বিয়ানীবাজারে জয়িতাদের আঁধারে ঢাকা অতীত

সিলেট : একজন সংগ্রামী অপ্রতিরোধ্য নারীর প্রতীকী নাম জয়িতা। কেবল নিজের অদম্য ইচ্ছাকে সম্বল করে চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে জয়িতারা সমাজে নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। জয়িতারা বাংলাদেশের বাতিঘর। তাদের দেখে অন্য নারীরা অনুপ্রাণিত হলে ঘরে ঘরে জয়িতা সৃষ্টি হবে। আর তা হলেই বাংলাদেশ তার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে বলে মনে করেন বিয়ানীবাজার উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা চন্দন কুমার চক্রবর্তী।

তিনি বলেন, জয়িতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বিয়ানীবাজারের তিন নারীর অন্ধকার অতীত যে কাউকে আবেগপ্রবণ করে তুলবে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকতার কার্যালয় এবার তিন নারীকে জয়িতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এখন ওই তিন নারীর প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী। চরম অর্থসংকটেও স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে নিয়ে এখন শিক্ষিকা পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছেন শাহজাদী খালেদা আক্তার, পরকীয়ায় আসক্ত স্বামী তালাক দেয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানো মরিয়ম বেগম এবং কন্যাদায়ের চাপ কমাতে স্বামীকে না দেখিয়ে বিয়ে দেয়া হেলনা বেগম জানিয়েছেন তাদের পেছনের গল্প।

শাহজাদী খালেদা আক্তার জানান, মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর জন্ম হয় তার। উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের বাঙ্গালহুদা গ্রামের পিতা মৃত আবু ইউসুফ সিদ্দিকী ছিলেন সামান্য বেতনের সরকারি কর্মচারী। জন্মের পর অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা শাহজাদী খালেদা নিজের মানসিক জোরে স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। মাত্র ১০৫০ টাকা বেতন স্কেলে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি নেন তিনি। অসুস্থতায় কাবু হয়ে মা রহিমা খাতুন মারা যান। অসুস্থ পিতা, ছোট তিন বোন, দুই ভাই নিয়ে সামনের পথে ছুটে চলেন শাহজাদী খালেদা। প্রাইভেট টিউশনি পড়ানোর পাশাপাশি হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আর এতে ধীরে ধীরে সচ্ছলতা আসতে থাকে তার। নিজের আয়ে তিন বোনকে বিয়ে দেন, দুই ভাইকে প্রবাসে পাঠান খালেদা। বর্তমানে তিনি কাকরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।

মরিয়ম বেগম জানান, মাথিউরা ইউনিয়নের নিজগ্রাম মিনারাইয়ের পাশে পুরুষপালে বিয়ে হয় মরিয়ম বেগমের। তাদের দুই সন্তানের জন্মের পর প্রবাসী দেবরকে বেশ ঘটা করে বিয়ে দেন তিনি। বিয়ের পর দেবর চলে যান ফের প্রবাসে। এই সুযোগে স্বামী ছোট ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। ২০০১ সালে এই পরকীয়ার জেরে স্বামী তাকে তালাক দেন। দুই সন্তান নিয়ে মরিয়ম চলে আসেন বাপের বাড়ি। ছয় ভাই বোনের সংসারে খেটে খাওয়া শুরু করেন। পিতা ফয়জুর রহমানের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না।

বিপথগামী স্বামীর দেয়া মোহরানার টাকায় কয়েকটি হাঁস-মুরগি কিনেন। বাড়ির পাশে পুকুরে মাছ চাষ করেন। আর এভাবে তার হাতে আসতে থাকে পরিশ্রমের উপার্জন। বড় ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর নিজের উপার্জিত টাকায় দুবাইতে পাঠান মরিয়ম বেগম। ছোট ছেলে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণিতে লেখাপড়া করে।

হেলনা বেগম জানান, অভাবী পিতা মনোহর আলীর মাথা থেকে কন্যাদায়ের চাপ কমাতে বিয়ে দেয়া হয় তাকে। বিয়ে অনুষ্ঠানের আগে একনজরও স্বামী জামিল আহমদকে দেখেননি তিনি। এখন ওই স্বামীকে অটোরিকশা কিনে দিয়েছেন হেলনা। আরেকটি অটোরিকশা ভাড়ায় চালায় চালক। দু’টি অটোরিকশাই হেলনের নিজের আয়ে কেনা। অথচ বিয়ের পর একটি ঝুপড়ি ঘরে তাকে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে কেটেছে বহুদিন। শাশুড়ি-জা’র সংসারে সকল কাজ নিজেই করতে হয় তার। সংসারের দৈনন্দিন কাজ শেষে ভাত জুটত না হেলনা বেগমের। ভাত খেতে বসলে জা নিজে এসে তরকারি বেটে দিতেন।

একপর্যায়ে বেকার স্বামীকে আলাদা করে দেন শাশুড়ি ও জা। তখন দিন বদলানোর প্রতিজ্ঞা করেন হেলনা বেগম। এখন ওই নারী মাথিউরা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য। সন্তানদের নিজে পড়ান। তার স্বামীর বাড়ি দুধবকসি গ্রামে। পুরণো বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা এ নারী ‘জয়িতা’র স্বীকৃতি পেয়েছেন।