বড় বড় কোম্পানিতে রাজনৈতিক ‘থাবা বাবা’

বাণিজ্যাঙ্গনে কানাঘুষা : ক্ষোভ প্রকাশে মানা

বিশেষ প্রতিনিধি : করোনা, বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক অতিসংশ্লিষ্টতার পরিণামে দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজনেস হাউসগুলোর কয়েকটি মারাত্মক আক্রান্ত। ক্ষমতাসীন ঘরানার কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান খাবলে খেতে চাচ্ছে এগুলোকে। মাত্রা ছাড়ানো রাজনৈতিক মাখামাখি এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেশি কাল হয়েছে। বরাবরই ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ভাগযোগে ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিতের একটি প্রবণতা থাকলেও গত বছর কয়েকে এটি মাত্রা ছাড়িয়ে ভিন্নরূপ নেয়।
টানা এই চর্চায় বিজনেস হাউসগুলোর অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছেন ক্ষমতাসীন ধড়িবাজ ও ঝানু লোকেরা। কোনো কোনো বিজনেস হাউসে ইনার কনফ্লিক্টও বাধিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের পরিকল্পনায়। উদ্যোক্তাদের মধ্যে এমনকি পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে দ্ব›দ্ব-অবিশ্বাস তৈরিও বাদ যায়নি। এর জেরে কয়েকটিতে ভাঙনের সুরও বাজছে। দেশের বাণিজ্যাঙ্গনে এ নিয়ে প্রচুর কানাঘুষা। কিন্তু অসন্তোষ বা ক্ষোভ জানানোর সুযোগ নেই। শিল্প-বাণিজ্যপাড়ায় এ ঝাঁকুনিটা তেজ পেয়েছে করোনা মহামারিতে একের পর এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু ও আক্রান্তের ঘটনায়। শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অনেকেই প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে দেরি হলেও বিজনেস হাউসগুলোতে তোলপাড়-দ্ব›দ্ব তৈরি করতে সময় লাগেনি।
ট্রান্সকমের লতিফুর রহমান, মোনেম লিমিটেডের আবদুল মোনেম, যমুনার নুরুল ইসলাম বাবুল, এস আলমের মোরশেদুল আলম, এসএমসির নিলোফার মঞ্জুর, সন্ধানী-পূরবীর আলহাজ মকবুল হোসেনসহ বড়-ছোট আরো কয়েক ব্যবসায়ীর মৃত্যু তাদের শিল্প গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে শোকের চেয়ে দ্ব›দ্ব-বিরোধকে যেন বেশি উসকে দিয়েছে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, আবাসন, তেল-চিনিসহ ফুড আইটেম, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, হসপিটালিটি, ব্যাংক-বিমা, পুঁজিবাজার, পাট, বস্ত্র, চা, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতে অগুনতি বিনিয়োগ তাদের। বছরে বিশাল টার্নওভার। ইনফরমাল লেনদেনের অঙ্কও বিশাল।
লেনদেনে সংশ্লিষ্টরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে টাকার খনিতুল্য এসব গ্রুপ অব কোম্পানির অর্থসম্পদ সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। যেই অঙ্ক নির্মোহ মানুষকেও শিহরিত করতে পারে। অর্থলোভী চতুরদের জন্য এগুলো আরো তাড়নাদায়ক। তাই ঝোপ বুঝে এখনই তারা কোপ মারার সুবর্ণ সময় মনে করছেন। সফল, বৃহৎ বিজনেস হাউসগুলোর বেশ কটির গাঁথুনিই পারিবারিক। এগুলোর সাফল্যের পেছনে পরিবারের সদস্যদের শ্রম-ঘামের কথা অনেকেরই অজানা। আকিজ, আবুল খায়ের, মোস্তফা, রহিমআফরোজ, আব্দুল মোনেম, ট্রান্সকম, প্যারাডাইজ গ্রুপ , ইসলাম, আনোয়ার, এ কে খান, বসুন্ধরা, পারটেক্স, মেঘনা, যমুনা, স্কয়ার, টিকে গ্রুপ, বেক্সিমকো, ইউনাইটেড, সিটি, পিএইচপি, প্রাণ ইত্যাদি গ্রুপ তথা বিজনেস হাউসের এত দূর আসার পেছনে পরিবারের প্রবীণ ও একান্ত বিশ্বস্তদের অবদান একেকটি গল্পের মতো।
কোনো কোনোটিকে আরো সমৃদ্ধ করার পেছনে রয়েছে প্রতিষ্ঠাতার উত্তরসূরি বা দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্যারিশমা। আবার কোনো কোনোটিতে ব্যতিক্রম। শুরুর জন যেভাবে পরিবারে ঐক্য ধরে রাখার মাধ্যমে ব্যবসাকে টেনে সামনে নিয়েছেন, পরের প্রজন্ম সেভাবে পারেনি। উপরন্তু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় জড়িয়েছে। তাদের পূর্বসূরিরা কাজটি করেছেন একেবারেই ব্যবসায়িক টার্গেটে সতর্কতার সঙ্গে ধরি মাছ না ছুঁই পানি স্টাইলে। তারা ব্যবসার ক্ষেত্র বাড়িয়েছেন। দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা করতে গিয়ে নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও টিকে থেকে সামনে এগিয়েছেন। এ ধরনের কয়েকটিতে সম্প্রতি ভেতরে ভেতরে গোলমাল চলছে। এসবের নেপথ্যে কাজ করছে বিজনেস কমিউনিটিতে ‘থাবা বাবা’ নামে পরিচিত চক্রটি।
পরিবারের কোনো কোনো সদস্যের রাজনৈতিক মাখামাখিতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাইরের ইন্ধনে কঠিন প্রতিক‚লতা যাচ্ছে এগুলোতে, যা প্রকাশ না করে গোপনই রাখতে হচ্ছে। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ব্যবসার কর্তৃত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে জটিলতা, বিবাদ ও অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যু, ব্যবসায় উত্তরাধিকারদের একটা অংশের অনাগ্রহ ও পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যদের ব্যবসায় অমনোযোগিতা এর কারণ। যার কিছু কিছু আরোপিত। কৌশলে বাধিয়ে দেওয়া। ঠিক এ রকম সময়েই এক ব্যক্তির কোম্পানি ব্যবস্থার বিধান রেখে ‘কোম্পানি আইনে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। ২১ জুলাই মঙ্গলবার আইনটির খসড়ার চ‚ড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সংশোধিত আইনে এক ব্যক্তির কোম্পানি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘এক ব্যক্তি কোম্পানি’ হলো সেই কোম্পানি, যার বোর্ডে সদস্য থাকবেন কেবল একজন। শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারধারী পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তর করতে পারবেন। এর টার্গেটকে অস্বাভাবিক ভাবছেন ওয়াকিবহালরা। তবে এক ব্যক্তির কোম্পানির বিষয়টি যুক্ত হওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।