‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ এবং আমাদের অবস্থান

মিনহাজ আহমেদ
সম্প্রতি বাংলাদেশে মাইকে ঘোষণা দিয়ে একদল মুসলমান আরেকদল মুসলমান (আহমদীয়া) পরিবারের এক নবজাতক শিশুর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে রাস্তায় ফেলে দেয়। দু-একটা পত্রিকা এই সংবাদ ছেপেছে, হয়তো এ নিয়ে থানায় একটা রিপোর্ট হয়েছে। ব্যস, এই পর্যন্তই আমাদের আইন, সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রের দৌড় সমাপ্ত।
দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান এবং প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসবিরোধীদের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ গা সওয়া হয়ে গেছে। তেমনটি হচ্ছে পুলিশের কিংবা বিশেষ বাহিনির হাতে রাষ্ট্রের জিম্মায় থাকাকালে ক্রসফায়ারে হত্যার মতো ঘটনার ক্ষেত্রেও। পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে ক্রসফায়ারকে অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। আর এসব নিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, দু-একটা মেরুদণ্ডহীন রাজনৈতিক দল এবং ততোধিক ক্ষুদ্র ভিন্নমতাবলম্বী বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা গ্রুপ ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ আশঙ্কাজনকভাবে এবং অপরাধজনকভাবে নির্লিপ্ত। অদূর ভবিষ্যতে এ নির্লিপ্ততার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের ঘটনাগুলো দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম আমার মেয়ে সারাহর কথা। সমবয়সীদের চাইতে অগ্রসর মেধার অধিকারী সারাহ সেই প্রি-কে ক্লাসে থাকাকালে একবার প্রশ্ন করেছিল, তার রঙ কেনো সাদা নয়। সারাহর এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপট নিয়ে আগে ভাবিনি, কিন্তু সাম্প্রতিক একটি ঘটনা থেকে যুগ যুগ ধরে চলমান জাতিবিদ্বেষমূলক ঘটনাবলী প্রকাশ পাওয়ার পর সারাহর এই প্রশ্নের পেছনে নিউইয়র্কেও স্কুল ব্যবস্থায় বিদ্যমান জাতিবিদ্বেষের স্পষ্ট প্রমাণ পাচ্ছি। সাথে সাথে বুঝতে পারছি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ও স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষাগুলোতে অত্যন্ত ভালো ফল পাওয়া সত্ত্বেও কেনো সারাহ শুধু শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে দেশের নামকরা কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করেনি, কেনো নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রেখেছে, কেনো সে তার মেধা ও প্রতিভার সমান স্বপ্ন দেখতে শেখেনি। এর কারণ একটাই- জ্ঞানানুসন্ধানী হিসেবে সে যতটা পটু ছিল, পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধে সে ছিল ভীষণভাবে ব্যর্থ, তাই নৈরাশ্যে নিমজ্জিত এবং দমিত। তার মাঝে যে অমিত সম্ভাবনা ছিল, সেটা থেকে পুরো সমাজই বঞ্চিত হলো।
জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের প্রতি আমাদের কমিউনিটির যতটুকু সহানুভূতি থাকার প্রয়োজন, ততটুকু নেই। ভাবছেন আমরা স্বার্থপর বলে? মোটেই না, বরং মুর্খ বলে। আমাদের মুর্খতা প্রথমত জাতিবিদ্বেষ বা রেসিজমের মর্মার্থ অনুধাবন করায়। আমাদের তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী জ্ঞানীগুণী শিক্ষিদেরও ধারণা, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হওয়াটাই হলো রেসিজম। এই রেসিজম বা জাতিবিদ্বেশের শিকার যে আমরা অহরহ হচ্ছি, সেটা তারা বুঝেন না। শুথু তা-ই নয়, আমাদের এই শ্রেণির মানুষেরা অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, এই কৃষ্ণাঙ্গরা জন্মগতভাবে, বংশপরম্পরায়, উত্তরাধিকারসূত্রে অপরাধী, কাজেই তাদের এভাবে শ্বাসরোধ করে, অত্যাচার নির্যাতন করে অবদমিত রাখা উচিৎ। আমাদের দ্বিতীয় মুর্খতা হলো আমরা আদৌ বুঝতেই পারি না যে, অল্পসংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের ঘরে ঘরে বেড়ে উঠছে এক প্রজন্ম, যারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে অন্যায্য, বৈষম্যমূলক এবং আন্তরিকতাহীন স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজের সাথে। কেন আমাদের সন্তানদের অধিকাংশের সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয় না, কীভাবে তারা নিজের হাতেই নিজেদের সম্ভাবনাময় স্বপ্নকে খণ্ডিত করে ফেলে, তার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ হলো সারাহ। কাজেই, আমরা প্রকৃত বুদ্ধিমান ও স্বার্থপর হলে অবশ্যই লুটপাটের মতো বিচ্যুতির সমালোচনায় মুখর না হয়ে আন্দোলনের বৃহত্তর নৈতিক, মানবিক, ন্যায্যতার কথা বিবেচনা করতাম এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতাম। তবে আমি আনন্দিত এ কারণে যে, আমাদের সন্তানদের অধিকাংশই এই আন্দোলনের বড় সমর্থক এবং তারা সক্রিয়ভাবেই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে।
উপরে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমার মন্তব্যে আমাদের সাধারণ মানুষদের আশঙ্কাজনক এবং অপরাধজনক নির্লিপ্ততার সমালোচনা করেছিলাম। বলেছিলাম, এই নির্লিপ্ততার ফল হবে ভয়াবহ। আসলে শুধু বাংলাদেশ আর আমেরিকা নয়, অপরাধজনক নির্লিপ্ততা পৃথিবীর সর্বত্রই ভয়াবহ ফল নিয়ে আসে। কাজেই সমাজের যারা আমার এই কথার মূল ইঙ্গিতটুকু বুঝতে পারবেন, আশা করছি তারা নিজ নিজ ভূমিকায় ব্রতী হবেন।

  • কম্যুনিটি এক্টিভিস্ট, নিউইয়র্ক।