ভাঙন সংগঠনে এবং সমাজে

‘ভাঙন’ শব্দটিই খুব নেগেটিভ। ঐক্য যেমন মানুষকে, সংগঠনকে এবং সমাজকে শক্তিশালী করে; ভাঙন তার বিপরীতে একটা ভেঙে টুকরো টুুকরো। নদীভাঙন গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দেয়। সুন্দর-সচ্ছল সংসারকে পথে বসিয়ে দিতে পারে। উচ্ছন্নে নিয়ে যেতে পারে সমাজ-সংসারকে। ভাঙন দুর্বল এবং নিঃশেষ করে দেওয়ার আরেক নাম। ঐক্য যেমন একটি সংসার, একটি সংগঠন, একটি সমাজকে শক্তি জোগায়; ভাঙন তেমনি শক্তি হরণ করে। দুর্বল করে দেয়। উইপোকার মতো ভেতরে ভেতরে খেয়ে ফোকলা করে দেয়। উপরে যেমনই দেখা যাক, ভেতরে আর কোনো সার বলে কিছু থাকে না।

আমরা প্রবাসে থাকি। দেশ ছেড়ে এসে সবার মনেই একটা হাহাকার। শত হাহাকারের মধ্যেও আমাদের স্বপ্ন-এ দেশে নিজেদের ভাগ্য বদলের এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া। এ দেশে আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ এবং সম্ভাবনা আকাশছোঁয়া। এই সম্ভাবনার আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা লক্ষ করা যাচ্ছে। যারা আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের প্রজন্মের কথা নিয়ে ভাবেন, তাদের ক্রমেই শঙ্কিত করে তুলছে। এখানে সংগঠনের ভাঙন বলা যায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সকালে ঐক্য তো বিকালেই ভাঙন। আঞ্চলিক সংগঠনের অনেকগুলোরই একাধিক ভাঙন। এগুলো মানুষের সহনীয় হয়ে গেছে অনেকটাই। ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা) অনেক আগেই কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। অতি সম্প্রতি আরেক দফা ভাঙতে ভাঙতে কোনো রকমে রক্ষা পেয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে, কে জানে! জোড়াতালির এই ঐক্য কদিন থাকে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।

কিন্তু এখন ভাঙনের আলামত দেখা দিয়েছে এমন এক সংগঠনে, যা কিছুদিন আগেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি। এর বাইরেও তরুণসমাজের অস্ত্রবাজি এবং ড্রাগ আসক্তি সমাজের কল্যাণকামী মানুষদের ভাবিয়ে তুলেছে। ঠিকানার ১৪ জুন সংখ্যার শেষ পৃষ্ঠায় একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘ঐক্যের প্রতীক জালালাবাদ দুই ভাগ হলে দায় কার?’ এবং অন্য আরেকটি ভয়ংকর সংবাদের শিরোনাম : ‘বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের হাতে অস্ত্র, জড়াচ্ছে মারাত্মক অপরাধে’। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অভিজাত সেবামূলক সংগঠন ‘লায়ন্সের সভায় বাগবিতণ্ডা, বাকি ছিল চুলোচুলি’।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন প্রবাসে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মর্যাদাসম্পন্ন সংগঠন। সেই সংগঠনে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার পরে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার প্রত্যাশা সবার মনে থাকলেও ‘জালালাবাদ ভবন’ কেনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সাধারণ সম্পাদককে সাময়িকভাবে বহিষ্কার নিয়ে বাদানুবাদ, সাধারণ সভা-পাল্টা সাধারণ সভার হুমকি। এখন দুই ভাগ হওয়ার পথে।

শুধু বৃহত্তর সিলেটবাসীর জন্যই নয়, এটি প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। মর্যাদাসম্পন্ন একটি সংগঠন সব মানুষের জন্যই গর্বের। সেখানে ভাঙনের আলামত খুবই পরিতাপ এবং খারাপ লাগার বিষয়।

এর চেয়েও শঙ্কার খবর নতুন প্রজন্মের হাতে অস্ত্র এবং অপরাধজগতে তাদের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। নতুন প্রজন্মই আমাদের ভবিষ্যৎ আশা-আকাক্সক্ষা। ওরা বিপথগামী হলে প্রবাসে আমাদের ষোলো আনাই মাটি। একটা সময় ছিল, যখন আমেরিকায় বাংলাদেশিরা অস্ত্র হাতে নেওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। এখন বাংলাদেশি কিছু তরুণের হাতে অস্ত্র দেখা যাচ্ছে এবং তারা ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এখন পিতা-মাতা, অভিভাবক, সমাজপতি, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের ভাবতে হবেÑএমন ভয়াবহ সংকট থেকে বের হয়ে আসার পথ। কোনোভাবেই শেষ পর্যন্ত দেখতে গিয়ে কপাল চাপড়ালে হবে না। তখন আর কিছুই করার থাকবে না। তাই সময় থাকতেই সবাইকে সজাগ হতে হবে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ লাভের পথ খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, আর অসময়ের দশ ফোঁড়।’ অনেক সময় দশ ফোঁড়েও কাজ হয় না।

সংগঠনের নেতাদেরও অনেক দায়িত্ব। কেবল নিজের মান এবং প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য নেতৃত্বের আসনে বসে সমাজের জন্য কিছুই না করলে, একদিন কিন্তু সাধারণ সদস্যরা আপনাদের ছুড়ে ফেলে দেবে। সব নেতৃত্বই কিন্তু সেবামূলক এবং সংগঠন ও সমাজের প্রতি তাদের অসীম দায়িত্ব। প্রকৃত নেতা তারাই, যারা মানুষের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেন। যারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেতৃত্বে যান, তাদের চেহারা একদিন উন্মোচিত হয়ে পড়বেই। আজকের সময়ে অনেকেই অর্থের জোরে নেতা বনে যান। সেই নেতাদের দ্বারা সংগঠনের বা মানুষের কোনো কল্যাণ হয় না। রং কাঁচা হলে যেমন কয়েক ধোয়াতেই উঠে যায়, নেতৃত্বও ঠিক তেমনই। অন্তঃসারশূন্য মেকি নেতাদের চেহারা অল্প দিনেই মানুষ চিনে ফেলে। তখন কিন্তু ওই ফেক নেতাদের জন্য লজ্জা ও অপমান ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

তাই সময় থাকতেই সবাই সতর্ক হয়ে যান। যে অঙ্গীকার মানুষকে দিয়ে নেতা হন, সে অঙ্গীকার অবশ্যই রক্ষা করার চেষ্টা করুন। সততার কোনো বিকল্প নেই।