ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আগ্নেয়গিরির লাভা উদগিরণ কবে শেষ হচ্ছে?

মুহম্মদ শামসুল হক

গণতন্ত্র, সভ্যতা-প্রাচুর্য-প্রযুক্তি-ন্যায়বিচার ও সামগ্রিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রকে আধুনিক বিশ্বের তিলোত্তমা ও স্বর্গরাজ্য বিবেচনা করা হয়। অথচ সারা বিশ্বে ন্যায়বিচারের মানদণ্ডেরে সতী মায়ের সতী মেয়ে হিসেবে পরিচিত আমেরিকায় বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন অমানবিক ও বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তাদের গুলিতে কিংবা তাদের হাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড, আহমাদ আরবারি, বোথাম জিয়ান, অ্যান্টওয়ান রোজ, জামেল রবানসন, আতাটিয়ানা জেফারসন, মিশেল ডিয়ান, ডারিয়াস টারভার, ক্যামেরন ল্যাম্ব এবং এভারেট পালমার। অবশেষে সত্যের কল বাতাসে নড়েছে। তাই গত মাসে মিনেসোটায় শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে খুন করার পর ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ শীর্ষক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্্গিরণ শুরু হয়েছে আমেরিকাজুড়ে। সেই লাভা গোটা বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর ক্ষোভ ও বঞ্চনার পূঞ্জীভ‚ত বারুদের স্তুপে ধূপকাঠির কাজ করেছে। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে লন্ডন-গ্রিসসহ সারা বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত লাখ লাখ জনতা।
আর সেই উদগীর্ণ লাভা খোদ আমেরিকায় এবার ব্ল্যাক কমিউনিটি কর্তৃক দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইন্ডিপেন্ডেন্স বা জুনটিনথ ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে উদ্্যাপনে ভিন্ন মাত্রার সংযোজন করেছে। সাড়ম্বরে পুরো আমেরিকায় ১৯ জুন উদ্্যাপিত হয়েছে ব্ল্যাক ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন যে নিজেদের ন্যায্য অধিকারের দাবি তোলায় দুই শতাধিক আফ্রিকান-আমেরিকানকে বিনা বিচারে নির্মমভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমিস্টরা। বর্ণাঢ্য আয়োজনে ব্ল্যাক ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে উদ্্যাপনের পরও ক্ষোভ ও আন্দোলন বিন্দুমাত্র প্রশমিত হয়নি। তাই ২০ জুন সমগ্র আমেরিকার বৃহত্তম সিটি থেকে ক্ষুদ্রতম টাউন সর্বত্র বয়ে গেছে স্মরণকালের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ বিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গ। ফাউন্ডার অব ফ্রিডম ফাইটারসহ কয়েকটি সংগঠনের আয়োজনে ব্ল্যাকস লাইভস ম্যাটার এবং বর্ণবাদ ও অন্যায় বিচারের চির অবসানের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে ছিলেন লাখ লাখ আমেরিকান। সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় রাজধানী, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো ও নর্থ ক্যারোলিনায়। লিঙ্কন মেমোরিয়াল ও হোয়াইট হাউসের আশপাশে জড়ো হয়েছিলেন লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। সমাবেশে ফাউন্ডার অব ফ্রিডম ফাইটারসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফিলোমেনা ওয়ানকেনজে বলেন, আত্মার আত্মাহুতির বিনিময়ে আমাদের পরবর্তী বংশধর বর্ণবাদ এবং অন্যায় বিচারের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেলে আমি হাসিমুখে জীবন দিতে রাজি আছি। নর্থ ক্যারোলিনায় নিহত ফ্লয়েডের ছবিসংবলিত টি-শার্ট বিতরণ করা হয় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে। পরে ২৩ জুন মঙ্গলবারও ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্্গিরণ হয়েছিল। এছাড়া ২৬ জুন শুক্রবার ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার মাস্ক পরার দাবিতে ম্যাসাচুসেটসের ক্যামব্রিজের হোল ফুডস চেইন ত্যাগ করেছে। আর ২৭ জুন ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এবারের ঐতিহাসিক জুনটিনথ (১৯ জুন) ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে উদ্্যাপনকালে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল স্পিকার কোরি জনসন ঐতিহাসিক জুনটিনথ ইন্ডিপেন্ডেন্স ডেতে দাপ্তরিক ছুটি ঘোষণা করেছেন। ওই দিবসে ফেডারেল ছুটি ঘোষণারও দাবি জানানো হয়েছে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে। এছাড়া স্পিকার কোরি জনসন, কাউন্সিল সদস্য ডেবি রোস ও ইনেজ ব্যারন এবং কাউন্সিল ব্ল্যাক, ল্যাটিনো অ্যান্ড এশিয়ান কো-চেয়ারস এডরিনে অ্যাডামস এবং আই ডানেক মিলার সিটি হল থেকে প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের প্রতিকৃতি অপসারণেরও জোর দাবি করেছেন। ম্যাসাচুসেটসে জুনটিনথ ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে প্রতিবছর ১৯ জুনের সন্নিকটবর্তী রোববার পালনের আইন প্রণয়ন করেছেন ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর চার্লি বেকার।
আমেরিকার অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হোয়াইট সুপ্রিমেসির দাবিদার বর্ণবাদী কুলীন আমেরিকানরা দাসত্বের রজ্জুতে শৃঙ্খলিত করে আফ্রিকান-আমেরিকানদের ওপর শতাধিক বছর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল। সমতা-সাম্যবাদ এবং ন্যায়বিচারের নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত আমেরিকাকে দাসপ্রথার অভিশাপমুক্ত করতে গিয়ে গৃহযুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিল ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে। দাসত্ব প্রথার বিলোপ এবং গণতন্ত্রচর্চার পথ অবারিত করার জন্য আব্রাহাম লিঙ্কন ১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি ঐতিহাসিক ইমানসিপেশন প্রোক্লেমশন (দাস অবস্থা থেকে মুক্তির ফরমান) জারি করেছিলেন। নানা জটিলতার কারণে ওই ফরমানের কার্যকারিতা প্রায় আড়াই বছর স্থগিত থাকে। অবশেষে ১৮৬৫ সালের ১৯ জুন দাসপ্রথার পুরোপুরি বিলোপ ঘটে। এর ফলে লাখ লাখ কৃষ্ণকায় দাসত্বের অভিশাপমুক্ত এবং স্বাধীনতার সুফল ভোগের সুযোগ পায়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যই ব্ল্যাক কমিউনিটি দিবসটিকে ব্ল্যাক ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে হিসেবে অভিহিত করে এবং প্রতিবছর ১৯ জুন যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্্যাপন করে আসছে। জুনটিনথ নামে উদ্্যাপিত দিবসটি মূলত জুন এবং টিনথ শব্দ দুটির সমন্বয়ে গঠিত।
যাহোক, বিশ্ববাসীর জন্য শাশ্বত জীবনবিধান হিসেবে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র কোরআন। পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রাহমানের একটি আয়াতে বলা হয়েছে : সৃষ্টিজগতের সবকিছুই একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বই অক্ষুণ্ন থাকবে। অনেকের দৃষ্টিতে রাজ্য-সম্রারাজ্যের উত্থান-পতন এবং ক্ষমতার হাতবদল নিছক জোয়ার-ভাটাই বটে। তাই জোয়ার আসার সাথে সাথে নদীর বুক জলরাশিতে স্ফীত হয়ে ওঠে এবং ভাটার টানে আবার নদীর বুক খাঁ খাঁ বালুচরে পরিণত হয়। সভ্যতা ও রাজ্য-সা¤্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং ক্ষমতার হাতবদলও তেমনই।
এ প্রসঙ্গে প্রথিতযশা ইংরেজ কবি রালফ হজসন তার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘টাইম ইউ ওল্ড জিপসিম্যান’ কবিতায় বলেছেন : জিপসিম্যান বা বেদেদের কোনো স্থায়ী নিবাস নেই। তারা প্রকৃতির আশীর্বাদনির্ভর বাস্তুহারা জীবন কাটায় এবং এক শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জ-হাটবাজার থেকে অন্যত্র ঘুরেফিরে পার্থিব জীবন কাটিয়ে দেয়। অজপাড়াগাঁয়ের কোনো অখ্যাত হাটও বেদেদের আগমনে হঠাৎ কর্মচঞ্চল ও সজীব হয়ে ওঠে। বেদেদের চেঁচামেচি-কলকাকলি-কোলাহলে সর্বত্র প্রাণচাঞ্চল্যের ঢেউ খেলে যায়। কিন্তু ২ বা ৩ দিন অবস্থানের পর বেদেগোষ্ঠী হাটটি ত্যাগ করার পর পরিত্যক্ত হাটটি আবার ঝিমিয়ে পড়ে এবং সাময়িক প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলে। মানবসভ্যতার বিকাশ এবং রাজ্য-সাম্রারাজ্যের উত্থান-পতনও বেদেদের অস্থায়ী উপস্থিতি এবং আকস্মিক বিদায়েরই তুল্য। কবির দৃষ্টিতে : প্রাচুর্য, সভ্যতা ও সমৃদ্ধি বহনকারী শকটটি একসময় সাময়িকভাবে থেমেছিল প্রাচীন গ্রিস, রোম, ব্যাবিলন, মিসর ও পাঞ্জাবে। ফলে এসব দেশ ও রাষ্ট্র একসময় শৌর্য-বীর্য-সভ্যতা ও প্রাচুর্যের শীর্ষে আরোহণ করেছিল। কিন্তু প্রতিটি স্থানে দুই থেকে আড়াই বছর অবস্থানের পর শকটটি আবার নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এবং একপর্যায়ে ভারত উপমহাদেশে সাময়িকভাবে থেমে যায়। আর শকটটি স্থান ত্যাগের পর প্রাচীন ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ নগরগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হারিয়ে অবশেষে একপর্যায়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। ভারতে শকটটির অবস্থানকালে মোগল সম্রাটদের শ্রেষ্ঠত্ব-ঐতিহ্য-শৌর্যবীর্য তুঙ্গে উঠেছিল। মাত্র আড়াই বছরের ব্যবধানে সেই শ্রেষ্ঠত্ব, ঐতিহ্য ও শৌর্যবীর্য কেড়ে নিয়েছিল বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু ১৯০ বছর পর আভিজাত্য এবং শ্রেষ্ঠত্বের বরপুত্র ইংরেজদেরও হাত গোটাতে হয়েছিল ভারত উপমহাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে।
উপসংহারে বলা যায়, বর্তমানে বর্বরতা ও অবিচারের চির অবসানের দাবিতে পুরো আমেরিকায় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ শীর্ষক আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্্গিরণ অব্যাহত রয়েছে। শতাব্দীর সাড়া জাগানো এই আন্দোলন কবে শেষ হচ্ছে, তা জানার জন্য বিশ্ববাসীকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।