বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সাধারণ সভা: ফিউনারেল হোম ও আরেকটি ভবন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত

ঠিকানা রিপোর্ট: প্রবাসের অন্যতম আঞ্চলিক এবং আদর্শিক সংগঠন দি গ্রেটার নোয়ারখালী সোসাইটির সাধারণ সভায় একটি ফিউনারেল হোম এবং আরো একটি ভবন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সাধারণ সভাটি গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ব্রুকলীনস্থ নোয়াখালী ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের নব নির্বাচিত সভাপতি নাজমুল হাসান মানিকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টুর পরিচালনায় সাধারণ সভায় মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন সংগঠনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হাজী মফিজুর রহমান, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম ভূইয়া, খোকন মোশাররফ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তাজু মিয়া, হেলাল সোহেল, আবুল কামাল, সদ্য বিদায়ী সভাপতি এবং বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুর রব মিয়া, সিপিএ সরোয়ার বি সালাম, কোষাধক্ষ মহিউদ্দিন প্রমুখ।
সাধারণ সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অডিট কমিটির চেয়ারম্যান আবুল কাশেম, অডিট কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, এ কে এম রশিদ আহমেদ, মোহাম্মদ শামসুল আলম, মোহাম্মদ নূর আলম ছিদ্দিকী মুন্না, প্রধান নির্বাচন কমিশনার করিমুল হক, কোম্পানীগঞ্জ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন সবুজ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু সুফিয়ান, কোম্পানীগঞ্জ এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মালেক, আব্দুল মান্নান, আহসান উল্যাহ বাচ্চু, কোম্পানীগঞ্জ সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহ আলম, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিনহাজ উদ্দিন বাবর, সেনবাগ সমিতির উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সরোয়ার্দী, কোম্পানীগঞ্জ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লতিফুর রহমান লিটন, ড্রামের সাংগঠনিক পরিচালক কাজী ফৌজিয়া, সংগঠনের সাবেক সহ সভাপতি আবুল কাশেম প্রমুখ।
সাধারণ সভার শুরুতেই কোষাধ্যক্ষ মহিউদ্দিন অডিট রিপোর্ট পেশ করেন। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই রিপোর্টে উল্লেখ্য করা হয়- গত এক বছরে সংগঠনের আয় হয়েছে ৪১৯৮৫৫.৯৯ ডলার এবং ব্যয় হয়েছে ১৩২১৯৯.১১ ডলার। মোট স্থিতি রয়েছে ২৮৭৬৫৬.৮৮ ডলার। যার মধ্যে ব্যাংকে রয়েছে ২৭৯৯৩১.০৮ ডলার এবং নগদ স্থিতি ৭৭২৫.৮০ ডলার। খাত অনুযায়ী আয়গুলো হচ্ছে- সদস্য ফি বাবদ ৬৫৮৮০ ডলার, বাড়ি ভাড়া বাবদ ৫২০০৮ ডলার, অফিস ভাড়া বাবদ ২৯৫০ ডলার, করবস্থান বিক্রি বাবদ ২৯৩৭৫ ডলার এবং বিবিধ ১৭৪.৪৭ ডলার এবং ব্যয় কবরস্থানের কিস্তি বাবদ পরিশোধ ১১৫০০০ ডলার, ২০১৭ সালের সাধারণ সভার খরচ ১২০০ ডলার, মৃত সদস্যদের দাফন বাবদ ৪৫০০ ডলার, অফিসের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৭৯০ ডলার, ভবনের পানির বিল বাবদ ১১৭৫.৫২ ডলার, ভবনের প্রপার্টি ইন্স্যুরেন্স বাবদ ১৬৯৩.১০ ডলার, ভাবনের প্রপার্টি ট্যাক্স বাবদ ৩৪৭২.০৩ ডলার, বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০০ ডলার, প্রিন্টিং বিল বাবদ ৭৫০ ডলার এবং বিবিধ খরচ ৩১১৭.৭১ ডলার।
কোষাধ্যক্ষের রিপোর্টের উপর আলোচনার পর এই রিপোর্ট সাধারণ সদস্যদের কন্ঠভোটে পাশ হয়। এত স্বচ্ছ এবং পরিছন্ন রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয় যে যা নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন উস্থাপনের সুযোগ ছিলো না। বরং বক্তারা এই স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন রিপোর্টের জন্য অডিট কমিটি এবং বর্তমান কার্যকরি কমিটিকে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, এমন সুন্দর রিপোর্ট সাধারণত দেখা যায় না। বর্তমান কমিটি এবং অডিট কমিটি প্রতিটি হিসাবের চেক নম্বর এবং বুক নম্বর সুন্দরভাবে রিপোর্টের সাথে যোগ করে দেন।
কোষাধ্যক্ষের রিপোর্ট পাশ হওয়ার পর সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টু গত এক বছরের সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকান্ড তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংগঠনের সভাপতি আব্দুর রব মিয়া বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি পদে নির্বাচন করার জন্য পদত্যাগ করেন। তার পদতাগের পর সিনিয়র সহ সভাপতি নাজমুল হাসান মানিক ভারপ্রান্ত সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত সপ্তাহে কার্যকরি কমিটি, ট্রাস্ট্রি বোর্ড এবং উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ সভায় সংগঠনের স্বার্থে এবং সংবিধানিকভাবে জনাব মানিককে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। যৌথ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নাজমুল হাসান মানিক ২০২০ পর্যন্ত সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, সত্যি কথা বলতে আমরা যারা কমিটিতে আছি তারা আল্লাহকে ভয় করে কাজ করি, যে কারণে কোন অনিয়মের সুযোগ থাকে না এবং আপনাদের কোন অভিযোগও থাকে না। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনের ফান্ডে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ডলারের মত আছে। এই অর্থ দিয়ে আমরা একটি ফিউনারেল হোম এবং আরো একটি নতুন ভবন ক্রয় করতে চাই। ইতিমধ্যেই আমরা ফিউনারেল হোম নিয়ে বিভিন্ন জনের আলাপ আলোচনা শুরু করেছি। তার এই পরিকল্পনা উপস্থাপনার সাথে সাথেই হল ভর্তি সদস্যরা করতালির মাধ্যমে এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান এবং সমর্থন প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, আমরা নোয়াখালী সমিতি এবং প্রবাসে বসবাসরত নোয়াখালীবাসীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সব সময়ই আমাদের মাথায় থাকে কীভাবে নোয়াখালীবাসী লাভবান হন। তিনি আরো বলেন, আপনারা জানেন, নোয়াখালীর অনেক তরুণ ছেলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় আসছে। এর মধ্যে কারো কারো স্বপ্ন গ্র্যান্ড নদীতে ভেসে যাচ্ছে। মানবিক কারণেই সেই সব মৃতদের দেশে লাশ পাঠানো আমাদের দায়িত্ব সেই কাজটি আমরা করে যাচ্ছি। আপনারা জানেন ২ বছর আগে আরমান নামের নোয়াখালীর এক সন্তান মৃত্যুবরণ করেন। ড্রামের কাজী ফৌজিয়া আমাদের বিষয়টি জানান। আমরা আরমানের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের দাবি অনুযায়ী তার লাশ বাংলাদেশে পাঠাই। গত রমজানে আরো ২ জন মারা যায়। তাদের লাশও তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। আবার উদ্ধৃত অর্থ ঐ সব পরিবারের সদস্যদেরও প্রেরণ করি। তিনি আরো বলেন, গত অক্টোবরে কাজী আজিজ নামে আরো একজনের লাশ সনাক্ত করা হয়। কিন্তু তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলে তারা লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এই অবস্থায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটিও লাশ বেশি দিন রাখতে চায় না, বলে দিলেই তারা লাশ ফেলে দেবে। এই অবস্থায় আমরা তা বলতে পারি না। সে একজন মুসলমান এবং নোয়াখালীর সন্তান। তাই আমরা নিজেরা সেই লাশ নিউইয়র্কে এনে নোয়াখালী সোসাইটির নিজস্ব করবস্থানে দাফন করতে চাই। আমরা যদি বলি লাশ নেবো না, তাহলে আগামীতে তারা আর আমাদের জানাবে না। যে হারে লোকজন আসছে তাতে এই ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে পারে। আগামীতে কেউ লাশ চাইলেও আমরা তা দিতে পারবো না। সাধারণ সম্পাদকের এই মানবিক আবেদনে সবাই সমস্বরে সমর্থন জানান। তিনি আরো বলেন, এই পথে আসতে একজন মানুষের জন্য ৫০ / ৪০ লাখ টাকা দালালকে দিতে হয়। তা ছাড়া জীবনও নিশ্চিত নয়, এই অবস্থায় আপনাদের উচিত- এই পথে না আসতে নিরুৎসাহিত করা। প্রয়োজনে ঐ অর্থ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করা বা অন্য কিছু করা। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমাদের ৪০০ কবর রয়েছে। যার বর্তমান মূল্য ৫ শত হাজার ডলার। ইতিমধ্যেই আমরা ৪৫৩২২৮ ডলার পরিশোধ করেছি। বকেয়া রয়েছে মাত্র ৪৭৭৭২ ডলার।

মোহাম্মদ আব্দুর রব মিয়া বলেন, আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন আপনাদের মতামতকে সব সময় মূল্যায়ন করেছি। আমি আপনাদের অফুরন্ত ভালবাসা পেয়েছি। সেই ভালবাসার কথা আমি কোন দিন ভুলবো না। আমি আপনাদের সাথে ছিলাম, আছি এবং আগামীতেও থাকবো। আমি নোয়াখালীবাসীর স্বার্থে বাংলাদেশ সোসাইটিতে নির্বাচন করছি। সুতরাং আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই।
হাজী মফিজুর রহমান বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি রব মিয়া, মানিক এবং জাহিদ মিন্টুর দক্ষ এবং স্বচ্ছ পরিচালনায় ইতিমধ্যে প্রবাসে একটি আদর্শ এবং অনুকরণীয় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এখন কারো কাছে আমাদের হাত পাতার দরকার নেই। আমরা নিজেরাই এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি বলেন, আমি যখন সভাপতি ছিলাম তখন সদস্য ছিলো ৬ হাজারের মত। অল্প অর্থে সদস্য করা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজের পকেটের অর্থ খরচ করে অধিক সদস্য করে আমিও অনেক দুর্ভোগে পড়েছিলাম। তারা যেহেতু ফি দিয়ে সদস্য হয় না সেহেতু সংগঠনের প্রতি তাদের কোন দায়িত্ববোধও থাকে না। সংগঠনের মধ্যে সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বলেন, সদস্যা সৃষ্টিকারী অধিক সদস্যের চেয়ে আমাদের ১৪ শত দায়িত্বশীল সদস্য অনেক ভাল। তিনি বলেন, আমরা দুর্নীতিবাজ এবং দুর্বৃত্ত সদস্য চাই না। অতীতে অনেকে সংগঠনের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং সংগঠনে মারামারির জন্ম দিয়েছেন- এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।
জাহাঙ্গীর সরোয়ার্দী বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি এক সময় তলাবিহীন ঝুড়ি থাকলেও এখন আর তা তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। এর জন্য তিনি বর্তমান কমিটিকে ধন্যবাদ জানান।
মিনহাজ উদ্দিন বাবার বলেন, আগে এক সময় বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ভোট নির্ভর সোসাইটি ছিলো, এখন কল্যাণনির্ভর সংগঠন এবং মানবিক সংগঠন।
আবু সুফিয়ান নিট এন্ড ক্লিন রিপোর্ট পেশ করার জন্য বর্তমান কমিটি এবং অডিট কমিটিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি শুণ্য পদ পূরণের জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তার প্রশ্নের জবাবে খোকন মোশাররফ বলেন, এভাবে শূন্য পদে নির্বাচন করতে গেলে সারা বছরই নির্বাচন করতে হবে। তিনি বলেন, তিন কমিটির যৌথ সভার সিদ্ধান্ত এবং সাংবিধানিকভাবেই শূন্য পদ পূরণ করা হচ্ছে। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের কোন দরকার নেই। তিনি সদস্য বৃদ্ধি এবং সদস্য ফি কমানোর প্রসঙ্গে বলেন, দুষ্ট গোয়ালের চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল। ফি কমিয়ে সদস্য বাড়িয়ে গন্ডগোল বাড়ানোর কোন দরকার নেই। অতীতে আমাদের এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। যারা নিজেরা সদস্য হচ্ছে, তাদের নিয়েই আমাদের সংগঠন পরিচালনা করা ভাল। গন্ডগোল না থাকার কারণে আমরা ফিউনারেল হোম এবং নতুন আরেকটি ভবন ক্রয় করার স্বপ্ন দেখছি। এই নেতৃত্বই আমাদের প্রয়োজন। এর জন্য বর্তমান কমিটি এবং জাহিদ মিন্টুকে ধন্যবাদ।
হাজী আবুল কাশেম বলেন, রিপোর্ট তৈরি করতে প্রেসিডেন্ট, সাধারণ সম্পাদকসহ সংগঠনের কর্মকর্তারা আমাদের সার্বত্মক সহযোগিতা করেছেন। কমিটির সহযোগিতা এবং স্বচ্ছ কাজগপত্রের কারণেই আমরা একটি প্রশ্নবিহীন সুন্দর রিপোর্ট তৈরি করতে পেরেছি।
মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, আমরা রিপোর্ট তৈরি করার সময় কমিটির কাছে যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। তারা সুন্দরভাবে লেজার মেন্টেইন করেছেন, যা অন্য কোন সংগঠনে দেখা যায় না।
শামসুল আলম বলেন, সত্যি কথা বলতে কী, আমরা সব কিছুই রেডি পেয়েছি। যে করণে আমরা শুধু রিভিউ করেছি।
সভাপতি নাজমুল হাসান মানিক তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আপনারা আমাকে যে গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন আমি আপনাদের সহযোগিতায় তা পালন করবো এবং নোয়াখালী সোসাইটির সুনাম অক্ষুন্ন রাখবো।
পুরো সাধারণ সভাটিতে ছিলো সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। যা অনেক সংগঠনেই দেখা যায় না। সুন্দর সাধারণ সভা শেষে সবাই বর্তমান কমিটির উপর আস্থা রেখে ভবন ত্যাগ করেন।