ব্রুকলিনে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা নিলেন প্রায় ৪০০ প্রবাসী

নিউইয়র্ক : সেবা দিচ্ছেন কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা এবং ব্রুকলিনে নোয়াখালী ভবনের সামনে কনস্যুলার সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের উপচেপড়া ভিড় (ডানে)। ছবি ঠিকানা

ঠিকানা রিপোর্ট : শনিবার বেলা ১১টা। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন ১১৮ বেভারলি স্ট্রিটে নোয়াখালী ভবনের সামনে শত শত প্রবাসী বাংলাদেশির ভিড়। তাদের কারো হাতে পাসপোর্ট ও নো-ভিসার আবেদনপত্র, আবার কারো হাতে আরো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। সবাই এসেছেন কনস্যুলার সেবা নিতে। তাদের নানাভাবে সহায়তা করছেন বাংলাদেশ সোসাইটি এবং বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির কর্তাব্যক্তিরা। ভবনের ভেতরে কাজ করছেন কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা। এভাবে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় ৪০০ প্রবাসী ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা নিয়েছেন।
সেবা নিতে আসা প্রবাসীরা বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের সেবা ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ায় লং আইল্যান্ড সিটির অফিসে গিয়েও কাক্সিক্ষত সেবা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন ঘরের কাছে কনস্যুলার সেবা পেয়ে তারা দারুণ খুশি। এ আয়োজন করার জন্য তারা নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট, বাংলাদেশ সোসাইটি এবং বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ঘরের কাছে সেবা পেয়ে যেমন খুশি প্রবাসীরা, তেমনি কনস্যুলেটের প্রতি অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন বহু প্রবাসী। তাদের অভিযোগ, কনস্যুলেটে ফোন করলে সাড়া মেলে না। প্রয়োজনীয় তথ্যটুকুও তারা পান না। ফলে পাসপোর্ট আবেদন, নবায়ন, নো-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় সেবার জন্য তারা মাসের পর মাস নানাভাবে কনস্যুলেটের দ্বারস্থ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জাতীয় দিবসসহ সাপ্তাহিক ছুটির কারণে কনস্যুলেট বন্ধ থাকলেও প্রবাসীদের জন্য জরুরি সেবা চালু নেই। যে কারণে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্রুকলিনে কনস্যুলার সেবা নিতে ছুটে এসেছেন শত শত প্রবাসী। তারা নিউইয়র্ক কনস্যুলেট কার্যালয়ে ছুটির দিনে জরুরি সেবা চালু রাখার দাবি জানান।

নিউইয়র্ক : প্রবাসীদের দিনভর সার্বিকভাবে সহয়াতা করেন বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী সদস্য মঈনুল উদ্দিন মাহবুব। এসময় উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী সমিতির সেক্রেটারি জাহিদ মিন্টু। ছবি ঠিকানা

নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের প্রথম সচিব (পাসপোর্ট ও ভিসা) শামীম হোসেনের নেতৃত্বে একদল কর্মকর্তা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে নোয়াখালী সমিতির ভবনে অবস্থান করে কনস্যুলার সেবা দেন। সেবাগ্রহীতাদের বেশির ভাগই এসেছিলেন পাসপোর্টের নতুন আবেদন ও নবায়ন এবং নো-ভিসার জন্য। অনেকে এসেছিলেন দ্বৈত নাগরিকত্বের আবেদন করতে। এ ছাড়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, সত্যায়ন ও জন্মসনদের জন্যও এসেছিলেন অনেকে। তবে বাংলাদেশে সার্ভার আপগ্রেডের কারণে জন্মসনদের আবেদন গ্রহণ করেনি কনস্যুলেট। এ ব্যাপারে পরে কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী জানান, ব্রুকলিনে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশাল একটি অংশের বসবাস। করোনা মহামারির কারণে অনেকে কনস্যুলার সেবা নিতে পারেননি। কমিউনিটির ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রুকলিনে এ আয়োজন করা হয়েছিল। ঈদের পরে আবারো ব্রুকলিনে এই সেবার আয়োজন করবে বাংলাদেশ সোসাইটি। এর আগেও বাংলাদেশ সোসাইটির নিজস্ব কার্যালয়সহ নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২০ বার কনস্যুলার সেবার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, রোজার আগে ২৭ মার্চ অথবা ৩ এপ্রিল ব্রঙ্কসেও বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবে বাংলাদেশ সোসাইটি। এ ব্যাপারে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা যতবারই এই সেবার জন্য কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের সহায়তা চেয়েছি, ততবারই তাদের কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি।
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের এই সেবা কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে সহযোগিতা করেছেন বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মানিক, সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টুসহ অন্য কর্মকর্তারা। তারা বাংলাদেশ কনস্যুলেট এবং সোসাইটিকে এ আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ঘরের কাছে এ ধরনের সেবা পেয়ে ব্রুকলিনের বাংলাদেশিরা দারুণ খুশি। সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টু জানান, এর আগে নোয়াখালী ভবনে অনেকবার কনস্যুলার সেবার আয়োজন করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক : সেবা নিতে আসা অপেক্ষমান একজন সিনিয়র বাংলাদেশি। ছবি ঠিকানা

নোয়াখালী ভবনের সামনে অপেক্ষমাণ প্রবাসীদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী সদস্য ও কনস্যুলার সেবা কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়কারী মঈনুল উদ্দিন মাহবুব। তাকে সহযোগিতা করেন বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টু এবং বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী সদস্য সাদী মিন্টু।
বাংলাদেশ সোসাইটির ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলেটে সেবা কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টা আব্দুর রব মিয়া, বাংলাদেশ সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম ভূঁইয়া এবং স্কুল ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব।
ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলেটের সেবা নিতে ব্রঙ্কস থেকে আসা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহিম বাদশা ঠিকানাকে জানান, গত ১১ মার্চ ব্রঙ্কসে মৃত্যুবরণকারী হাজী মুহিবুর রহমানের লাশ দেশে পাঠানোর জন্য কনস্যুলেটের শিপমেন্ট ছাড়পত্র নিতে তিনি ব্রুকলিনে গিয়েছিলেন। কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট নির্মাণ ব্যবসায়ী বেলাল মাহমুদ কনস্যুলেটের সেবা নিতে নোয়াখালী ভবনে গিয়েছিলেন। তার কাজ সম্পন্ন না হলেও সঠিক পরামর্শ দেওয়ায় তিনি কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্রুকলিনে ঘরের কাছে এ ধরনের সেবার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় তিনি বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকর্তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
গত নভেম্বরে মেইল ইন সার্ভিসে মায়ের জন্য পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেছিলেন ব্রুকলিনের বাসিন্দা সালাহ উদ্দিন। গত চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র ডাক বিভাগের একটি সার্টিফায়েড রিসিপ্ট ছাড়া তার কাছে আর কোনো ডকুমেন্টস নেই। একাধিকবার কনস্যুলেটে ফোন করেও এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাননি। শনিবার ঘরের কাছে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলেটে গিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে তার মায়ের আবেদনের আপডেট জানতে চান সালাহ উদ্দিন। কিন্তু কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে সালাহ উদ্দিনকে কনস্যুলেট অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সালাহ উদ্দিন অভিযোগ করেন, পাসপোর্ট নবায়ন করতে না পারায় তার মা দেশে যেতে পারছেন না। চার মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে কোনো আপডেট তথ্য পাননি তিনি। কনস্যুলেট থেকে এখন পর্যন্ত কোনো এনরোলমেন্ট আইডি নম্বর দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি জানতে পারছেন না তার মায়ের আবেদনের পরিণতি কী হয়েছে। অথচ তিনি আবেদনপত্রের সঙ্গে নবায়ন ফি বাবদ ১১০ ডলারের মানি অর্ডারও দিয়েছেন। তিনি বলেন, পাসপোর্ট নবায়ন করতে চার মাস লাগার কথা নয়।
ঘরের কাছে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা পেয়ে খুশি ব্রুকলিনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হুমায়ূন কবীর। তিনি ঠিকানাকে জানান, তার পাসপোর্ট নবায়ন করা দরকার। এ জন্যই এসেছেন। ব্রুকলিন থেকে কুইন্সের অফিসে যাওয়া তার জন্য কষ্টের। ঘরের কাছে হওয়ায় নবায়নের আবেদন করে গেলেন। এ জন্য তিনি সোসাইটি ও নোয়াখালী সমিতিকে ধন্যবাদ জানান।
নোয়াখালী ভবনের সামনে সেবা নিতে অপেক্ষমাণ শত শত প্রবাসীকে পাসপোর্ট আবেদন, নবায়ন ও নো-ভিসা ফরম সরবরাহ এবং নানান তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সাংবাদিক সোহেল মাহমুদ। সম্প্রতি ব্রকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউতে এ-সংক্রান্ত একটি মাল্টিসার্ভিসেস প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন তিনি। তার মাধ্যমে অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশি এখন উপকৃত হচ্ছেন। শনিবার তিনি বিনা মূল্যে ফরম সরবরাহ ও পরামর্শ দিয়ে প্রবাসীদের সহায়তা করেন।