বেসামাল সরকার : ভয়ঙ্কর সঙ্কট সামনে

নিজস্ব প্রতিনিধি : আইনগত প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্য নির্ধারণে সরকার আপাত সফল হলেও রাজনৈতিক সংকট থেকেই গেল। বরং তা আরো তীব্র হয়েছে। সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনের চার মাস আগে থেকে এবং নির্বাচনের পরদিন থেকেই রাজনৈতিক ¯িতিশীলতা রক্ষা করে নির্বিঘেœ দেশ শাসন শেখ হাসিনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে। নি¤œ আদালতে দÐিত হলেও উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার আপিল অনিষ্পন্ন থাকা অব¯ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আইনগত অধিকার পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অতীতে এ ধরনের নজিরও রয়েছে। তবে তা নিশ্চিত নয়। অব¯াদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বেসামাল সরকারের সামনে ভয়ংকর সংকট অপেক্ষা করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের আশঙ্কা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সরকার পরিচালনা ও দেশে রাজনৈতিক ¯িতিশীলতা রক্ষা একতরফা ও সহজসাধ্য হলেও এবারে তা না-ও হতে পারে। কৌশলগত কিছু কারণে বিএনপি আপাতত নিষ্ক্রিয় থেকে অহিংস, শান্তিপূর্ণ অব¯া বজায় রাখলেও নির্বাচনের চার মাস আগে আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই, অর্থাৎ নির্বাচনের আগে এবং পরেও তাদের ভিন্ন মূর্তিতে দেখা যাবে। ঢাকাসহ ব্যাপক জনগণের সমর্থন-সহযোগিতা নিয়ে দলটির সর্বপর্যায়ের নেতা-কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে রাজধানী শহরসহ দেশের সকল মহানগর, জেলা, উপজেলায় অব্যাহত কর্মসূচি দিয়ে গোটা দেশ অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে রাখা হয়েছে।
রায়ে দÐিত হলেও বিএনপি ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক কোনো তৎপরতা, বিশেষ করে নৈরাজ্যকর কোনো কার্যক্রম চালায়নি, প্রধানত জনগণের সামনে এটা পরিষ্কার করতে চায় যে তারা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাÐের সঙ্গে অতীতেও সম্পৃক্ত ছিল না, এখনো নয়। তারা জঙ্গিবাদকে মদদ দেয় না, কোনোভাবে সমর্থনও করে না। সরকার ও সরকারি দল বিএনপির বিরুদ্ধে একেই প্রচার-প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আগামী নির্বাচনেও এটাই হবে তাদের মুখ্য প্রচারণা। এই প্রচারণার অপবাদ থেকে রক্ষা পেতে দল নেত্রীর চরম দুঃসময়েও বিএনপি রায়-পরবর্তী কোনো কর্মসূচিতে জামায়াতকে দূরে রাখছে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের একটা দূরত্ব গত দুই বছর যাবৎই দেখা যাচ্ছে। বিএনপি তাদের সঙ্গে করে কোনো কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলেই দলটির নেতারা মনে করছেন। যে কারণে জামায়াতকে এ পর্যায়ে সঙ্গে নিয়ে কোনো কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে না। ঝুঁকির দিকটি ছাড়াও জামায়াতের ব্যাপারে বিএনপির নেতাদের সন্দেহ, অবিশ্বাসও রয়েছে। তা সত্তে¡ও ভোটের স্বার্থে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ না করে কৌশলী সম্পর্ক রক্ষা করে চলার নীতি নিয়েছে বিএনপি। প্রতিবেশী ভারতের আ¯া এবং সন্ত্রাস জঙ্গিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দেশবাসীর পূর্ণ বিশ্বাস অর্জনের উদ্দেশ্যেই এ কৌশল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই জামায়াত প্রকাশ্য রূপে আসবে। সম্মিলিত বিরোধী শক্তির কর্মকাÐ নির্বাচন অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তবে সরকার বিরোধীদের সঙ্গে নানা কৌশল ও রহস্যজনক প্রক্রিয়ায় সমঝোতায় আসতে না পারলে লাগাতার মারাত্মক রকম রাজনৈতিক অ¯িতিশীলতা সৃষ্টি করা হতে পারে। সে ধরনের পরি¯িতিতে দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী মহলের নেপথ্যে ইঙ্গিতে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের অসামর্থ্যতার কথা বলা হলেও বিস্ময়ের হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এরই মধ্যে বলেছেন, বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সিইসির এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যপ্রসূত বলেই সরকারি মহল মনে করে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যের কাছে ৩২ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায় কি না ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মামলা আদালতের বিষয় বলে বিদেশি কেউ কোনো মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে না। তবে সরকার আদালতকে প্রভাবিত করছে বলে বিএনপির অভিযোগ এবং এ-সংক্রান্ত বক্তব্য, ঘটনাবলি তারা তাদের দেশকে নিয়মিত অবহিত রাখছেন।
সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে দেশে ¯িতিশীলতা রক্ষা করা। বিএনপি আপাতত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিলেও আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকেই তারা সর্বাত্মকভাবে মাঠে নামবে। তফসিল ঘোষণার আগেই তাদের কর্মসূচি আর অহিংস, শান্তিপূর্ণ থাকবে না। হরতাল, রেলপথ-রাজপথ-নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি দেওয়া হবে। অবরোধ, হরতাল লাগাতারও হতে পারে। বিমান চলাচল, সমুদ্রবন্দর অচল করে দেওয়া হবে। সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করতে চায় তারা। বিএনপি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চাইবে। সামনের দিনগুলো সংঘাতহীনভাবে সামাল দেওয়া কঠিন হবে সরকারের জন্য। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেগম খালেদা জিয়া সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের প্রশংসা করেছেন। বিএনপি আশা করছে, তারা আগামীতে নিরপেক্ষ অব¯ানে থাকবে। ব্যাপক জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারলে প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের ভ‚মিকা এখানকার মতো একতরফা সরকারের স্বার্থরক্ষাকারী না-ও হতে পারে। তাছাড়া প্রশাসন, বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতি বঞ্চিতদের পাশাপাশি জোট সরকারের সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত অফিসাররা রয়েছেন। সামনে তাদের ভ‚মিকা নিয়েও সরকারি দলের অনেকে সন্দিহান। এখনকার মতো নির্বাচন পূর্ববর্তী তিন মাস প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের ওপর সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ থাকবে না দুর্বল হয়ে আসবে। এ অব¯ার পাশাপাশি বিএনপিকে নির্বাচনে আনা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে দলের নেতৃত্বের কোনো অংশের পক্ষে নির্বাচনে যাওয়াও কঠিন হবে। তারা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের শিকার হতে পারেন। এরশাদের মতো গৃহপালিত কিছুসংখ্যক দল ও নামসর্বস্বদের নিয়ে একটা নির্বাচন করিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও নির্বাচন-পরবর্তী দিনগুলো সহজ না-ও হতে পারে।