকে বের হতে পারিনি। বরং নতুন যুক্ত হয়েছে ‘সন্ত্রাসী’ আর ‘জঙ্গি’। খোদ সরকার প্রধানের মুখে যখন উচ্চারিত হয়- বিরোধীরা সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি সংগঠন! সেটা তখন আর বিরোধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমেরিকা কিংবা উন্নত বিশ্বের তালিকায় ‘গ্রীন-পার্সপোর্টধারিরাই’ এর নথিভুক্ত হয়ে যান।
আট).
ভাবছি আমাদের সোনার বাংলার আগামির সম্ভাবনা নিয়ে। আদতে কি আমরা স্বাধীন? আমাদের কি বুদ্ধি-বিবেক-যুক্তি জাগ্রত? আমি বলবো না! প্রমাণ-সবশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচন। যা ২০১৪ সালের বিতর্কিত ৫ জানুয়ারিকেও ছাড়িয়েছে। আমার সাথে এ নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। এটাও তাদের স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু আমি তো সুবিধাভোগি নই। রাজনীতি বনাম দলান্ধ নই যে; আমাকে চেতনার নামে বিবেকের কাছে জিম্মি হতে হবে!!
নয়).
বলছি ৯৫-৯৬ সালের কথা। তখন মাধ্যমিক পেরিয়ে কলেজের বারান্দায়। আমাদের রায়পুর ‘সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির’ মেলবন্ধন নির্ভর একটি উপজেলা। কলেজে কিংবা খেলার মাঠে দলমতের উর্ধ্বে ছিলাম আমরা। বলা যায় বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। রায়পুর-লক্ষ্মীপুর-২ আসনটিতে বরাবরই প্রার্থী হতেন- বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। উপ-নির্বাচনে ব্যারিস্টার মওদুদ আর আমাদের হারুন-উর-রশীদ মুখোমুখি। তাঁকে জেতাতে এমন কোন বাড়ি নেই- যেখানে ভোট ভিক্ষা চাইনি। কাউকে জোর করতে হয়নি। মানুষ উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন নৌকায়। দীর্ঘদিন পর রায়পুর পেলে আওয়ামী লীগের কোন সাংসদ। যদিও স্বাধীনতা/চেতনা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে হারুন-উর-রশীদের পরিবারের অবস্থান নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা বিস্তর। সে বিতর্কে আমি যাচ্ছি না।
দশ).
৯৬ সালের নির্বাচনে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জেও যাওয়া হয়েছে। ওবায়দুল কাদেরকে নির্বাচনী ক্যাম্পের প্রচারণায় আমরা সঙ্গি ছিলাম। নোয়খালীর ছাত্রলীগের মামুন আমাদের বাড়িতে অনেক এসেছে। বিএনপি-জামায়াতের রোষাণল থেকে বাঁচতে লক্ষ্মীপুরের অনেকের আশ্রয় ছিল আমাদের এলাকায়। টুমচরের ‘মাসুদ/রহীম’ যাদের মারফতে লক্ষ্মীপুর কলেজের ছাত্রলীগের সবুজ ভাইসহ অনেকের সাথে ছিল গভীর সখ্যতা। সময়েÑঅসময়ের আড্ডা। বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও আমাদের মাঝে ছিল সম্প্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। যা এখনকারদের মাঝে নেই।
এগার).
আমাদের গ্রামের বাড়ি (শায়েস্তানগর) এলাকায় তরুণদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন কাজল ভূঁইয়া। বর্তমানে রায়পুরে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের সভাপতি। পরবর্তীতে গোফরান উদ্দিন মিস্টার ভাইসহ ছাত্রলীগ/যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের একটি ভালো টীম ছিলাম। চালতাতলি বাজারে মিলিত হতাম নিয়মিত। মূলত: প্রয়াত কামাল ভূঁইয়ার অনুসারি ছিলাম। মনে পড়ে অজয় কর খোকন বাহাদুর বেপারির কথা। এরপর নজরুল ইসলাম বাবু ও লিয়াকত শিকদার। এদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় আকৃষ্ট ছিলাম। ছাত্র জীবনে ‘শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি’ এই শ্লোগানকে মনে হতো জীবনের একটি অনুসঙ্গ। একবার উচ্চারণ করার পর নতুন উদ্যমে চলার শক্তি পেতাম। কিন্তু এখন সেটা পাই না। এ দায় কার? আমি অনুপ্ররেণা পাই তখনই, যখন দেখি আমার জন্মভূমি প্রিয় রায়পুরে ‘তরুণ মারুফ বিন জাকারিয়া কিংবা প্রবীন মামুনুর রশীদ’র মতো অসংখ্য ‘ক্লিন-ইমেজের’ মানুষরাও আছেন। একই ভাবে বিরোধী দলের অনেক ব্যক্তিত্ব-সম্পন্নরাও রয়েছেন। আমরা কেউ পরিপূর্ণ মানুষ নই। আমাদের আদর্শ/মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। তাই বলে অন্যায়কে-অন্যায় বলার সাহস পাবো না? দলীয় নেতাদের ভুলকে ভুল বলবো না?
বার).
১৯৯৮ সাল থেকেই লেখা-লেখির সুত্রে গণমাধ্যমের ক্ষুদ্র কর্মী। সেখান ‘খ্যাত-অখ্যাত-কুখ্যাত’ যাই বলি না কেন; অনেক ম্যাগাজিন ও সাপ্তাহিক ও দৈনিকে কাজ করার সুযোগ। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে ফিচার বিভাগ ও বিশ্ববিদল্যায় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করি। রাজনীতি ছেড়ে কলম ধরি। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দুটি টিভি চ্যানেলে কাজ করেছি দেশে। ২০০১-২০০৬ ঢাকায় সালে ছাত্রদলের হাতে লাঞ্চিত হই। হই অবরুদ্ধ। তাদের শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতায় মুক্তি পাই। এভাবেই চলে আমার কলম-সৈনিকের জীবন। কিন্তু কোন দিন বিবেকের কাছে বিক্রি হয়ে যাইনি।
তের).
২০০৮ সালে সবশেষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাই। আমরা দু’ভাই ঢাকার ভোটার। ছোট ভাই রাইয়ান চৌধুরী রাশেদ তখন প্রথম ভোটার। রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও পরিবারের সবাইকে উদ্ভদ্ধ করেছি নৌকায়-ভোট দিতে। উৎসাহ-উদ্দীপনায় সবাই আমার কথা রেখেছিল। একমাত্র বাবাকে পারিনি। কারণ, তিনি ছিলেন এরশাদের কট্টর/অন্ধ ভক্ত। আমাদের বাড়ির সামনে বাপের হাতে ‘লাঙ্গল’ ঝুলতো আর ছেলের ‘নৌকা’। সংসারের বড় ছেলে বলে এ নিয়ে অনেকের সমালোচনার মুখেও পড়েছি। কিন্তু আমার বাবা সর্বদা বলতেন- ‘তোমার বিবেক যা ভালো লাগে তাকে সমর্থন করবে। আমি বাধা দেবো না’। একই সাথে তিনি বলতেন- ‘যাই করো বাবা-পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষা-সম্প্রীতি ও সততার আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুতি হবে না’। প্রয়াত পিতা ও সন্তানের সেই ‘ক্যামেস্ট্রি’ আমাকে ব্যথিত করে এবং স্বপ্ন দেখায়। আমার আজকের যে ক্ষুদ্র অবস্থান, সেটা কেবল আমার মায়ের অনুপ্রেরণা আর বাবার সততা ও আদর্শ। যা আমাকে সর্বদা জাগ্রত রাখে।
চৌদ্দ).
‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ একটি প্রাচীনতম রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে এর যাত্রা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ থেকে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে অগ্রণি ভূমিকা পালন করেছে। আজকে সেই ছাত্রলীগের নৈতিক অবস্থান কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের তরুণরা আজকে বিবেক-বিবর্জিত। মেধার বদলে অস্ত্র আর পেশী-শক্তির প্রতিযোগিতা। এসব তো হবার কথা ছিল না। আমার বিবেক বলছে তুমি কোন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী নও, তুমি একজন সাংবাদিক। যদিও ততটা যোগ্য আমি নই। কিন্তু সত্য প্রকাশে আপোষহীন।
পনের).
আমাদের স্থানীয় উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচনেও আমাদের মাঝে ছিল সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন। যা এখন একেবারেই নেই। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে! ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে আমার বিবেককে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করছে। আইয়্যুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের আদলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচলন। দলীয় প্রতীকের ব্যবহার। যা আমাদের পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরো সংকুচিত করেছে। হরণ করেছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে। যার ফলে স্থানীয় নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্বে ‘দুর্নীতি/সন্ত্রাসী’, ইয়বা ও মাদকের ছড়াছড়ি। যাতে করে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। আমরা এখন অন্ধ। সুবিধাভোগি রাজনীতি আর দলান্ধকায় আবদ্ধ আমাদের বিবেক। রাজনৈতিক চেতনা নামধারি বিভাজন আমাদের আরো তলানিতে নিবে।
ষোল).
২০১৪ সালে বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নিলেও ২০১৮-এর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছে। বিএনপির মতো এতবড় একটি দল ৫ টি আসন পাওয়া! এমন নির্বাচনী ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা ও বাস্তবতা নিয়ে তর্ক করাটাই তো বোকামি। নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, বিবিসি ও আলজাজিরাসহ বিশ্বগণমাধ্যমে আমরা শিরোনাম। যাতে উঠে আসছে ভোট-কেন্দ্র দখল/ব্যালট বাক্স ভর্তির খবর। দেয়া হয়েছে- স্বৈরাচারি ও ‘অটোক্রেটিক-গভর্মেন্টের’ উপাধি। যারা একাদশ জাতীয় নির্বাচনী ফলাফলে তুষ্ট! তাদের সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ‘সিইসি/ইসি সচিবের’ মন্তব্যের পাশাপাশি সেনাপ্রধান বললেন- ‘৪৭ বছরে এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ আর তিনি দেখেননি’! পুলিশ, র‌্যাব ও সরকার প্রধানের মন্তব্য একই।
সতের).
আমাদের পরণে কাপড় নেই, তা যদি অন্যরা দেখিয়ে দেন, তখন যদি আমরা বলি- ‘এসব কিছু না, ঠিক আছে’। তাহলে তো বলার কিছু নেই। আমার প্রিয় সহপাঠি/ছোটবেলার খেলার সাথি/অগ্রজ কিংবা অনুজ অনেকেই আছেন সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তাদের বলবো- আওয়ামী লীগের সমর্থক/কর্মী কিংবা নেতৃত্ব! এসবে কোন অপরাধ নয়। যা হতে পারে গর্বের’ও। যারা অন্তত বিবেক-বুদ্ধির চর্চা করেন তাদের বলছি। কিন্তু এমন একটি নির্বাচনকে প্রকাশ্য জায়েজ করা কতটা যৌক্তিক? দলের স্বার্থে অন্তত সামাজিক মাধ্যমে কমেন্ট-স্ট্যাটাস থেকে বিরত থাকতে পারেন। মানা-না মানা আপনাদের ব্যক্তিগত বিষয়। আপনি আমার মতকে অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু আমাকে ইনবক্স করে জ্ঞান দেয়াটা কি ঠিক?
আঠার).
একবার ভেবে দেখুন আওয়ামী লীগের মত এত বড় দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল জলীল। তাঁকে কজনে মনে রেখেছেন? মাটির মানুষ ছিলেন আবদুর রাজ্জাক ভাই। সততার অনন্য দৃষ্টান্ত বলা যায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। এদের কথা ক’জনে বলছেন? এরকম অসংখ্য নেতা রয়েছেন। আমরা জাতীয় চার নেতাকে কতবার স্মরণ করি? বছরে মাত্র একটি দিন! জেল হত্যা দিবস আর বুদ্ধিজীবী দিবস-এই তো? ডবপরীতে প্রতিদিনই ‘চেতনার রাজনীতি/মুক্তিযুদ্ধ/জামায়াত/সন্ত্রাসী/বিএনপি/জঙ্গি! এসবে পড়ে আছি। বঙ্গবন্ধুকে যত্রতত্র ব্যবহার। নেত্রীর অতিরিক্ত তৈলমর্দন। আমাদের কতটা নির্লজ্জ করেছে? আমরা তা ভাবছি কি? বস্তুত আমরা বর্তমানে বিশ্বাসী। আগামিতে নই। এর ফলাফল ভয়ঙ্কর। যা আমাদের দেশ ও সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই-
তব্ওু, আমি আশাবাদি মানুষ। এই ক্ষুদ্র বয়সে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। আমাদের চাওয়া হউক সুন্দর একটি বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে না দুর্নীতি। থাকবে না মিথ্যাচার। অটুট থাকবে আইনের শাসন ও বিচার-বিভাগের স্বাধীনতা। মানুষ তার পছন্দের দলের পক্ষে কথা বলবে। বিরোধীদের সমালোচনা হজম করার ক্ষমতা থাকবে। বন্ধ হবে ৪৭ বছরের পুরনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামক রাজনীতি। যাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আমরা দিনকে দিন বিভাজিত জাতিতে রূপ নিয়েছি/নিচ্ছি। ‘পুলিশ/র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম-খুন বন্ধ হবে। ধর্ষণ-হানাহানি বন্ধ হবে। ক্রস-ফায়ারের নামে বিনা-বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ হবে। কোন শিশু-কিশোর/কিশোরী হারাবে না তার পিতাকে/স্ত্রীকে স্বামীকে/মা সন্তানকে। অপরাধিকে তার সাজা ভোগ করার পাশাপাশি আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে। এরই নামইতো হবে স্বাধীন-সোনার বাংলাদেশ! তাই নয়? সেই প্রত্যাশায়।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
নিউইয়র্ক।