বড় পরিবর্তন হচ্ছে না সীমানায়

রাজনীতি ডেস্ক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জনসংখ্যা, ভোটার ও সংসদীয় এলাকার আয়তন বিবেচনায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে চেয়েছিল কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে আইনি কাঠামোয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসি ঘোষিত রোডম্যাপে এসব কার্যক্রমের সময়সীমাও উল্লেখ করে দেওয়া হয়। রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং আইন প্রণয়নের কথা; কিন্তু তা করতে পারেনি। ফলে রোডম্যাপ থেকে পিছিয়ে পড়েছে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ইসি সূত্র বলছে, সীমানা নির্ধারণে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসছে না।
রোডম্যাপ অনুসারে গত বছর জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণে আগের নীতিমালা পর্যালোচনা করে একটি নতুন নীতিমালা করার কথা। সে লক্ষ্যে আগস্টে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমস (জিআইএস) সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করার কথা ছিল। অক্টোবরের মধ্যে নীতিমালার আলোকে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া তালিকা প্রকাশের কথা বলা হয়েছিল। নভেম্বরে খসড়া তালিকা প্রকাশ করে দাবি, আপত্তি, সুপারিশের আহ্বান এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আপত্তির বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক শুনানি শেষে সেসব নিষ্পত্তি করে ৩০০ আসনের সীমানা চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করার কথা; কিন্তু এখনো হয়নি।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিটির সভাপতি নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন আইন এখনো হয়নি। সেই আইনের জন্য বসে থাকলে আমি সীমানা নির্ধারণ করব কবে। আমরা কাজ করছি। সময়সীমা থেকে পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, একটি আসন নিয়ে আদালতে নির্দেশনা রয়েছে। সেটি নিষ্পত্তির অপেক্ষা করছি। আশা করি দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে। সে আলোকেই আমাদের আগাতে হবে।
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে গত ২০ জুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেন, আমাদের এখানে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ হয় জনসংখ্যার ঘনত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় যদি ভবিষ্যতে সীমানা নির্ধারণ করতে হয়, তা হলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর আসন বেড়ে যাবে, গ্রামাঞ্চলে কমে যাবে। এতে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। তাই এসব সমস্যার সমাধানে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা নয়, ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণের চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু আইনগত সমস্যা আছে। সেটা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিষয়ে রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়, ২০১১ সালে একটি আদমশুমারি হলেও গত জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা নির্ধারণে তেমন পরিবর্তন হয়নি। শুধু জনসংখ্যার বিচারে সীমানা নির্ধারণ করা হলে শহরে আসন বাড়বে। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। এসব মাথায় রেখে জনসংখ্যা, ভোটারসংখ্যা, এলাকায় মোট আয়তনকে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসনসংখ্যা সীমিত করে দিয়ে আয়তন, ভৌগোলিক অখ-তা ও উপজেলা ঠিক রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় আছে। এতে আরও বলা হয়, সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শুধু জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি না করে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা এবং সংসদীয় এলাকার আয়তন বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোয় সংস্কার আনা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। গত জুলাইয়ে দ্য ডিলিমিটেশন অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬ রহিত করে ‘নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন-২০১৭’ প্রণয়নের উদ্দেশে একটি নতুন আইনের খসড়াও তৈরি করে ইসি। গত ২৭ আগস্ট খসড়াটি কমিশনের বৈঠকে তোলা হয়। বৈঠক শেষে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে এই খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সে খসড়া অনুযায়ী নতুন আইন এবং সে অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হলে সংসদীয় আসনে বড় কিছু পরিবর্তন আসত। তাতে ঢাকায় আসন বাড়ার এবং কোনো কোনো জেলায় আসন কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য গত বছর ২ নভেম্বর একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে মত দিতে বলা হয়েছিল। সেই উপকমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব (আইন) বদলি হলে তার জায়গায় এখনো কেউ আসেননি। বিষয়টি সেখানেই থমকে আছে। অথচ রোডম্যাপ অনুসারে ডিসেম্বরের মধ্যে আইন সংস্কারের প্রাসঙ্গিক খসড়া প্রস্তুত করার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। ইসি কর্মকর্তারা জানান, নতুন আইনের খসড়া অনুসারে সীমানা পরিবর্তন করলে অনেক আসনে পরিবর্তন আসবে। হাতে সময় আছে ছয় মাসের কম। কারণ জুন থেকে নির্বাচনী এলাকা অনুসারে ভোটার তালিকা মুদ্রণ শুরু হবে। এর আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করে এর ওপর আপত্তি-শুনানি-নিষ্পত্তি সম্পন্ন করতে হবে। ইসি সূত্র জানায়, দশম সংসদ নির্বাচনের পর কোনো আদমশুমারি না হওয়ায় এবার সীমানা পুনর্নির্ধারণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই।