বিয়ের মাধ্যমে গ্রিনকার্ডের চেষ্টা এখন ডিপোর্টেশনের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে

কাজী ইবনে শাকুর : বিয়ের মাধ্যমে আমেরিকায় বসবাসের যে সুযোগ এতদিন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতো এখন তা আমেরিকা থেকে নির্বাসনের জন্য আইসের (ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা বিয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন আবেদন মঞ্জুর করলেও আইস কর্মকর্তারা একতরফাভাবে নানা অজুহাতে তা বাতিল করে দিচ্ছে। গ্রেফতার করছে আবেদনকারীকে। ডিপোর্ট করছে। ডিপোর্টেশন পেয়ে ১৩ বছর পর বিয়ের মাধ্যমে সন্তানের জনক হলেও বৈধতা পাচ্ছে না। নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হচ্ছে আবেদনকারীকে। অবশেষে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে পগারপার করছে। ত্বরিত গতিতে আইস প্রস্তুত করে অজুহাত। যাতে আবেদনকারীকে অবৈধ প্রমাণ করে ফেরত পাঠানো যায়।
নিউইয়র্ক টাইমসে এক ঘটনার উল্লেখ করে এক রিপোর্টে বলা হয় এক দম্পতির রয়েছে ৫ বছরের সন্তান। তাদের সন্তান বলে আত্মীয়দের কাছ থেকে এফিডেফিট রয়েছে। বিবাহিত দম্পতি হিসেবে জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এখন তারা প্রায় এক স্বাভাবিক দম্পতির মতো জীবনযাপন করে। ব্রাজিলিয়ান নাগরিক ‘কারাহ’ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য আদেশপ্রাপ্ত হওয়ার ১৩ বছর পর যখন বৈধতার জন্য অপেক্ষা করছেন তখন এ ঘটনা ঘটে। সাক্ষাৎকারের সময় ইমিগ্রেশন অফিসার এসে বললেন ‘তোমাদের জন্য আমার কিছু সুসংবাদ এবং কিছু দুঃসংবাদ আছে। সুসংবাদ হচ্ছে আমি আবেদন মঞ্জুর করতে যাচ্ছি। আর দুঃসংবাদ হচ্ছে এখানে আইসের লোক আছে।’
আর তারপর কারাহকে নিয়ে যাওয়া হয় ম্যাসাচুসেটসের লরেন্সে এক ইমিগ্রেশন অফিসে। সেখানে হ্যান্ডকাপ নিয়ে অপেক্ষমান দু’জন আইস এজেন্ট। কারাহ ক্ষমা চাইল তার স্ত্রীকে এমন অসুবিধায় ফেলার জন্য। আর স্ত্রী স্বামীকে চমু খেলো। অর্থাৎ কারাহকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো। স্ত্রী বললেন, ‘আমি যা করার দরকার করবো।’
ডোনান্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন নীতিতে বিয়ে, চাকরি, বাড়ি কিংবা পরিবার ইমিগ্রেশনের জন্য তেমন কোনো বিষয় না। বিয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন এখন অলীক বস্তু হয়ে গেছে। অবৈধ কেউ থাকলে তারা, স্ত্রী, পুত্র যারা আমেরিকার সিটিজেন তাদের মাধ্যমে বৈধতা চাচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বিনা অপরাধী হাজার হাজার ইমিগ্র্যান্টকে গ্রেফতার করছে। এমনকি বৈধ ইমিগ্র্যান্টদের বৈধতা নিয়েও তুলেছে বিভিন্ন প্রশ্ন। তারা বলছে, এসব বৈধতা পেয়েছে অতীতের নমনীয় পদ্ধতির জন্য। যখন ইমিগ্রেশন ও সিটিজেনশীপ কর্তৃপক্ষ কারো বৈধতার আবেদন মঞ্জুর করে আইন তা নাকচ করে গ্রেফতার করে।
উইলিয়াম জয়স নামে একজন সাবেক ইমিগ্রেশন জাজ যিনি এখন বস্টনে ইমিগ্রেশন আইনজ্ঞ হিসেবে প্রাকটিস করেন। তিনি বলেন, এই ইমিগ্রেশন এক জুয়া খেলার মতো। যেমন লাস ভেগাসের ‘রুইতন’ রং চাল দিয়ে জুয়ার লিড দেওয়া। শতভাগ কোনো নিশ্চয়তা নেই সাক্ষাৎকারে গেলে, আপনি নিশ্চয়তার জন্য ভেতরে যাবেন কিন্তু বের হয়ে আসতে পারবেন না। যে দম্পতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা ৮ বছর ধরে চেনাজানা। স্বামী পিজা প্লাসে এবং স্ত্রী ডানকিন ডোনাটে কাজ করে। তিন বছর পর তাদের এক সন্তান হয়। কিন্তু তাদের বিয়ে হয় ২০১৬ সালে। স্বামী বিয়ে করেনি এতদিন কারণ সে এমন ধারণা তার ভালোবাসার স্ত্রীকে দিতে চাননি যে, সে গ্রিনকার্ডের জন্য বিয়ে করছে। কিন্তু বিয়ের পর বৈধ স্ট্যাটাস না থাকায় তারা হানিমুন করতে পারেনি। তারা সন্তানকে নিয়ে একত্রে কোথায়ও যেতে পারে না। স্ত্রী বলেন, তার স্বামীকে গ্রেফতার করা হয় কারণ সে সব কিছু আইনসিদ্ধভাবে করতে চেয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি সে গ্রেফতার হয়। মনে হচ্ছে তাকে গ্রেফতারের জন্য ইন্টারভিউ নির্ধারিত হয়েছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও অনেকেই এই ধরনের সমস্যায় পড়েছে। এক মাস পরে কারাহ অলিভারদের ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু অলিভারের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে ধরা হয়েছে যাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে, আর ট্রাম্প অপরাধী-নিরাপরাধী সবাইকে ধরছে। এই প্রশাসনের কাছে যারাই স্ট্যাটাস বিহীন তারাই ডিপোর্টেড হবে।
আইন এক সময় অনেক অবৈধ ইমিগ্র্যান্টকে এদেশে থাকতে দিয়েছে। কিন্তু এখন গ্রেফতার করছে অনেককে। ওবামা প্রশাসন ৬০১(এ) ওয়েভার ব্যবস্থা চালু করেছিল। তার মাধ্যমে ডিপোর্টেশন প্রাপ্তরা পরিবার একত্রীকরণ আইনে স্বদেশে গিয়ে আবার গ্রিনকার্ড নিয়ে আসতে পারতো। এখন ৬০১(এ)-এর কার্যকারিতা সন্দিহান হয়ে পড়েছে। কেউ এই প্রক্রিয়ায় ওয়েভার নিয়ে দেশে গিয়ে আসতে চায় না। কারণ দেশে ফেরত গেলে গ্রিনকার্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

বিয়ের মাধ্যমে বাছাই প্রক্রিয়া :
সকল বিয়েকে স্থায়ী গ্রিনকার্ডের উপযুক্ত করতে অবশ্যই বাছাই প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে। আর সেই বাছাই প্রক্রিয়ার সময় বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। পৃথকভাবে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের একই উত্তর হতে হবে। স্ত্রী ও স্বামীকে পৃথক রুমে প্রশ্ন করবে। যেমন : কখন তোমাদের দেখা হয়? তোমার স্ত্রী কিংবা স্বামীর কি ট্যাটু আছে। তোমরা যখন ডেটিং শুরু কর তখন কোন ছবি দেখেছ। একটা উপদেশ হচ্ছে সাক্ষাতের সময় ‘গ্রিনকার্ড’ শব্দ উল্লেখ করবে না। দম্পতিকে অবশ্যই তাদের সম্পর্কের সত্যতার প্রমাণ দিতে হবে। তাদের একত্র বসবাস ও একসাথে সময় কাটানোর ছবি দিতে হবে। তারপরও সকল প্রশ্নের উত্তর যথাযথ দিলেও গ্রিনকার্ড পাওয়া নিশ্চিত নয়।
যে সব প্রশ্নের ধরন তার কিছু নমুনা : কিভাবে তোমরা দেখা পেয়েছ? দেখা হওয়ার কত সময় পরে তোমরা ডেটিং করেছ? কখন তোমরা একে অপরের পরিবারের সাথে মিলেছ? কিভাবে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ? কোথায় তোমরা আংটি কিনেছ? বিয়ে কেমন ছিল? কারা উপস্থিত ছিল? তারপর কি করেছ? কোথায় খেয়েছ?
কথা হচ্ছে ইমিগ্রেশন অফিসারকে তোমার প্রেমকাহিনী বলতে হবে। জীবনযাপনের খুঁটিনাটি বলতে হবে। আর জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইমিগ্রেশন অফিসার ধরেই নেবে যে, বিয়েটা একটা ফ্রড কাহিনী।
কেউ মিথ্যা বলতে ধরা পড়লে জেল খাটতে পারে এবং ২৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুণতে হতে পারে। আর কখনও তারা বিয়ের মাধ্যমে গ্রিনকার্ড পাবে না। অনেক সময় ইমিগ্র্যান্ট অফিসার আরও কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারে।
তোমার বেডরুমের ডায়গ্রাম আঁক?
কিভাবে তোমার ঘরে তুমি প্রবেশ কর?
তোমার স্বামী বা স্ত্রী কোন সাবওয়ে ব্যবহার করে?
গত রাতে কি করেছ?
তোমার ক্রিসমাসের সময় বা ঈদের সময় কি করেছ?
তোমার স্ত্রী বা স্বামীকে কি পুরস্কার দিয়েছ?
তোমার স্বামী বা স্ত্রী কখন তার শাশুড়িকে দেখেছে।
কোথায় তোমার গ্রাম, তোমাদের শালা-শালী বা ননদ-দেবরের সাথে মিলেছ?
তোমার স্ত্রী বা স্বামীর ট্যাটু আছে অথবা তারা কি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে?
আরও কঠিন প্রশ্ন হতে পারে যেমন :
তোমরা তোমাদের বাড়ি অথবা পার্ক ভ্রমণ করো। যাতে দেখতে পারি সেখানে আসলে তোমরা থাক কিনা। প্রতিবেশীর সাথে কথা বলো।
তারপর পাবলিক রেকর্ডের কথা বলতে পারে।
এরপরও ইমিগ্রেশন অফিস রাজি না হলে তারা ইনটেন্ট টু ডিনাই দিতে পারে।